গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটসাল দলের সাথে সাংবাদিক হিসেবে নেপাল সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল। এ ছিল আমার জীবনের এক অনন্য অধ্যায়, যা শুধুমাত্র খেলাধুলার একটি ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই সফর যেন জীবনের প্রতিটি অংশে আমার মানসিক ও ব্যক্তিগত বিকাশের নতুন অধ্যায় লিখল। সফরের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতার শিখরে পৌঁছানোর চেষ্টা, বিশেষ করে চন্দ্রগিরি পাহাড়ের দিকে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই সেই অনুভূতি আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।
এই অসাধারণ সফরের সুযোগ করে দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় নজরুল কবির দীপু ভাইয়া, একুশে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তিনি আমার জীবনে একজন অভিভাবকের ভূমিকা পালন করছেন, আমার পথচলাকে করেছেন সহজ। ভাইয়ার নেতৃত্বে কাজ করা একটি স্বপ্নের মতো, এবং ওনার সহযোগিতার কারণেই আমি এই সুন্দর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরেছি।
খেলা শেষে, আমরা চন্দ্রগিরি পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পাহাড়ের পানে যাত্রা করার মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমি কোনো রহস্যময় দুনিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কোথাও যেন এক অজানা শক্তি, এক অদম্য কৌতূহল আমাকে টানছিল। এই অজানার সন্ধানে ছুটতে ছুটতে মনে হচ্ছিল, জীবনের নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

অবশেষে দুপুরের কিছু আগে আমরা চন্দ্রগিরি হিলের পাদদেশে এসে পৌঁছালাম। চন্দ্রগিরির ইতিহাস এবং ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে শোনা কথা মনে পড়ে গেল। এই পাহাড়টি কাঠমান্ডু থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু এর উঁচুতে পৌঁছানো যেন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
৮২৬৮ ফুট উঁচু চন্দ্রগিরি পাহাড়ে পৌরাণিক যুগে ভালেশ্বর মন্দির কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তা ভাবলে মনে হয়, এটি এক রহস্যের জগত। এই পাহাড়ের ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক গুরুত্ব অনুধাবন করেই নেপাল সরকার এখানে একটি অত্যাধুনিক ক্যাবল কার সিস্টেম তৈরি করেছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এই আধুনিক ক্যাবল কারে চড়ে পাহাড়ের শিখরে ওঠা এবং নেপালের সৌন্দর্য উপভোগ করা।
প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যাবল কারের যাত্রা শুরু হলো। ৯ থেকে ১৪ মিনিটের এই যাত্রা ছিল প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মতো। ক্যাবল কার থেকে নীচে তাকিয়ে দেখা গেল কাঠমান্ডু উপত্যকার বিস্তীর্ণ সবুজ ভূমি, আর দূরে দিগন্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গ। অন্নপূর্ণা থেকে এভারেস্ট পর্যন্ত হিমালয়ের দীর্ঘ পর্বতমালা যেন কোনো চিরন্তন প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে, আমাদের এই ছোট্ট জীবনের পরিপূর্ণতা দেখিয়ে।
ক্যাবল কারে চড়ার অভিজ্ঞতা ছিল ভীষণ রোমাঞ্চকর। প্রথমবারের মতো এই ধরনের আধুনিক যন্ত্রে চড়ার উত্তেজনা হৃদয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরি করেছিল। আমরা পাঁচজন, হাতে পাঁচটি টিকিট নিয়ে অপেক্ষা করছি উত্তেজনায়। একের পর এক কার আসছে, আবার চলে যাচ্ছে নতুন নতুন যাত্রী নিয়ে। অবশেষে আমাদের জন্য একটি কার এল। আমরা সবাই উত্তেজনা নিয়ে সেই কারে চেপে বসলাম। কারটি যত উপরে উঠছিল, তত নিচের দৃশ্যগুলো ছোট হয়ে আসছিল। বাড়িঘর, গাছপালা, মানুষ—সব যেন খেলনার মতো ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল।

ক্যাবল কারে প্রথম যাত্রার অভিজ্ঞতা
ক্যাবল কারে উঠতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন জীবনের কোনো অনন্য স্তরে পৌঁছাতে যাচ্ছি। পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের প্রকৃতি যেন আমাকে এক অদ্ভুত জগতে নিয়ে যাচ্ছে। সবুজ গাছপালার মোহনীয়তা, নীল আকাশের নিচে ছড়িয়ে থাকা সাদা মেঘের টুকরো—এগুলো যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা কোনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত, আর চোখের সামনে যেন একটি জীবন্ত ছবি ফুটে উঠছে।
একটা ছোট্ট শিশু, তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করছে। শিশুটির কৌতূহলভরা চোখ দেখে আমি বুঝতে পারলাম, এই যাত্রা শুধু আমার জন্য নয়, এটি আমাদের সবার জন্য একটি বিশাল অভিজ্ঞতা। ক্যাবল কারটি যত উপরে উঠছে, ততই আমার মনে হচ্ছিল যে আমি প্রকৃতির কোলে, এক নতুন জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
চূড়ায় পৌঁছে অপরূপ দৃশ্যের সাক্ষাৎ
চন্দ্রগিরির চূড়ায় পৌঁছে যখন ক্যাবল কার থেকে নামলাম, তখন মনে হলো আমি সত্যিই এক নতুন দুনিয়ায় পা রেখেছি। চারপাশের দৃশ্য আমাকে হতবাক করে দিল। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা সেই অপার প্রকৃতি যেন আমার হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করল। মাথার উপরে নীল আকাশ, আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয়ের বিশাল শৃঙ্গগুলো যেন আমাকে মুগ্ধ করছিল। পাহাড়ের চূড়ার ওপরে থাকা মন্দির এবং লাল-সাদা গম্বুজের স্থাপনা চারপাশের সবুজের মধ্যে ছড়িয়ে ছিল, যা প্রকৃতির সাথে এক অন্যরকম মেলবন্ধন তৈরি করেছিল। মেঘের কোমল ছোঁয়া এবং শীতল বাতাসে মনে হচ্ছিল, আমি প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গেছি।
চন্দ্রগিরির শীর্ষে উঠে আমি বুঝতে পারলাম, প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাদের জীবনের ছোটখাটো উদ্বেগকে মুছে দিয়ে এক অদ্ভুত শিথিলতা দিতে পারে। এখানে এসে আমি মানসিকভাবে শিথিল হতে পারলাম। ফুটসালের মাঠে খেলা চলাকালীন যে উদ্বেগ অনুভব করেছিলাম, তা যেন চন্দ্রগিরির শীতল বাতাসে মিলিয়ে গেল। প্রকৃতির কোলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে এক নতুন উপলব্ধি দিল। মনে হচ্ছিল, আমি জীবনের নতুন এক পাঠ শিখতে চলেছি।

চন্দ্রগিরি চূড়ার সৌন্দর্য ও রেস্তোরাঁর অভিজ্ঞতা
চন্দ্রগিরির চূড়ায় আমাদের জন্য একটি সুন্দর রেস্তোরাঁ ছিল। এখান থেকে নীল আকাশের নিচে ছড়িয়ে থাকা হিমালয় পর্বতমালার অপার বিস্তার দেখা যায়। রেস্তোরাঁটি অত্যাধুনিক, আর সেখানে বসে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া হলো। পাহাড়ের উপরে এমন সুন্দর একটি জায়গায় রেস্তোরাঁর উপস্থিতি আমাদের জন্য সত্যিই উপভোগ্য ছিল। হিমালয়ের সৌন্দর্য এবং প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, জীবনের সব ছোটখাটো চিন্তা এখানে এসে যেন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। চারপাশের প্রকৃতি আমাদের মনে যে শান্তি এনে দিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
আমরা সেখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম, আর হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, জীবনের আসল সৌন্দর্য আসলে এর ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে লুকিয়ে আছে। চন্দ্রগিরির এই মুহূর্তগুলো আমার মনে গেঁথে থাকবে আজীবন।

জীবনের নতুন উপলব্ধি
চন্দ্রগিরি পাহাড় থেকে যখন আমরা নিচে নামার জন্য প্রস্তুতি নিলাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল, এই সফর শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং এটি আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এই পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য এবং প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ আমাকে এক নতুন ভাবনার জগতে নিয়ে গেছে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করা, প্রকৃতির সাথে মিলে যাওয়া—এগুলোই জীবনের আসল অর্থ।
এই ভ্রমণ আমাকে শিখিয়েছে, প্রকৃতির মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললে আমরা আমাদের অন্তরের শান্তি ফিরে পেতে পারি। চন্দ্রগিরির অপার বিস্তার এবং হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গের সৌন্দর্য আমাকে নতুন করে জীবনের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে।