সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

স্টারলিংক কি বদলাবে বাংলাদেশের ইন্টারনেটের মানচিত্র?

শরীফুল রুকন

বাংলাদেশের ডিজিটাল আকাশে এক নতুন নক্ষত্রের উদয় সময়ের অপেক্ষা মাত্র। ইলোন মাস্কের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে আসছে, যা দেশের ইন্টারনেট সংযোগের ধারণাকেই আমূল বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এতদিন যা ছিল কেবল কল্পবিজ্ঞান বা উন্নত বিশ্বের বিলাসিতা, সেই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এখন আমাদের দ্বারপ্রান্তে। যদিও প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন, এর কার্যকারিতার একটি ধারণা আমরা পেয়েছি স্যাটেলাইট টেলিভিশন পরিষেবা ‘আকাশ ডিজিটাল টিভি’র মাধ্যমে। আকাশ যেভাবে তারবিহীন ডিশ অ্যান্টেনা ব্যবহার করে দেশের প্রত্যন্ত কোণেও ঝকঝকে ছবি পৌঁছে দিয়েছে, স্টারলিংকও তেমনিভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে দুর্গমতম স্থানেও সহজলভ্য করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে – হোক তা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ, দুর্গম পাহাড়ি জনপদ, বিস্তৃত চরাঞ্চল অথবা গহীন বনাঞ্চল।

প্রযুক্তির পার্থক্য ও সুবিধা:

স্টারলিংকের মূল শক্তি এর লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। বর্তমানে সাত হাজারের বেশি ক্ষুদ্রাকৃতির স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে মাত্র ৫৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরছে, এবং এই সংখ্যা ৩৫ হাজার পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিশাল স্যাটেলাইট বহর ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকায় ডেটা আদান-প্রদানে সময়ক্ষেপণ বা ল্যাটেন্সি (Latency) হয় অত্যন্ত কম (৯৯ মিলিসেকেন্ডের নিচে)। এটি প্রচলিত জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট (যা প্রায় ৩৬,০০০ কিমি দূরে থাকে) থেকে পাওয়া ইন্টারনেটের চেয়ে বহুগুণ দ্রুত এবং কার্যকর। যেখানে জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট মূলত একমুখী সম্প্রচারের (যেমন টিভি) জন্য ভালো, সেখানে স্টারলিংকের কম ল্যাটেন্সি দ্বিমুখী যোগাযোগের (যেমন ভিডিও কল, অনলাইন গেমিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, রিয়েল-টাইম ডেটা প্রসেসিং) জন্য আদর্শ। এছাড়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন ফাইবার অপটিক কেবল বা মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রচলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখনও স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট হতে পারে জরুরি যোগাযোগের একমাত্র ভরসা।

সংযোগবঞ্চিত অঞ্চলের আশীর্বাদ:

বাংলাদেশের অনেক এলাকা এখনও দ্রুতগতির নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের বাইরে। ভৌগলিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক দ্বীপ, চর, হাওর বা পাহাড়ি অঞ্চলে ফাইবার অপটিক কেবল নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ অথবা বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক। মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকলেও অনেক জায়গায় ডেটা স্পিড ও স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ। স্টারলিংক এইসব অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ই-কমার্স, কৃষি এবং প্রশাসনিক সেবা – সবকিছুতেই নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ আনতে পারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, যা এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়ক হবে।

মূল চ্যালেঞ্জ – আকাশছোঁয়া খরচ:

এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও, স্টারলিংকের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা এর খরচ। প্রাথমিক সংযোগ নিতেই এককালীন প্রায় ৬০০ ডলার মূল্যের হার্ডওয়্যার কিট (অ্যান্টেনা, রাউটার ইত্যাদি) প্রয়োজন, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৬৫-৭০ হাজার টাকা। এর উপর রয়েছে মাসিক সাবস্ক্রিপশন ফি। আবাসিক ব্যবহারের জন্য ‘রেসিডেনশিয়াল লাইট’ ও ‘রেসিডেনশিয়াল’ প্যাকেজের খরচ যথাক্রমে প্রায় ৮০ ডলার ও ১২০ ডলার। যদিও জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া, ভুটান বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশে এই মূল্য কিছুটা কম (৩০-৫০ ডলার), তবুও তা বাংলাদেশের সাধারণ ব্যবহারকারী এবং প্রচলিত আইএসপিগুলোর মাসিক ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকার প্যাকেজের তুলনায় অনেক বেশি। এই বিপুল খরচ বহন করে কয়জন সাধারণ গ্রাহক স্টারলিংক ব্যবহার করতে পারবেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। প্রাথমিকভাবে, উচ্চবিত্ত ব্যবহারকারী, কর্পোরেট হাউজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের রিসোর্ট বা বিশেষায়িত প্রকল্পগুলোই হয়তো এর প্রধান গ্রাহক হবে।

দেশীয় আইএসপিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা ও তাদের ভবিষ্যৎ:

স্টারলিংকের আগমন নিঃসন্দেহে দেশের প্রায় তিন হাজারেরও বেশি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ISP) এবং এই খাতের সাথে জড়িত কয়েক লক্ষ কর্মীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মূল প্রতিযোগিতাটা হবে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে। একথা অনস্বীকার্য যে, অনেক স্থানীয় আইএসপি এখনও তাদের গ্রাহকদের প্রতিশ্রুত গতি এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ঘন ঘন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, স্পিডের মারাত্মক ওঠানামা, দুর্বল গ্রাহক সেবা ইত্যাদি কারণে অনেক ব্যবহারকারীই অসন্তুষ্ট। স্টারলিংক যদি উচ্চমূল্যের বিনিময়েও নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল সেবা নিশ্চিত করতে পারে, তবে অসন্তুষ্ট গ্রাহকদের একটি অংশ সেদিকে ঝুঁকতে পারে। এটি স্থানীয় আইএসপিগুলোর জন্য একটি ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, যা তাদের সেবার মানোন্নয়নে বাধ্য করবে।

তবে, এটাও মনে রাখতে হবে যে স্থানীয় আইএসপিগুলো দামে এখনও অনেক এগিয়ে থাকবে। সাধারণ ব্যবহারকারী, যারা মূলত ব্রাউজিং, সোশ্যাল মিডিয়া বা ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তাদের জন্য হয়তো স্টারলিংকের উচ্চমূল্যের প্যাকেজ অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে।

নীতি নির্ধারণ ও দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা:

সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যেমন বিটিআরসি-কে এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর সুযোগ নিতে হবে, অন্যদিকে তেমনি দেশীয় আইএসপি শিল্পের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে। এই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এবং দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের জন্য প্রয়োজন নীতি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। স্টারলিংকের মতো বৈশ্বিক দানবের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে দেশীয় আইএসপিগুলোকে অযৌক্তিক কোনো বাধার মুখে যেন পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিটিআরসি আরও কঠোর হতে পারে, যাতে স্থানীয় আইএসপিগুলো গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করতে পারে।

শেষ কথা:

স্টারলিংকের আগমন বাংলাদেশের ইন্টারনেট জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। এটি একদিকে যেমন সংযোগবঞ্চিত এলাকার জন্য আশার আলো, তেমনি দেশের বিদ্যমান ইন্টারনেট ইকোসিস্টেমের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। উচ্চমূল্য হয়তো একে এখনই গণমানুষের সেবায় পরিণত করবে না, কিন্তু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ডে এটি একটি নতুন স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করবে। আগামী দিনগুলোতে দেখার বিষয় হবে – কীভাবে বাংলাদেশ এই নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে, কীভাবে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেয় এবং কীভাবে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে একটি সত্যিকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যায়। স্টারলিংকের স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের নিজস্ব আইএসপিগুলো প্রদক্ষিণ করছে আমাদের বাংলাদেশকে ঘিরেই – তারাই আমাদের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি। এই ভিত্তিকে শক্তিশালী করেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।

পাঠকপ্রিয়