সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে সেনাশাসকদের প্রভাব, নেপথ্যে কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময়ের গণতন্ত্রায়নের ঢেউয়ের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পুনরায় সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্রের তৃতীয় ঢেউয়ের পর অনেকেই ভেবেছিলেন এ অঞ্চলে সামরিক শাসনের যুগ শেষ হয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান, ইন্দোনেশিয়ায় সাবেক জেনারেলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া এবং থাইল্যান্ডে সেনাবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব প্রমাণ করে যে, সামরিক আধিপত্য আবারও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসছে। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশেও সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্বের সমন্বয় এই প্রবণতাকেই জোরালো করছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা নতুন নয়। ১৯৬০ থেকে ৮০-র দশকে ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, ফিলিপাইনের মার্কোস এবং থাইল্যান্ডের বিভিন্ন সামরিক জান্তার শাসন এর সাক্ষী। যদিও ফিলিপাইনে ১৯৮৬ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সামরিক হস্তক্ষেপ কম দেখা গেছে, তবে অন্যান্য দেশে চিত্র ভিন্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মিয়ানমারে ২০২১ সাল থেকে সরাসরি জান্তা সরকার ক্ষমতায়। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত বছর দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডার প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো, যাকে ১৯৯৮ সালে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আছেন দেশটির সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল ও পুলিশের সাবেক পরিচালক লুয়োং কুয়োং। কম্বোডিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক হুন সেন গত বছর ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন তারই জ্যেষ্ঠ সন্তান ও সাবেক সেনাপ্রধান হুন মানেতের কাছে। থাইল্যান্ডে ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং এখনো রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় প্রভাব বিদ্যমান।

তবে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এই দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ব্রুনাই রাজতন্ত্র দ্বারা শাসিত, আর সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় সামরিক প্রভাব এড়াতে পেরেছে।

বিশেষজ্ঞরা এই উত্থানের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর মনে করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোতে (যেমন ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম) সেনাবাহিনী স্বাধীনতা সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এছাড়া, মিয়ানমারের মতো দেশে জাতিগত সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে আসার সুযোগ করে দেয়।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সামরিক কর্মকর্তাদের নীতি নির্ধারণে প্রভাব বাড়িয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে সামরিক ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, যদিও সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ার মতো সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশে সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

থাইল্যান্ডের নারেসুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের পল চেম্বারসের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও একটি বড় কারণ। থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রের সমর্থন, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের শাসন ও স্বার্থরক্ষা, কম্বোডিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের সামরিক বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ (যেখানে দলের পলিটব্যুরোর বেশিরভাগ সদস্যই সাবেক সামরিক বা পুলিশ কর্মকর্তা) এবং ভিয়েতনামে সামরিক বাহিনী পরিচালিত বড় বড় ব্যবসা (যেমন টেলিকম ও বন্দর) জেনারেলদের প্রভাব বাড়িয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান চৌধুরী বীর বিক্রমের মতে, ক্ষমতার লোভও সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে যুক্ত হতে প্ররোচিত করে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়েই সামরিক-রাজনীতি-বাণিজ্যিক স্বার্থের জোট গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই জোট প্রায়শই অলিগার্ক বা ধনিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়োর ভাই একজন শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীও দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত নিয়ন্ত্রণ করে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো জোশুয়া কুরলান্টজিকের মতে, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য নেতিবাচক। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে পূর্ব তিমুরের মতো ব্যতিক্রমও রয়েছে, যেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাবেক গেরিলা ও সামরিক নেতারাই দেশ পরিচালনা করছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক আধিপত্যের এই পুনরাবৃত্তি কেবল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই পরিবর্তন আনছে না, বরং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষমতা এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

পাঠকপ্রিয়