বাংলাদেশের তরুণ সমাজ, বিশেষত মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রক্রিয়াটি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এবং চাকরির অধিকতর সুযোগের কারণে তারা দেশের বাইরে চলে যান, এবং উচ্চশিক্ষা শেষে বেশিরভাগই আর দেশে ফিরে আসেন না। এর ফলে দেশ ক্রমশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে, যা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। শিক্ষার এই ধারাবাহিক মেধাপাচারকে থামানো দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা : মেধা পাচারের বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে প্রশ্ন উঠছে। বিদেশমুখী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমায় এবং সেখানে ভালো বেতনের চাকরি পেয়ে স্থায়ী হন। এই প্রক্রিয়াটি মেধা পাচার নামক সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে নিজেদের মেধা কাজে লাগাতে বাধ্য হন। এই মেধা পাচারের কারণে দেশের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে, কারণ যারা দেশের জন্য সম্পদ হতে পারতো, তারা বিদেশে গিয়ে অন্য দেশকে উপকৃত করছে।
কেন শিক্ষার্থীরা বিদেশমুখী?
বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। দেশে উচ্চমানের শিক্ষার অভাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদেশের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষত, যারা পিএইচডি বা গবেষণা করতে চান, তারা দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিদেশে উন্নত গবেষণার পরিবেশ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা সফলভাবে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, যা দেশে থাকা অবস্থায় সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত, দেশে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন। যারা দেশে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, তাদের জন্য উপযুক্ত চাকরি পাওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। অনেকেই সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিসিএস পেতে দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং প্রতিযোগিতার চাপ তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। বেসরকারি খাতে অনেকে চাকরি পেলেও মেধা অনুযায়ী বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ার কারণে তরুণদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। এতে করে তারা মেধার সঠিক মূল্যায়ন বিদেশেই করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
তৃতীয়ত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়ার প্রবণতা অনেক পরিবারের মধ্যেও তৈরি হয়েছে। পরিবারের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্যরা, যারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, সন্তানকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠাতে চান। তাদের বিশ্বাস, বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। তারা ধার-কর্জ করে হলেও সন্তানকে বিদেশ পাঠান, এবং আশাবাদী থাকেন যে সন্তান দেশে ফিরে এসে তাদের সাহায্য করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বিদেশে স্থায়ী হয়ে যান, এবং দেশে ফিরতে চান না।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান এবং বিশ্ব র্যাংকিং
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নত না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সংস্থা টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাংকিং প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৮০০’র তালিকায় স্থান পায়নি। একসময় গর্ব করে বলা হতো যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’, কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এটি সেই মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের ২২টি এবং পাকিস্তানের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৮০০-র মধ্যে স্থান পেয়েছে, যা আমাদের জন্য হতাশার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে গবেষণা এবং প্রকাশনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, গবেষণার পরিবেশ এবং সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি এবং শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে গবেষণার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। তাই মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশে থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে বিদেশে যাওয়াকেই বেশি যুক্তিসঙ্গত মনে করছেন।
গবেষণার পরিবেশ এবং সমস্যা
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণার পরিবেশের অভাব স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। এখানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারেন না, কারণ তারা নিজেরাই দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকেন। ছাত্ররাজনীতি এবং দলাদলি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা গবেষণার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
গবেষণার অভাব শুধু মেধা পাচারের পেছনের একটি কারণ নয়, এটি দেশের শিক্ষার মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, যা তাদের র্যাংকিংকে উঁচুতে নিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পরিবেশ অনুপস্থিত, ফলে তারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারছে না।
দলীয় ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের সমস্যা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে যারা নিয়োগ পাচ্ছেন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক সমর্থনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শিক্ষার পরিবেশকে আরও খারাপ করে তোলে, কারণ এসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের যথাযথ সহায়তা দিতে ব্যর্থ হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের জন্য এটি বড় ধরনের অন্তরায়, যা মেধাবীদের বিদেশমুখী হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মেধা পাচার রোধে করণীয়
মেধা পাচার রোধ করতে হলে প্রথমত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন করতে হবে। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, এবং শিক্ষার পরিবেশকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে না হয়, সেজন্য দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হলে প্রথমেই শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
সরকারকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের জন্য দেশে উচ্চমানের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা দেশে থেকে নিজেদের মেধা কাজে লাগাতে পারে। একইসঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এবং গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে স্থান করে নিতে হবে, যাতে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও এখানে এসে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হয়।
ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা
মেধা পাচার রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা রোধে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধি, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, এবং কর্মসংস্থান তৈরি করার মাধ্যমে মেধা পাচার বন্ধ করা সম্ভব।
দেশের উন্নয়নের জন্য মেধাশূন্যতা থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে, এবং মেধাবীদের দেশের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। দেশের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের জন্য মেধা পাচার রোধ করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মেধা পাচার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছেন এবং দেশে ফিরে আসছেন না। এতে করে দেশের মেধা অন্য দেশগুলোর উন্নয়নে ব্যবহার হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের উন্নয়ন। সরকারের উচিত শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা, গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা, এবং মেধাবীদের দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা। মেধা পাচার রোধ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ একটি উন্নত এবং স্থিতিশীল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে, যা কেবল আমাদের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।