ঢাকার ফুটবল মাঠে শেখ মোহাম্মদ আসলাম ছিলেন এক কিংবদন্তি স্ট্রাইকার। আবাহনী ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই তারকা ফরোয়ার্ড হেডে গোল করায় ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, নিজের সময়ে উপমহাদেশে সেরাদের একজন। ঢাকা লিগে রেকর্ড পাঁচবারের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। তবে এই ফুটবলার পরিচয়ের বাইরেও তাঁর রয়েছে অন্য এক জগৎ, যা অনেকেরই অজানা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি ভাগ করে নিলেন তাঁর সেই ব্যক্তিগত জীবনের নানা কথা।
অনেকেই হয়তো জানেন না, আসলাম ভালো গানও করেন। গানের প্রতি এই ভালোবাসাটা এসেছে পারিবারিকভাবেই। তাঁর বাবা ছিলেন খুলনা অঞ্চলের বেতার শিল্পী। বাবার গান শুনে এবং মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গানের জগতে তাঁর আগ্রহ জন্মে। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত গাইতেন তিনি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সুবীর নন্দীর গান তাঁর প্রিয়। এখনো অবসরে গানের চর্চা করেন এবং সুযোগ পেলে অনুষ্ঠানে গাইতেও ছাড়েন না। একবার তো তাঁর গান শুনে দর্শকেরা ‘ওয়ান মোর’ বলে চিৎকারও করেছিলেন। প্রিয় গান হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন মায়ের স্মৃতি বিজড়িত একটি গানের কথা।
ফুটবলার আসলামের শৈশব কেটেছে দুরন্তপনায়। ঘুড়ি ওড়ানো ছিল তাঁর অন্যতম শখ। ঘুড়ি কেটে গেলে সেটা না ধরা পর্যন্ত বাড়ি ফিরতেন না, যার জন্য মায়ের বকুনিও হজম করতে হয়েছে বহুবার। এখনো তাঁর শৈশবে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে, ঘুড়ি ওড়াতে মন চায়। খুব প্রিয় ছিল নানাবাড়ি, সেখানকার সবুজ-শ্যামল পরিবেশ তাঁকে এখনো টানে। নানাবাড়ি যাওয়ার জন্য একবার স্কুল মাঠেই গড়াগড়ি দিয়ে লোক জড়ো করে ফেলেছিলেন তিনি!
খেলোয়াড়ি জীবনে যেমন সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি কিছু মজার ও স্মরণীয় ঘটনাও আছে। ১৯৮৭ সালে জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে ইন্দোনেশিয়া সফরে গিয়ে খেলতে গিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে পুলিশের সাহায্যে হোটেলে ফিরতে হয়, যা নিয়ে রীতিমতো লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যায়।
ফুটবলের পাশাপাশি অবসরে টেনিস খেলেন। একসময় উত্তম–সুচিত্রা এবং রাজ্জাক–শাবানার সিনেমা খুব দেখতেন, যাদের মধ্যে রাজ্জাক-শাবানা জুটিই ছিল তাঁর বেশি পছন্দের। বই পড়ার অভ্যাসও আছে, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের লেখা তাঁকে টানে। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা মাঠে নামার আগে তাঁকে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা দিত।
খাবার হিসেবে দুধ-ভাত তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, যা পোলাও-কোর্মার চেয়েও বেশি পছন্দের। তবে বর্তমানে ডাক্তারের পরামর্শে তা কমিয়ে দিয়েছেন। জীবনের প্রিয় ব্যক্তিত্ব এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মানেন তাঁর মা-বাবাকে।
সাফল্যের পাশাপাশি একটা বড় আক্ষেপও আছে আসলামের। ১৯৮৪-৮৭ পর্যন্ত টানা চারবার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর জার্মানির একটি ক্লাব থেকে খেলার প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মায়ের কথায় আর যাওয়া হয়নি। মা চেয়েছিলেন, ছেলে চোখের সামনেই থাকুক।
মজার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আবাহনী ক্লাবে অনুশীলনের সময় প্রায়ই তরুণী ভক্তরা আসতেন। একবার তো ছবি তোলার নাম করে একজন সরাসরি প্রেম নিবেদনই করে বসেছিলেন!
ফুটবল মাঠের এই কিংবদন্তি এভাবেই তাঁর খেলোয়াড় জীবনের আড়ালের রঙিন গল্পগুলো তুলে ধরলেন, যা তাঁর পরিচিতি ছাড়িয়ে এক অন্য আসলামকে চিনিয়ে দেয়।