সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে কেন শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরোক্ষ ভোট কাম্য নয়

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন যে সুপারিশমালা পেশ করেছে, তা নিয়ে বিতর্ক হওয়া উচিত। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু ভালো প্রস্তাব থাকলেও, দুটি বিষয়ে আপত্তি না জানিয়ে পারছি না।

প্রথমত, কমিশন চাইছে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচন হোক পরোক্ষ ভোটে। মানে, জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে তাঁদের নির্বাচন করবেন না। সাধারণ ভোটাররা প্রথমে মেম্বার বা কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন, তারপর নির্বাচিত সেই মেম্বার-কাউন্সিলররা নিজেদের মধ্যে ভোট দিয়ে ঠিক করবেন কে হবেন চেয়ারম্যান বা মেয়র।

এই প্রস্তাবনার সমস্যাটা কোথায়? এতে সাধারণ মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবানদের সুবিধা হবে। এমন নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। ভোট কেনাবেচার সম্ভাবনা বাড়বে। এমনিতেই গরিব মানুষের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানো কঠিন, তার ওপর এমন নিয়ম চালু হলে তাঁরা আরও পিছিয়ে পড়বেন। ধনী ব্যবসায়ী আর ক্ষমতাবান লোকেরাই কেবল নির্বাচনে জিতবেন।

তাছাড়া, পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলে চেয়ারম্যান বা মেয়ররা কেবল তাঁদের নির্বাচিত করেছেন যারা, সেই মেম্বার বা কাউন্সিলরদের কথাই বেশি শুনবেন। এলাকার সাধারণ মানুষের প্রয়োজন তাঁদের কাছে গুরুত্ব হারাবে।

আরেকটি আপত্তির জায়গা হলো জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও মেয়র হতে হলে স্নাতক পাস করতে হবে, আর সদস্যদের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পাস।

কিন্তু, সবাই কি সমান সুযোগ পায়? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি? আমাদের দেশে এখনও অনেকে অর্থাভাবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেন না। তাহলে তাঁরা কি জনপ্রতিনিধি হতে পারবেন না? নারীদের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। বিয়ের পর অনেকের আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয় না।

পৃথিবীর অনেক সফল রাষ্ট্রনায়ক আছেন, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিকের অনেক প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাজ্যের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী, এমনকি ভারতের জয়ললিতা বা করুণানিধির মতো জনপ্রিয় নেতারাও কিন্তু উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যদি নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইতেন, তাঁকেও কি অযোগ্য বলা হতো? কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? এমন নিয়ম চালু হলে, আমাদের দেশের বহু যোগ্য মানুষই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ হারাবেন।

উচ্চশিক্ষা এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনীদের জন্যই সহজলভ্য। সাধারণ গরিব মানুষের রাজনীতিতে আসা এমনিতেই কঠিন। তাঁদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগটাই যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে দেশে ধনীরাই কেবল দেশ চালাবে – এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে।

আমরা চাই, সব নাগরিকেরই নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকুক। অপরাধী, ঋণখেলাপি বা পাগল না হলে, যে কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ধনী-গরিব বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। জনগণ যাঁকে চাইবে, তাঁকেই নির্বাচিত করবে। এটাই হওয়া উচিত গণতন্ত্রের নিয়ম।

লেখক : শিক্ষার্থী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে কেন শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরোক্ষ ভোট কাম্য নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
২ মার্চ ২০২৫, ২৩:০৪

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন যে সুপারিশমালা পেশ করেছে, তা নিয়ে বিতর্ক হওয়া উচিত। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু ভালো প্রস্তাব থাকলেও, দুটি বিষয়ে আপত্তি না জানিয়ে পারছি না।

প্রথমত, কমিশন চাইছে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচন হোক পরোক্ষ ভোটে। মানে, জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে তাঁদের নির্বাচন করবেন না। সাধারণ ভোটাররা প্রথমে মেম্বার বা কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন, তারপর নির্বাচিত সেই মেম্বার-কাউন্সিলররা নিজেদের মধ্যে ভোট দিয়ে ঠিক করবেন কে হবেন চেয়ারম্যান বা মেয়র।

এই প্রস্তাবনার সমস্যাটা কোথায়? এতে সাধারণ মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবানদের সুবিধা হবে। এমন নির্বাচন মানেই টাকার খেলা। ভোট কেনাবেচার সম্ভাবনা বাড়বে। এমনিতেই গরিব মানুষের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানো কঠিন, তার ওপর এমন নিয়ম চালু হলে তাঁরা আরও পিছিয়ে পড়বেন। ধনী ব্যবসায়ী আর ক্ষমতাবান লোকেরাই কেবল নির্বাচনে জিতবেন।

তাছাড়া, পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হলে চেয়ারম্যান বা মেয়ররা কেবল তাঁদের নির্বাচিত করেছেন যারা, সেই মেম্বার বা কাউন্সিলরদের কথাই বেশি শুনবেন। এলাকার সাধারণ মানুষের প্রয়োজন তাঁদের কাছে গুরুত্ব হারাবে।

আরেকটি আপত্তির জায়গা হলো জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও মেয়র হতে হলে স্নাতক পাস করতে হবে, আর সদস্যদের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পাস।

কিন্তু, সবাই কি সমান সুযোগ পায়? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কি যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি? আমাদের দেশে এখনও অনেকে অর্থাভাবে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেন না। তাহলে তাঁরা কি জনপ্রতিনিধি হতে পারবেন না? নারীদের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। বিয়ের পর অনেকের আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হয় না।

পৃথিবীর অনেক সফল রাষ্ট্রনায়ক আছেন, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিকের অনেক প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাজ্যের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী, এমনকি ভারতের জয়ললিতা বা করুণানিধির মতো জনপ্রিয় নেতারাও কিন্তু উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যদি নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইতেন, তাঁকেও কি অযোগ্য বলা হতো? কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? এমন নিয়ম চালু হলে, আমাদের দেশের বহু যোগ্য মানুষই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ হারাবেন।

উচ্চশিক্ষা এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনীদের জন্যই সহজলভ্য। সাধারণ গরিব মানুষের রাজনীতিতে আসা এমনিতেই কঠিন। তাঁদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগটাই যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে দেশে ধনীরাই কেবল দেশ চালাবে – এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে।

আমরা চাই, সব নাগরিকেরই নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকুক। অপরাধী, ঋণখেলাপি বা পাগল না হলে, যে কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ধনী-গরিব বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়। জনগণ যাঁকে চাইবে, তাঁকেই নির্বাচিত করবে। এটাই হওয়া উচিত গণতন্ত্রের নিয়ম।

লেখক : শিক্ষার্থী।