সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বিশ্বের দ্রুততম প্রাণীদের বিস্ময়কর জগৎ: গতির লড়াইয়ে সেরাদের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকৃতির নিয়ম বড়ই অদ্ভুত। এখানে টিকে থাকার লড়াই চলে প্রতিনিয়ত, আর এই লড়াইয়ে গতিই যেন সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি। শিকার ধরা হোক বা শিকারির হাত থেকে বাঁচা – প্রায় প্রতিটি প্রাণীর জীবনেই গতির এক অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। কিছু প্রাণী তাদের অবিশ্বাস্য গতি দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত বিস্মিত করে চলেছে। সম্প্রতি বিবিসি সায়েন্স ফোকাস এমনই কিছু দ্রুততম প্রাণীর তালিকা প্রকাশ করেছে, যারা নিজেদের গতি দিয়ে প্রকৃতির বুকে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। চলুন, এই বিস্ময়কর প্রাণীদের গতিময় জীবনের আরও গভীরে প্রবেশ করি এবং তাদের দ্রুততার রহস্য উন্মোচন করি।

১. চিতা: স্থলভাগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গতিসম্রাট

* **গতি:** ঘণ্টায় ৯৪ কিলোমিটার (৫৮.৪ মাইল)
* **বিভাগ:** দ্রুততম চারপেয়ে স্তন্যপায়ী

গতির কথা উঠলে সবার আগে যে প্রাণীটির ছবি আমাদের মনে ভেসে ওঠে, সেটি হলো চিতা। আফ্রিকার বিস্তৃত তৃণভূমি ও সাভানার এই বাসিন্দা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর দ্রুততম স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর অবিশ্বাস্য গতির পেছনে রয়েছে এর অনন্য শারীরিক গঠন। চিতাবাঘের শরীর লম্বা ও সরু, যা বাতাসের বাধা কাটাতে সাহায্য করে। শক্তিশালী কিন্তু হালকা পায়ের পেশি, নমনীয় মেরুদণ্ড এবং লম্বা লেজ দৌড়ানোর সময় ভারসাম্য রক্ষা করে। অন্য বিড়াল গোত্রীয় প্রাণীর মতো চিতার থাবার নখ সম্পূর্ণ ভেতরের দিকে গুটিয়ে যায় না, যা দৌড়ের সময় মাটির সাথে চমৎকার গ্রিপ তৈরি করে স্পাইকের মতো কাজ করে।

চিতা মূলত হরিণ, বুনো খরগোশ এবং অন্যান্য মাঝারি আকারের প্রাণী শিকার করে। শিকার ধরার জন্য এটি তার প্রখর দৃষ্টিশক্তি এবং বিদ্যুৎ গতির মিশ্রণ ব্যবহার করে। শিকারের কাছাকাছি নিঃশবপে এগিয়ে গিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ চালায় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছে যায়। তবে এই বিশাল গতি চিতা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না, সাধারণত এক মিনিটেরও কম সময়ের জন্য এই গতিতে দৌড়ায়। দ্রুতগতির কারণে এর শরীরে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, যা বেশিক্ষণ ধরে রাখলে প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই শিকারকে কাবু করতে না পারলে চিতা হাল ছেড়ে দেয়। চিতার এই অসাধারণ গতি এবং শিকারের কৌশল একে আফ্রিকার খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিকারি প্রাণীতে পরিণত করেছে।

২. অস্ট্রেলিয়ান টাইগার বিটল: আকারের তুলনায় গতির দৈত্য
Lophyra_sp_Tiger_beetle_
* **গতি:** ঘণ্টায় ৯ কিলোমিটার (৫.৫ মাইল), প্রতি সেকেন্ডে শরীরের দৈর্ঘ্যের ১২৫ গুণ
* **বিভাগ:** দ্রুততম স্থলচর পতঙ্গ (আপেক্ষিক গতিতে)

যখন আমরা গতির কথা বলি, তখন ঘণ্টায় ৯ কিলোমিটার হয়তো খুব বেশি মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান টাইগার বিটল বা গুবরে পোকার ক্ষেত্রে এই গতি অবিশ্বাস্য। মাত্র ২০ মিলিমিটার লম্বা এই পতঙ্গটি প্রতি সেকেন্ডে তার নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ১২৫ গুণ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে! এই আপেক্ষিক গতি একে পৃথিবীর দ্রুততম স্থলচর পতঙ্গে পরিণত করেছে। মানুষ যদি আনুপাতিকভাবে এত দ্রুত দৌড়াতে পারত, তবে তার গতি হতো ঘণ্টায় প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার!

এই গুবরে পোকা তার শিকার ধরার জন্য বিদ্যুৎগতির প্রতিক্রিয়া এবং দ্রুত চলাচল ব্যবহার করে। এদের বড় চোখ এবং লম্বা পা দ্রুত দৌড়াতে সাহায্য করে। তবে মজার ব্যাপার হলো, এরা এত দ্রুত দৌড়ায় যে এদের চোখ পারিপার্শ্বিক দৃশ্যের সাথে তাল মেলাতে পারে না, ফলে দৌড়ানোর সময় এরা সাময়িকভাবে প্রায় অন্ধ হয়ে যায়! তাই এদের প্রায়শই দৌড়ানোর মাঝে থেমে চারপাশ দেখে নিতে হয়। এদের শিকারের তালিকায় রয়েছে ছোট মাছি এবং অন্যান্য পোকামাকড়। তীব্র গতি আর ক্ষিপ্রতা ব্যবহার করে চোখের পলকেই শিকার ধরে ফেলে এবং শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে খেয়ে ফেলে।

৩. ঘোড়া মাছি (পুরুষ): উড়ন্ত পতঙ্গের গতির রাজা
horsefly
* **গতি:** ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটার (৯০ মাইল)
* **বিভাগ:** দ্রুততম উড়ন্ত পতঙ্গ

উড়ন্ত পতঙ্গদের মধ্যে গতির রাজা হলো পুরুষ ঘোড়া মাছি (Horsefly)। ঘণ্টায় প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত অবিশ্বাস্য গতিতে উড়তে পারে এরা। এই গতি অনেক পাখির গতির চেয়েও বেশি। পুরুষ ঘোড়া মাছির পেটের দিকে থাকা রঙিন কমলা রঙের চিহ্ন দেখে এদের সহজেই আলাদা করা যায়। এদের বিশাল চোখ এবং শক্তিশালী ডানা দ্রুত উড়তে সাহায্য করে।

স্ত্রী ঘোড়া মাছি রক্ত ​​পান করে, বিশেষ করে স্তন্যপায়ী প্রাণীর। কিন্তু পুরুষ ঘোড়া মাছি ফুলের মধু বা মিষ্টি রস খেয়ে বেঁচে থাকে। এদের এই তীব্র গতি মূলত সঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে কাজে লাগে। পুরুষ মাছিরা প্রায়শই স্ত্রী মাছিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বা অন্যান্য পুরুষদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্রুত উড়ে বেড়ায়। মেরু অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই এদের দেখা মেলে। যদিও এদের গতি মুগ্ধ করার মতো, তবে স্ত্রী ঘোড়া মাছির কামড় বেশ যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

৪. ধলাগলা সুইবাতাসি পাখি: আনুভূমিক উড্ডয়নের দ্রুততম পাখি (সম্ভাব্য)
White-throated_needletail_Hunting_over_Wolotschajewka_Perwaja_(cropped)
* **গতি:** ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার (১০৫ মাইল) (আনুমানিক)
* **বিভাগ:** আনুভূমিক উড্ডয়নে দ্রুততম পাখি (অসমর্থিত)

পাখিদের মধ্যে গতির লড়াইটাও বেশ তীব্র। যদিও পেরেগ্রিন ফ্যালকন খাড়া নিচের দিকে ডাইভ দেওয়ার সময় ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটারেরও বেশি গতি অর্জন করে, তবে আনুভূমিক বা সমান্তরাল উড্ডয়নের ক্ষেত্রে ধলাগলা সুইবাতাসি (White-throated Needletail) পাখিটিকেই সম্ভাব্য দ্রুততম বলে মনে করা হয়। যদিও এর গতিবেগ কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিমাপ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হয় এটি ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে উড়তে পারে। এই তথ্য প্রমাণিত হলে এটি সোনালি ঈগলের মতো শক্তিশালী শিকারি পাখির চেয়েও দ্রুতগতির হবে।

এই পাখিটি একটি পরিযায়ী পাখি, যা মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ সাইবেরিয়ার প্রজনন ক্ষেত্র থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এর সুচালো ডানা এবং টর্পেডোর মতো মসৃণ শরীর বাতাসের বাধা কমিয়ে দ্রুত উড়তে সাহায্য করে। এরা উড়ন্ত অবস্থাতেই পোকামাকড় শিকার করে খায় এবং দিনের বেশিরভাগ সময় আকাশেই কাটায়। এদের অবিশ্বাস্য গতি দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

৫. উটপাখি: মাটির বুকে গতির ঝড়
উটপাখি
* **গতি:** ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার (৪৫ মাইল)
* **বিভাগ:** মাটিতে দ্রুততম পাখি

যেসব পাখি উড়তে পারে না, তাদের মধ্যে গতির রাজা হলো উটপাখি। আফ্রিকার এই বিশাল পাখি ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে দৌড়াতে পারে। দৌড়ানোর সময় এরা স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য তাদের তুলনামূলকভাবে ছোট ডানা দুটিকে ব্যবহার করে। এদের লম্বা ও শক্তিশালী পা দীর্ঘ পদক্ষেপে দৌড়াতে সাহায্য করে। প্রতিটি পায়ে মাত্র দুটি আঙুল থাকে, যা দৌড়ানোর সময় মাটির সাথে ভালো গ্রিপ তৈরি করে।

উটপাখির এই গতি তাদের শিকারি প্রাণীদের (যেমন সিংহ, হায়েনা) হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। শুধু গতিই নয়, এদের পায়ের পেশি এতটাই শক্তিশালী যে এক লাথিতে একটি সিংহকে পর্যন্ত মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে, যদিও এমন ঘটনা খুবই বিরল। উটপাখি মূলত তৃণভোজী, তবে সুযোগ পেলে ছোট পোকামাকড় বা সরীসৃপও খায়। বিশাল আকার এবং অবিশ্বাস্য গতির কারণে এরা আফ্রিকার সমভূমির এক পরিচিত ও বিস্ময়কর বাসিন্দা।

৬. ব্ল্যাক মার্লিন: জলের তলার দ্রুততম শিকারি
black-marlin
* **গতি:** ঘণ্টায় ১২৯ কিলোমিটার (৮০ মাইল)
* **বিভাগ:** দ্রুততম মাছ

জলের গভীরেও রয়েছে গতির লড়াই। আর এই লড়াইয়ের চ্যাম্পিয়ন হলো ব্ল্যাক মার্লিন। ঘণ্টায় প্রায় ১২৯ কিলোমিটার গতিতে সাঁতরাতে পারা এই মাছটি বিশ্বের দ্রুততম জলচর প্রাণী। এর দীর্ঘ, শক্ত ও তীক্ষ্ণ ঠোঁট (যা ‘বিল’ নামে পরিচিত) এবং শক্তিশালী, পেশিবহুল শরীর একে জলের মধ্যে দ্রুতগতিতে ছুটতে সাহায্য করে। এদের লেজের পাখনা (Caudal fin) অত্যন্ত শক্তিশালী, যা সাঁতারের মূল চালিকাশক্তি যোগায়।

ব্ল্যাক মার্লিন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ধৈর্য্যশীল শিকারি মাছ। এর তীক্ষ্ণ ঠোঁট এবং চিত্তাকর্ষক সহনশীলতার কারণে জেলেদের কাছে এটি একটি মূল্যবান কিন্তু চ্যালেঞ্জিং শিকার। টুনা এবং অন্যান্য ছোট মাছ এদের প্রধান খাদ্য। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এদের পাওয়া গেলেও, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ ব্ল্যাক মার্লিন ধরার জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।

৭. প্রংহর্ন: দূরপাল্লার দৌড়ে অদ্বিতীয়

Pronghorn
Pronghorn Antelope, Cabin Lake Road, Fort Rock, Oregon

* **গতি:** সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৮৬ কিলোমিটার (৫৩ মাইল), একটানা ৬৪ কিমি/ঘণ্টা (৪০ মাইল) গতিতে ৩০ মিনিটের বেশি
* **বিভাগ:** দ্রুততম দূরপাল্লার দৌড়বিদ (স্তন্যপায়ী)

চিতা যেখানে স্বল্প দূরত্বের গতির রাজা, সেখানে দূরপাল্লার দৌড়ে প্রংহর্ন অদ্বিতীয়। দেখতে অনেকটা হরিণের মতো হলেও এরা আসলে ভিন্ন একটি পরিবারের সদস্য। প্রংহর্ন বিরতি না নিয়ে ঘণ্টায় ৬৪ কিলোমিটার গতিতে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে দৌড়াতে পারে! এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৮৬ কিলোমিটার, যা উত্তর আমেরিকার বেশিরভাগ শিকারি প্রাণীর (যেমন নেকড়ে, কায়োটি) চেয়ে অনেক বেশি। এই অসাধারণ গতি এবং স্ট্যামিনা একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুততম স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীতে পরিণত করেছে।

প্রংহর্নের এই গতির পেছনে রয়েছে বিশেষ শারীরিক অভিযোজন। এদের রয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস, যা দৌড়ানোর সময় প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। হালকা হাড়ের গঠন এবং ফাঁপা লোম এদের ওজন কম রাখতে সাহায্য করে। প্রখর দৃষ্টিশক্তি sayesinde এরা বহুদূর থেকে শিকারি দেখতে পায় এবং দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে।

৮. প্যারাটারসোটোমাস ম্যাক্রোপালপিস (মাইট): ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গতির বিশ্বরেকর্ড
Mite
* **গতি:** ঘণ্টায় ০.৮ কিলোমিটার (০.৫ মাইল), প্রতি সেকেন্ডে শরীরের দৈর্ঘ্যের ৩২২ গুণ
* **বিভাগ:** দেহের দৈর্ঘ্যের তুলনায় দ্রুততম জীব

আকারের তুলনায় গতির বিচারে এই ক্ষুদ্র মাইট বা কীটটি পৃথিবীর দ্রুততম প্রাণী। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় পাওয়া এই মাইটটি প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ০.৮ কিলোমিটার গতিতে চলে, যা আপাতদৃষ্টিতে খুবই কম মনে হতে পারে। কিন্তু এর ক্ষুদ্র আকারের (প্রায় ০.৭ মিলিমিটার) সাপেক্ষে দেখলে হিসাবটা পাল্টে যায়। এই গতি প্রতি সেকেন্ডে এর নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের ৩২২ গুণ!

বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য তুলনা করা যাক। যদি একজন মানুষ আনুপাতিকভাবে এই গতিতে দৌড়াতে পারত, তাহলে তার গতি হতো ঘণ্টায় প্রায় ২,১০০ কিলোমিটার (১,৩০০ মাইল)! বিজ্ঞানীরা এই মাইটের গতিবিধি উচ্চ-গতির ক্যামেরা ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, গতির ক্ষেত্রে শুধু পরম বেগই নয়, আপেক্ষিক বেগও প্রকৃতির এক বিস্ময়কর দিক। এই মাইটগুলো গরম পাথরের উপর দ্রুত চলাচল করে এবং সম্ভবত অন্যান্য ছোট কীট খেয়ে বেঁচে থাকে।

৯. কাঁটাযুক্ত লেজের ইগুয়ানা: স্থলের দ্রুততম গিরগিটি
Spiny-tailed Iguana
* **গতি:** ঘণ্টায় ৩৪.৬ কিলোমিটার (২১.৭ মাইল)
* **বিভাগ:** স্থলে দ্রুততম গিরগিটি

সরীসৃপদের মধ্যেও রয়েছে গতির প্রতিযোগিতা। আর স্থলের সরীসৃপদের মধ্যে দ্রুততম গিরগিটি হলো কাঁটাযুক্ত লেজের ইগুয়ানা (Spiny-tailed Iguana)। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার শুষ্ক অঞ্চলের বাসিন্দা এই গিরগিটি ঘণ্টায় প্রায় ৩৪.৬ কিলোমিটার গতিতে দৌড়াতে পারে। এই গতি শিকারিদের (যেমন পাখি, সাপ) হাত থেকে বাঁচতে তাদের সাহায্য করে। এরা সাধারণত অল্প সময়ের জন্য এই দ্রুত গতিতে দৌড়ায়।

এদের শক্তিশালী পা এবং পেশিবহুল শরীর এই গতির উৎস। এদের এই গতিবেগ পরীক্ষাগারে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান পেয়েছে। এরা মূলত তৃণভোজী, তবে কখনো কখনো পোকামাকড় বা ছোট প্রাণীও খায়। দিনের বেলায় এরা রোদ পোহাতে পছন্দ করে এবং বিপদের আভাস পেলেই দ্রুত দৌড়ে পাথরের খাঁজে বা গর্তে লুকিয়ে পড়ে।

১০. লেদারব্যাক সি টার্টল: সাগরের দ্রুততম সাঁতারু সরীসৃপ

* **গতি:** ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটার (২২ মাইল)
* **বিভাগ:** দ্রুততম সাঁতার কাটা সরীসৃপ

জলের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী সরীসৃপ হলো লেদারব্যাক সি টার্টল বা চামট সাগর কাছিম। ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে সাঁতরাতে পারে এরা। এদের বিশাল আকার (এরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রজাতির কচ্ছপ) সত্ত্বেও এই গতি বেশ অবাক করার মতো। অন্যান্য সামুদ্রিক কচ্ছপের মতো এদের শক্ত খোলস থাকে না, বরং এদের পিঠ চামড়ার মতো পুরু ও মসৃণ ত্বক দ্বারা আবৃত, যার নিচে ছোট ছোট অস্থি প্লেট থাকে। এই নরম খোলস এবং অশ্রুবিন্দু বা টিয়ারড্রপ আকৃতির মসৃণ দেহ পানির ভেতর দিয়ে চলার সময় ঘর্ষণ কমায় এবং দক্ষতার সাথে সাঁতরাতে সাহায্য করে।

এদের বিশাল ফ্লিপার বা দাঁড়ের মতো পা শক্তিশালী ধাক্কা দিয়ে এদের এগিয়ে নিয়ে যায়। এই গতি এবং তাদের বিশাল আকার বেশিরভাগ শিকারির হাত থেকে এদের রক্ষা করে। লেদারব্যাক টার্টল গভীর সমুদ্রে বিচরণকারী প্রাণী এবং দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন মহাসাগরে পরিযায়ন করে। এদের প্রধান খাদ্য জেলিফিশ। দুর্ভাগ্যবশত, প্লাস্টিক দূষণ এবং মাছ ধরার জালে আটকা পড়ার কারণে এই অসাধারণ প্রাণীটি আজ বিপন্নপ্রায়।

গতির বৈচিত্র্যময় উদযাপন

প্রাণীজগতের এই দ্রুততম সদস্যদের দিকে তাকালে আমরা প্রকৃতির অভিযোজন ক্ষমতার এক অসাধারণ চিত্র দেখতে পাই। স্থল, জল বা আকাশ – প্রতিটি পরিবেশেই প্রাণীরা নিজেদের প্রয়োজনে অবিশ্বাস্য গতি অর্জন করেছে। চিতার ক্ষণিকের বিস্ফোরক গতি থেকে প্রংহর্নের দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়, মার্লিনের জলের তলার তীব্র গতি থেকে সুইবাতাসি পাখির আকাশছোঁয়া উড্ডয়ন, কিংবা ক্ষুদ্র মাইটের আপেক্ষিক গতির বিশ্বরেকর্ড – সবই প্রকৃতির অপার বৈচিত্র্য আর টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। এই গতি শুধু শিকার করা বা শিকার এড়ানোর কৌশলই নয়, এটি প্রাণীদের জীবনযাত্রা, পরিযায়ন এবং প্রজননের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গতির এই বিস্ময়কর জগৎ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী নামক এই গ্রহে প্রাণের বিকাশ কতটা বৈচিত্র্যময় এবং রোমাঞ্চকর। এই অসাধারণ প্রাণীদের সম্পর্কে জানা এবং তাদের সংরক্ষণে এগিয়ে আসা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

পাঠকপ্রিয়