চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ঘিঞ্জি গলির ভেতরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি দোকান, নাম তার পীতাম্বর শাহ’র দোকান। ১৮৪ বছরের পুরনো এই দোকানটি যেন চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক মূর্ত প্রতীক। যে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালে থমকে যেতে হয়, মনে হয় যেন সময় থমকে গেছে এখানে!
কথিত আছে, গুরুজির আদেশ পেয়ে সুদূর ঢাকা থেকে পায়ে হেঁটে চট্টগ্রাম এসেছিলেন পীতাম্বর শাহ। দিন-রাত মিলিয়ে টানা ১৫-২০ দিনের পথ। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা করা। খাতুনগঞ্জের এই দোকানটি কিনে শুরু হয় তাঁর পথচলা। ধীরে ধীরে তাঁর সততা, নিষ্ঠা আর ব্যতিক্রমী পণ্যের সমাহার দোকানটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। ছড়িয়ে পড়ে খ্যাতি।
পীতাম্বর শাহ’র দোকানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল এর পণ্যের বৈচিত্র্য। দোকানে ঢুকলে মনে হতো যেন এ এক অন্য জগৎ! ভেষজ ঔষধির জন্য দোকানটি বিখ্যাত, একথা সত্যি।
কিন্তু তার বাইরেও এখানে পাওয়া যেত এমন সব জিনিস, যা সচরাচর অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। অর্জুনের ছাল, অশোক, আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, চিরতা, জিনসেং—কী নেই এখানে! সেই সঙ্গে সুঁই-সুতা থেকে শুরু করে বিয়ে, পূজা-পার্বণ, ঈদ-কোরবানির যাবতীয় সরঞ্জাম—সবই মিলত এখানে।

এমনকি একসময় বাঘের দুধও পাওয়া যেত বলে শোনা যায়! আসলে সেটি বাঘের বাচ্চাদের পান করার সময় পড়ে যাওয়া উচ্ছিষ্ট দুধ, যা পাহাড়ি আদিবাসীরা সংগ্রহ করে আনতেন। এখন অবশ্য বাঘ আর সেই আদিবাসী, দুয়েরই দেখা মেলা ভার।
আধুনিকতার ঝড়ে যখন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখনও পীতাম্বর শাহ’র দোকান যেন আঁকড়ে ধরে আছে পুরনো দিনের স্মৃতি। দোকানে ঢুকলেই চোখে পড়বে হাতে লেখা হিসাবের খাতা। কম্পিউটার বা আধুনিক হিসাব ব্যবস্থার ছোঁয়া লাগেনি এখানে। বাংলা নববর্ষে দোকানে গেলে দেখা যাবে হালখাতার উৎসব। ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করানো, নতুন খাতা খোলা—সবকিছুই যেন নিয়ম করে পালন করা হয় এখানে। মনে হয়, এ যেন চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক জীবন্ত আর্কাইভ!
পীতাম্বর শাহ’র দোকান শুধু একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি চট্টগ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ এখানে পাওয়া যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার সামগ্রী, মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ-কোরবানির উপকরণ, মাজারের ওরসের জন্য বড় মোমবাতি, প্রতিমার চুল, তালপাতার পাখা—সবকিছুর জন্য মানুষ এখানে ছুটে আসে।

পীতাম্বর শাহ’র দোকানের সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এত বছর পরেও এখানে ব্যবসার রীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। গুরু পীতাম্বর শাহ যেভাবে ব্যবসা শিখিয়ে গেছেন, তাঁর বংশধররা ঠিক সেভাবেই ব্যবসা করে চলেছেন। বর্তমানে দোকানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন পীতাম্বর শাহ’র চতুর্থ প্রজন্ম।
চট্টগ্রামের পীতাম্বর শাহ’র দোকান কেবল একটি দোকান নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। কালের করাল গ্রাস যাকে এখনও ছুঁতে পারেনি। এই দোকান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিকড়কে আঁকড়ে ধরেও কীভাবে এগিয়ে চলা যায়।