সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

বেতন নেই ১০ মাস, বন্ধ ৩৫ শিশু বিকাশ কেন্দ্র, বিপাকে বিশেষ চাহিদার ৫০ হাজার শিশু

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

দেশজুড়ে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোতে প্রতিষ্ঠিত ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের প্রায় সবকটিতেই সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও থেরাপিস্টসহ কর্মীরা ১০ মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যারা স্বল্প খরচে এখানে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের চিকিৎসা ও থেরাপি নিত।

সিরাজগঞ্জের সাড়ে ১০ বছরের রোকেয়ার কথাই ধরা যাক। জন্ম থেকেই তার হাত-পায়ে সমস্যা, ঠোঁট-জিহ্বা নীল হয়ে যেত। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় সে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। স্থানীয় শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ে তার বেশ উন্নতিও হচ্ছিল।

রোকেয়ার বাবা রাকিবুল ইসলাম বলেন, “২০২১ সালে কেন্দ্রটি চালু হওয়ায় আমার মেয়ের মতো অনেক শিশুর উপকার হয়েছিল। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে সেবা পেতাম। কাউন্সেলিংয়ে মেয়ের উন্নতিও হচ্ছিল। কিন্তু সাত-আট মাস ধরে কেন্দ্র বন্ধ থাকায় আবার সমস্যা বাড়ছে। বেসরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই।”

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক, মানসিক চিকিৎসা ও থেরাপি দিতে ২০০৯ সাল থেকে ধাপে ধাপে ৩৫টি কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে ২৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ১১টি জেলা সদর হাসপাতালে অবস্থিত। প্রতিটি কেন্দ্রে শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, শিশু মনোবিজ্ঞানী, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্টসহ পাঁচজন কর্মী ছিলেন।

কিন্তু চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন করে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত না হওয়ায় এই কেন্দ্রগুলোতে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেছে। গত বছরের জুন মাস থেকে বেতন পাচ্ছেন না প্রায় ১৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

প্রকল্পের সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (ডেভেলপমেন্ট থেরাপি) মহসীনা সুলতানা বলেন, “বেতন না পাওয়ায় কেউই কাজে আগ্রহ পাচ্ছেন না। এই কেন্দ্রগুলোর সেবা এমন যে একজন অনুপস্থিত থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সব কেন্দ্রেই অচলাবস্থা।”

তিনি আরও জানান, বেতন না পাওয়ায় কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ফেনী কেন্দ্রের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আবু তাহের আর্থিক চাপ সইতে না পেরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং পরে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। এরই মধ্যে সাতজন চিকিৎসক, একজন মনোবিজ্ঞানী ও দুজন থেরাপিস্ট চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

এই কেন্দ্রগুলোতে অটিজম, স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, দেরিতে কথা বলা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, আচরণগত সমস্যাসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সেবা দেওয়া হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ৪৪ হাজারের বেশি শিশু এখান থেকে সেবা নিয়েছিল। কিন্তু গত ১০ মাস ধরে সেবা বন্ধ থাকায় এই শিশুরা এবং তাদের পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুপ্রিয় সরকার জানিয়েছেন, বেতন বন্ধ থাকায় কর্মীরা সেবা দিচ্ছেন না এবং তাদের জোর করাও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, “দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবে সঠিক পরিচর্যা ও থেরাপি না পেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা সমাজে অবহেলিত হয় এবং তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত হয় না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনে এই শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

বেতন নেই ১০ মাস, বন্ধ ৩৫ শিশু বিকাশ কেন্দ্র, বিপাকে বিশেষ চাহিদার ৫০ হাজার শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ এপ্রিল ২০২৫, ১৪:২৪

দেশজুড়ে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোতে প্রতিষ্ঠিত ৩৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রের প্রায় সবকটিতেই সেবা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও থেরাপিস্টসহ কর্মীরা ১০ মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যারা স্বল্প খরচে এখানে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের চিকিৎসা ও থেরাপি নিত।

সিরাজগঞ্জের সাড়ে ১০ বছরের রোকেয়ার কথাই ধরা যাক। জন্ম থেকেই তার হাত-পায়ে সমস্যা, ঠোঁট-জিহ্বা নীল হয়ে যেত। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায় সে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। স্থানীয় শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ে তার বেশ উন্নতিও হচ্ছিল।

রোকেয়ার বাবা রাকিবুল ইসলাম বলেন, “২০২১ সালে কেন্দ্রটি চালু হওয়ায় আমার মেয়ের মতো অনেক শিশুর উপকার হয়েছিল। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে সেবা পেতাম। কাউন্সেলিংয়ে মেয়ের উন্নতিও হচ্ছিল। কিন্তু সাত-আট মাস ধরে কেন্দ্র বন্ধ থাকায় আবার সমস্যা বাড়ছে। বেসরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই।”

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শারীরিক, মানসিক চিকিৎসা ও থেরাপি দিতে ২০০৯ সাল থেকে ধাপে ধাপে ৩৫টি কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে ২৪টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ১১টি জেলা সদর হাসপাতালে অবস্থিত। প্রতিটি কেন্দ্রে শিশু স্বাস্থ্য চিকিৎসক, শিশু মনোবিজ্ঞানী, ডেভেলপমেন্ট থেরাপিস্টসহ পাঁচজন কর্মী ছিলেন।

কিন্তু চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন করে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত না হওয়ায় এই কেন্দ্রগুলোতে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেছে। গত বছরের জুন মাস থেকে বেতন পাচ্ছেন না প্রায় ১৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

প্রকল্পের সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (ডেভেলপমেন্ট থেরাপি) মহসীনা সুলতানা বলেন, “বেতন না পাওয়ায় কেউই কাজে আগ্রহ পাচ্ছেন না। এই কেন্দ্রগুলোর সেবা এমন যে একজন অনুপস্থিত থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সব কেন্দ্রেই অচলাবস্থা।”

তিনি আরও জানান, বেতন না পাওয়ায় কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ফেনী কেন্দ্রের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আবু তাহের আর্থিক চাপ সইতে না পেরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং পরে বিনা চিকিৎসায় মারা যান। এরই মধ্যে সাতজন চিকিৎসক, একজন মনোবিজ্ঞানী ও দুজন থেরাপিস্ট চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

এই কেন্দ্রগুলোতে অটিজম, স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, দেরিতে কথা বলা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, আচরণগত সমস্যাসহ নানা ধরনের প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সেবা দেওয়া হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ৪৪ হাজারের বেশি শিশু এখান থেকে সেবা নিয়েছিল। কিন্তু গত ১০ মাস ধরে সেবা বন্ধ থাকায় এই শিশুরা এবং তাদের পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুপ্রিয় সরকার জানিয়েছেন, বেতন বন্ধ থাকায় কর্মীরা সেবা দিচ্ছেন না এবং তাদের জোর করাও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, “দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবে সঠিক পরিচর্যা ও থেরাপি না পেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা সমাজে অবহেলিত হয় এবং তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত হয় না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনে এই শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলো সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।