সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

শুঁটকিতে ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি ও ক্যানসার ঝুঁকি রোধে দিশা দেখাচ্ছে পরমাণু শক্তি কমিশন

মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তিতে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন, সোনাদিয়াকে ‘আদর্শ স্থান’ ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিষাক্ত কীটনাশক বা লবণ নয়, মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার করে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনে সাফল্য পেয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা। কক্সবাজারের মহেশখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনে তারা সফল হয়েছেন। গবেষকরা সোনাদিয়াকে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের জন্য ‘উপযুক্ত স্থান’ হিসেবেও ঘোষণা করেছেন।

২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছরে প্রায় ৯০ লাখ বন্ধ্যা মাছি প্রকৃতিতে ছাড়া হয়েছে। যার ফলে ক্ষতিকর মাছির বংশবিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং শুঁটকিতে বিষ মেশানোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে।

পরমাণু বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর উৎপাদিত ১৩ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক ও স্বাদু পানির মাছের ১৫ শতাংশ শুঁটকিতে রূপান্তর করা হয়। মাছ শুকানোর সময় ‘লুসিলিয়া কিউপ্রিনা’ প্রজাতির মাছি ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে লার্ভা বা শূককীট বের হয়ে মাছ খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। মাছির আক্রমণে প্রায় ৬০ শতাংশ শুঁটকি নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য অন্তত ৩০০ কোটি টাকা।

এই ক্ষতি ঠেকাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কাঁচা মাছেই ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ করেন। পরমাণু শক্তি কমিশনের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারের ৮০ শতাংশ শুঁটকিতে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিষ রয়েছে। এই বিষযুক্ত শুঁটকি খেলে ক্যানসার, লিভার, ফুসফুস, কিডনি ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া গর্ভবতী মায়েদের গর্ভপাত বা বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মের আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, শুঁটকির প্রধান শত্রু মাছি দমনে তারা ‘স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক’ বা মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

ইনস্টিটিউটের বিকিরণ কীটতত্ত্ব ও মাকড়তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. এ টি এম ফয়েজুল ইসলাম জানান, কক্সবাজারের কলাতলীতে স্থাপিত গবেষণাগারে কোবাল্ট-৬০ মোবাইল গামা ইরাডিয়েটর যন্ত্রের মাধ্যমে পুরুষ মাছিদের রেডিয়েশন দিয়ে বন্ধ্যা করা হয়। এরপর এই মাছিগুলো শুঁটকি মহাল এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “প্রকৃতিতে থাকা স্ত্রী মাছিরা যখন এই বন্ধ্যা পুরুষ মাছিদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তাদের ডিম থেকে আর লার্ভা জন্মায় না। ফলে মাছির বংশবিস্তার কমে যায় এবং শুঁটকিতে বিষ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।”

বিজ্ঞানীরা জানান, সোনাদিয়া দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন (আইসোলেটেড) হওয়ায় এখানে মাছি বন্ধ্যাকরণ প্রযুক্তি শতভাগ কার্যকর। এছাড়া এখানকার প্রখর রোদ, বাতাস ও বালু থেকে বিকিরিত তাপ প্রাকৃতিকভাবে শুঁটকি শুকানোর জন্য আদর্শ।

সোনাদিয়ার শুঁটকি মহালের মালিক কামাল হোসেন বলেন, “সোনাদিয়ার পরিবেশ শুঁটকির জন্য খুব ভালো। নাজিরারটেকসহ অন্য এলাকার মহালগুলো এখানে স্থানান্তর করা গেলে ‘সোনাদিয়ার শুঁটকি’ দেশ-বিদেশে ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব।”

প্রযুক্তিটি সফল হলেও বর্তমানে তহবিল সংকট ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে এর পূর্ণাঙ্গ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মাছি বন্ধ্যাকরণ গবেষণাকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোশাররফ হোসেন জানান, ২০২১ সাল থেকে ৯০ লাখ বন্ধ্যা মাছি ছাড়া হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তহবিল সংকটে গবেষণাকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, “সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও এগিয়ে এলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কক্সবাজারের পুরো শুঁটকি শিল্পকে বিষমুক্ত করা সম্ভব।”

এদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় এবং কাঁচা মাছের সংকটের কারণে সোনাদিয়ায় মহাল গড়তে অনেক ব্যবসায়ী আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মহাল ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিন। তবে সঠিক পরিকল্পনা নিলে এই প্রযুক্তি দেশের শুঁটকি শিল্পে বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পাঠকপ্রিয়