সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

মেয়াদি ঋণে শিথিলতা বাতিল, এস আলমসহ বড় ঋণগ্রহীতারা খেলাপির মুখে

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এখন থেকে খেলাপি ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে আর কোনো শিথিলতা দেওয়া হবে না, এমনকি মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রেও কোনো ছাড় থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিল করতে হবে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

ইতোমধ্যে মেয়াদি ঋণের খেলাপির ক্ষেত্রে যে তিন মাস সময় এগিয়ে আনা হয়েছে, তা বলবৎ থাকবে। এর ফলে গতকাল থেকেই এস আলমসহ বড় ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের ঋণ খেলাপি হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ৮টি ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম মাসুদ, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, বেনামে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিলেন। এত দিন বিভিন্ন উপায়ে এই ঋণ নিয়মিত দেখানো হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করার পর থেকে আর এই ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে নবায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে এসব ঋণ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে, এস আলমসহ মাফিয়া গোষ্ঠীর ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ আর দেওয়া হবে না। একমাত্র সমাধান হবে জনগণের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া। অন্যথায়, এসব ঋণ খেলাপি করা হবে। খেলাপি ঋণ হলে ওইসব প্রতিষ্ঠান আর কোনো এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে জানা গেছে, এস আলমসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ঋণ নবায়নের নীতিমালা শিথিল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর তদবির চালাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের কোনো আবদারে সাড়া দেয়নি। গতকাল পর্যন্ত এস আলমের ঋণ শিথিলের অনুরোধ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে আজ থেকেই এস আলমের ঋণ খেলাপি হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো ৫২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছিল।

২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষে জাতীয় নির্বাচনের কারণে অনেক প্রার্থী ঋণ পুনঃতফসিল করে নিজেকে নিয়মিত দেখিয়েছেন। এর ফলে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালায় কঠোরতা আনা হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে জানানো হয়, মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে যে ৬ মাস সময় দেওয়া হতো, তা তিন মাসে নামিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ মেয়াদি ঋণের মেয়াদ শেষে ৩ মাসের মধ্যেই তা খেলাপি হয়ে যাবে। এই নীতিমালা ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আরও কঠোর নিয়ম চালু হবে, যেখানে কোনো শিথিলতা থাকবে না।

৩ মাসে খেলাপি: ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সংকট

২০১২ সালের সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা হয়, কোনো ঋণের কিস্তি পরপর ৩ মাস থেকে ৬ মাস পরিশোধ না হলে তা খেলাপি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। ৯ মাসের মধ্যে পরিশোধ না করলে তা মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। ২০১৯ সালে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে কিছু শিথিলতা আনা হয়, যেখানে ৬ মাস সময় বাড়ানো হয়েছিল। তবে এখন থেকে সেই শিথিলতা তুলে নেওয়া হচ্ছে এবং মেয়াদি ঋণ ৩ মাসের মধ্যে খেলাপি হবে।

ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে ঋণ শিথিল করার জন্য অনুরোধ করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত কোনো শিথিলতা দেয়নি এবং তাদের কঠোর মনোভাবের কারণে অনেক ব্যবসায়ী হতাশ হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, আগের ১৫ বছরের মতো এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ম্যানেজ করা যাবে না। দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের কারণে মাফিয়ারা আর সুবিধা নিতে পারবে না।

7 COMMENTS

  1. […] ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, “প্রবাসীরা দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে উদগ্রীব। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে তারা নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করছেন। আশা করছি, আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে।” […]

  2. […] হল-মার্ক, ক্রিসেন্ট, থার্মেক্স, এস আলম গ্রুপ ও রিম্যাক্স ফুটওয়্যার, ব্যাংকগুলোর […]

  3. […] এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অভিযোগ হচ্ছে, তারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা পাচার করেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরে ২৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের ক্যানালি লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া ভুয়া নথি তৈরি, জালিয়াতি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পণ্য আমদানি-রফতানি ও বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। […]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

মেয়াদি ঋণে শিথিলতা বাতিল, এস আলমসহ বড় ঋণগ্রহীতারা খেলাপির মুখে

নিজস্ব প্রতিবেদক
১ অক্টোবর ২০২৪, ১৩:৪২

বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এখন থেকে খেলাপি ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে আর কোনো শিথিলতা দেওয়া হবে না, এমনকি মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রেও কোনো ছাড় থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ পুনঃতফসিল করতে হবে এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের নিয়ম মেনে চলতে হবে।

ইতোমধ্যে মেয়াদি ঋণের খেলাপির ক্ষেত্রে যে তিন মাস সময় এগিয়ে আনা হয়েছে, তা বলবৎ থাকবে। এর ফলে গতকাল থেকেই এস আলমসহ বড় ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের ঋণ খেলাপি হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ৮টি ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম মাসুদ, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, বেনামে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিলেন। এত দিন বিভিন্ন উপায়ে এই ঋণ নিয়মিত দেখানো হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করার পর থেকে আর এই ঋণ অনিয়মের মাধ্যমে নবায়ন করা যাচ্ছে না। ফলে এসব ঋণ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে, এস আলমসহ মাফিয়া গোষ্ঠীর ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ আর দেওয়া হবে না। একমাত্র সমাধান হবে জনগণের আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া। অন্যথায়, এসব ঋণ খেলাপি করা হবে। খেলাপি ঋণ হলে ওইসব প্রতিষ্ঠান আর কোনো এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে জানা গেছে, এস আলমসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ঋণ নবায়নের নীতিমালা শিথিল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর তদবির চালাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের কোনো আবদারে সাড়া দেয়নি। গতকাল পর্যন্ত এস আলমের ঋণ শিথিলের অনুরোধ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে আজ থেকেই এস আলমের ঋণ খেলাপি হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের শেষে ব্যাংক খাতে পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো ৫২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছিল।

২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ২২১ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ দশমিক ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষে জাতীয় নির্বাচনের কারণে অনেক প্রার্থী ঋণ পুনঃতফসিল করে নিজেকে নিয়মিত দেখিয়েছেন। এর ফলে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালায় কঠোরতা আনা হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে জানানো হয়, মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে যে ৬ মাস সময় দেওয়া হতো, তা তিন মাসে নামিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ মেয়াদি ঋণের মেয়াদ শেষে ৩ মাসের মধ্যেই তা খেলাপি হয়ে যাবে। এই নীতিমালা ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আরও কঠোর নিয়ম চালু হবে, যেখানে কোনো শিথিলতা থাকবে না।

৩ মাসে খেলাপি: ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সংকট

২০১২ সালের সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা হয়, কোনো ঋণের কিস্তি পরপর ৩ মাস থেকে ৬ মাস পরিশোধ না হলে তা খেলাপি ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। ৯ মাসের মধ্যে পরিশোধ না করলে তা মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। ২০১৯ সালে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে কিছু শিথিলতা আনা হয়, যেখানে ৬ মাস সময় বাড়ানো হয়েছিল। তবে এখন থেকে সেই শিথিলতা তুলে নেওয়া হচ্ছে এবং মেয়াদি ঋণ ৩ মাসের মধ্যে খেলাপি হবে।

ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে ঋণ শিথিল করার জন্য অনুরোধ করেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত কোনো শিথিলতা দেয়নি এবং তাদের কঠোর মনোভাবের কারণে অনেক ব্যবসায়ী হতাশ হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করেন, আগের ১৫ বছরের মতো এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ম্যানেজ করা যাবে না। দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের কারণে মাফিয়ারা আর সুবিধা নিতে পারবে না।