সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

চসিকের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর বেহাল দশা: সেবা কার্যক্রমে চরম অসন্তোষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) অধীন পরিচালিত নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রমের অভাবে এসব কেন্দ্রের সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের তৈরি এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৬টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, ১৬টি কেন্দ্রের জরুরি মেরামত প্রয়োজন এবং ১৮টি কেন্দ্রের ব্যাপক সংস্কার দরকার।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীন বর্তমানে ৫১টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ৭৮টি আরবান হেলথ কেন্দ্র রয়েছে। এদের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১৬টি কেন্দ্রের তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ পাহাড়তলী চসিক দাতব্য চিকিৎসালয়, পাঁচলাইশ আবদুর রহিম চসিক দাতব্য চিকিৎসালয়, এয়াকুব আলী চসিক নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ফিরিঙ্গিবাজার মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউট।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাজী ওয়াইছ খাতুন মাতৃসদন হাসপাতাল ও দাতব্য চিকিৎসালয় এবং নুরুল ইসলাম মাতৃসদন হাসপাতাল বর্তমানে ব্যবহার অনুপযোগী।

অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো ছাড়াও চসিকের অধীন আরো ১৬টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত প্রয়োজন। এসব কেন্দ্রের অবকাঠামোতে চুনকাম, বাথরুমের পানি সরবরাহ এবং ছাদের ফাটল মেরামতের মতো কাজ সম্পন্ন করা জরুরি। ১৮টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে পানির ট্যাংক স্থাপন এবং দেয়ালের প্লাস্টার করার মতো কাজ অন্তর্ভুক্ত।

চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ইমাম হোসাইন রানা বলেছেন, “নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং আরবান সেন্টারের মধ্যে অনেকগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আমরা এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছি এবং তা মেয়রের কাছে জমা দিয়েছি। তবে, স্বাস্থ্য বিভাগের সংস্কার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।”

একসময় চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ নগরবাসীর কাছে অত্যন্ত প্রশংসিত ছিল। মাতৃসদন হাসপাতালগুলো এবং নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে সেবার মানের এমন অবনতির কারণে নগরবাসীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এছাড়া চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং সেবা প্রদানের মানও নিম্নমুখী। টিকাদান কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য সেবা কার্যক্রম প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন বর্তমানে পরিচালিত হয় চারটি মাতৃসদন হাসপাতাল, একটি জেনারেল হাসপাতাল, ৫১টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং দাতব্য চিকিৎসালয়। এছাড়াও রয়েছে একটি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ১১টি হোমিওপ্যাথিক দাতব্য চিকিৎসালয়, সাতটি ইপিআই জোন (টিকাদান কেন্দ্র), একটি মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউট, একটি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি এবং একটি আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার।

তবে, নানান সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এতে নগরবাসীদের স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতির বদলে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।

চট্টগ্রামের নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর সেবা কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাপক মেরামত ও সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা অত্যন্ত জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর অবিলম্বে মেরামত করা। ফাটল মেরামত, ছাদ শক্তিশালীকরণ এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোকে সুরক্ষিত করতে হবে। এছাড়াও, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ এবং ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জনবল সংকট দূরীকরণে পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক এবং নার্স নিয়োগ করতে হবে। চিকিৎসক ও কর্মীদের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও টেকনোলজি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে।

চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর অবস্থা উন্নত করার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

নগরবাসীরা আশা করছেন, চসিক দ্রুততার সঙ্গে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেবে। চকবাজারের বাসিন্দা শামসুন নাহার বলেন, “আগে চসিকের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য যেতে ভালো লাগত। এখন সেবা মান এত খারাপ যে প্রাইভেট হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।”

পাঠকপ্রিয়