সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

গাজায় অঙ্গহীনদের অন্তহীন যন্ত্রণা, সাড়ে চার হাজার পায়ের আকুতি

রয়টার্স

গাজার বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় হাজারো স্বপ্নের ভগ্নস্তূপের শব্দ। ফারাহ আবু কায়নাসের তেমনই এক স্বপ্ন ছিল—শিক্ষকতা। কিন্তু গত বছর ইসরায়েলি হামলায় ২১ বছরের এই তরুণী এতটাই মারাত্মকভাবে আহত হন যে, তাঁর বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। এক নিমেষে অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢেকে যায় তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তিনি এখন গাজার হাজার হাজার অঙ্গহারা মানুষের একজন, এক জীবন্ত পরিসংখ্যান। অস্থায়ী এক আশ্রয়শিবিরে দিন কাটছে ফারাহর, বুকে এক চিলতে আশা—কাছেই এক ফিজিওথেরাপি কেন্দ্রে হয়তো মিলবে একটি কৃত্রিম পা।

“সেদিন আমি শুধু পা হারাইনি, আমার সব স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে,” ভাঙা গলায় বলেন এক সময়ের প্রাণোচ্ছল ফারাহ। “বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর স্বপ্ন দেখতাম আমি। কিন্তু এই আঘাত আমার ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়েছে।”

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে গাজা। সেই আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ, আহত হয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মানুষ। উপকূলীয় এই ঘনবসতিপূর্ণ ভূখণ্ড আজ যেন এক ধ্বংসস্তূপ। ২০ লাখেরও বেশি মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু। ইসরায়েলি বোমায় ধসে পড়েছে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন হাজার হাজার নিরীহ মানুষ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ওসিএইচএ-র তথ্য অনুযায়ী, গাজায় আনুমানিক সাড়ে চার হাজার মানুষের জরুরি ভিত্তিতে কৃত্রিম পা প্রয়োজন। আর যে দুই হাজার বাসিন্দা ইতিমধ্যেই কৃত্রিম হাত-পা পেয়েছেন, তাঁদের প্রয়োজন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) শারীরিক পুনর্বাসন কর্মসূচির পরিচালক আহমেদ মুসা জানান, তাঁদের কর্মসূচিতে অন্তত ৩ হাজার জন নিবন্ধিত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৮০০ জনের অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে। ওসিএইচএ এবং আইসিআরসি আরও জানাচ্ছে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মেরুদণ্ডের মারাত্মক আঘাত, দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি হারানোর মতো ভয়াবহ পরিণতির শিকার।

যুদ্ধের ভয়াবহতায় আহত মানুষের সংখ্যা এতটাই বিপুল যে, তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া এক দুরূহ ও জটিল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। আইসিআরসি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, গাজা উপত্যকায় কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পৌঁছে দেওয়াটাই এখন এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। মুসার কথায়, “সঠিক কৃত্রিম অঙ্গ বা চলাচলের উপকরণ জোগাড় করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।” যুদ্ধবিরতি ভেঙে পুনরায় হামলা শুরুর পর এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েল গাজায় কোনো ত্রাণ সহায়তা ঢুকতে দেয়নি। ফারাহ জানেন না, কবে তিনি একটি কৃত্রিম পা পাবেন, বা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ মিলবে কিনা। তাঁর অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায় না।

ইসরায়েলি হামলার নির্মম শিকার গাজার সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছে সাত বছরের ছোট্ট শাজা হামদানও। সাইকেল চালানো শিখতে চেয়েছিল মেয়েটি। শাজা বলে, “বাবা আমাকে হাঁটতে নিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টির মতো গোলা পড়তে শুরু করল আমাদের ওপর। একটা গোলা আমার পায়ে এসে লাগে, পা-টা কেটে ফেলতে হয়েছে। আরেকটা গোলা বাবার বাহুতে লাগে।”

দুবার অস্ত্রোপচার টেবিলে যেতে হয়েছে শাজার। প্রদাহের কারণে শেষ পর্যন্ত বাদ দিতে হয়েছে আহত পা। ছোট্ট শাজার পৃথিবীটা এখন মায়ের আঁচলটুকুতেই সীমাবদ্ধ। সে বলে, “আমি এখন মায়ের ওপর নির্ভরশীল। মা-ই আমার সবকিছু করে দেন। আমার জীবন আগের চেয়েও খারাপ হয়ে গেছে। আহত হওয়ার আগে আমি খেলতে পারতাম।”

শাজার বাবা করিম হামদান জানান, মেয়ের মানসিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে উঠছে সে। গাজায় যে কৃত্রিম অঙ্গ নেই। একমাত্র উপায় গাজার বাইরে চিকিৎসা। “মেয়েটা রোজ কাঁদে, অনেক প্রশ্ন করে,” অসহায় গলায় বলেন করিম।

যুদ্ধের সময় গাজায় বেশ কয়েকটি চিকিৎসা মিশনের নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ইসমাইল মেহেরের কণ্ঠে ঝরে পড়ে গভীর উদ্বেগ। তিনি জানান, পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে আরও বহু মানুষ তাঁদের অঙ্গ হারাতে পারেন। তাঁর মতে, “নিরানব্বই শতাংশেরও বেশি অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের পরিস্থিতিতে। সঠিক জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এতটাই প্রকট যে চিকিৎসকদের দোষ দেওয়া যায় না। কখনও কখনও এমন চিকিৎসক দিয়েও এই কাজ করানো হচ্ছে, যিনি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞই নন।”

গাজার আকাশ-বাতাস জুড়ে আজ শুধু বারুদের গন্ধ নয়, মিশে আছে ফারাহ, শাজা আর নাম না জানা হাজারো মানুষের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক জীবন আর একরাশ অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস। যুদ্ধ কেবল শরীরকেই ক্ষতবিক্ষত করে না, কেড়ে নেয় বেঁচে থাকার স্বপ্নটুকুও।

পাঠকপ্রিয়