কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। হামলার জন্য ইসলামাবাদকে দায়ী করে ভারতের নেওয়া পদক্ষেপের জবাবে পাকিস্তানও কড়া পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে হুঁশিয়ারি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে এবং একটি নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বিকেলে কাশ্মীরের পেহেলগামের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বৈসারণ উপত্যকায় অতর্কিত হামলায় ২৬ জন নিহত হন। নিহতদের প্রায় সবাই ভারতীয় নাগরিক, একজন নেপালি পর্যটকও রয়েছেন। দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ) নামে একটি স্বল্প পরিচিত গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে, যাদের সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার যোগসাজশ রয়েছে বলে ভারত দাবি করে আসছে। ভারতের পুলিশ বলছে, হামলাকারীদের দুজন পাকিস্তানি নাগরিক।
এই হামলার পরপরই বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে ছিল সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা, যা দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টন সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। এছাড়া পাকিস্তানের নাগরিকদের ভিসা বাতিল করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ, আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ, দিল্লিতে পাক হাইকমিশনের সামরিক উপদেষ্টাদের বহিষ্কার এবং কর্মী সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
ভারতের এই পদক্ষেপকে ‘বেপরোয়া ও দায়িত্বহীন’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির (এনএসসি) বৈঠকে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর ইসলামাবাদ জানায়, তারা ভারতীয় নাগরিকদের দেওয়া সব সার্ক ভিসা (শিখ তীর্থযাত্রী ব্যতীত) বাতিল করছে এবং তাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ছাড়তে হবে। ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ করার পাশাপাশি ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে অবিলম্বে দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মী সংখ্যাও ৩০ জনে নামিয়ে আনতে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি এককভাবে স্থগিত করার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে পাকিস্তান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের প্রাপ্য পানির প্রবাহ বন্ধ বা সরানোর যেকোনো চেষ্টাকে ‘যুদ্ধের শামিল’ গণ্য করা হবে এবং এর মোকাবিলায় ‘জাতীয় সক্ষমতার পূর্ণ শক্তি’ ব্যবহার করা হবে।
এছাড়া, ভারতের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যসহ পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে ভারতের ট্রানজিট বাণিজ্যও স্থগিত করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান বলেছে, ভারত যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া এবং আন্তঃসীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধ না করবে এবং কাশ্মীর বিষয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবসহ আন্তর্জাতিক আইন মেনে না চলবে, ততদিন সিমলা চুক্তিসহ সব দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্থগিত থাকবে।
এদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিহারে এক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে হামলাকারী ও তাদের মদদদাতাদের বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে খুঁজে বের করে ‘কল্পনাতীত পরিণতি’ ভোগ করানোর হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই সন্ত্রাসীদের যত সামান্য ভূমিই থাকুক না কেন, এখনই সময় এসেছে তা ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার।”
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কাশ্মীরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং হামলাকারীদের ধরতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে। বসন্তগড় এলাকায় এক অভিযানে গোলাগুলিতে একজন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন। ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী শুক্রবার শ্রীনগর সফর করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবেন।
অন্যদিকে, ভারত সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার দিল্লিতে বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করেছে এবং একটি সর্বদলীয় বৈঠক করেছে। বৈঠকে বিরোধী দলগুলো সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৯ সালে পুলওয়ামা কাণ্ডের পর দুই দেশের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, তারপর বর্তমান পরিস্থিতিই সবচেয়ে বড় সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে। উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, এটি একটি নতুন সংকট শুরুর বড় ঝুঁকি বহন করছে।