সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বুয়েনস এইরেস থেকে ভ্যাটিকান: এক সাধারণ মানুষের পোপ হয়ে ওঠার গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৫ সালের এপ্রিল মাস। ভ্যাটিকান সিটি তথা সমগ্র ক্যাথলিক বিশ্বের জন্য এক শোকের মাস। ২১শে এপ্রিল, ৮৮ বছর বয়সে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রিয় আধ্যাত্মিক নেতা, যিনি জর্জ মারিও বারগোগ্লিও নামে আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিদায়ও ছিল তাঁর জীবনের মতোই প্রথাবিরোধী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা নিয়ম ভেঙে ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার পরিবর্তে রোমের সান্তা মারিয়া ম্যাগিওর গির্জায় তিনি খুঁজে নিলেন তাঁর শেষশয্যা। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ইচ্ছাপূরণ নয়, বরং তাঁর সমগ্র পোপতান্ত্রিক জীবনের দর্শন – নম্রতা, সরলতা এবং ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও সংস্কারের পথে হাঁটার প্রতীক। এপ্রিল ২৬ লক্ষ লক্ষ শোকার্ত মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি সমাহিত হন, রেখে যান এক বিশাল উত্তরাধিকার।

শেষ বিদায়: অভূতপূর্ব জনসমাগম ও বিশ্বনেতাদের শ্রদ্ধা

পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, এটি ছিল বিশ্ববাসীর সম্মিলিত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। রোমের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স চত্বরে যখন তাঁর কফিন আনা হয়, তখন সেখানে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। প্রায় চার লক্ষ মানুষ, যাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, জড়ো হয়েছিলেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও তাঁর স্ত্রী ব্রিজিট মাখোঁর মতো বিশ্বনেতারা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত ছিলেন এই শোকযাত্রায়, যিনি আগের দিন সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় প্রয়াত পোপের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মূল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ইতালির কার্ডিনাল জিওভান্নি বাতিস্তা রে। তাঁর ভাষণে তিনি পোপ ফ্রান্সিসকে “মানবিক উষ্ণতায় সমৃদ্ধ” এবং “বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জের প্রতি গভীরভাবে সংবেদনশীল” একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি “এই সময়ের উদ্বেগ, কষ্ট এবং আশা ভাগাভাগি করে নিয়েছিলেন।” এই কথাগুলোই যেন পোপ ফ্রান্সিসের বারো বছরের পোপ জীবনের সারসংক্ষেপ।

‘নভেমডায়েলস’ নামে পরিচিত নয় দিনের শোককালের শুরু হয় এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দিয়ে। ভ্যাটিকানের প্রথা অনুযায়ী, পরবর্তী আট দিন ধরে প্রতিদিন সকালে তাঁর স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হবে। এই ক’দিনেও ভ্যাটিকানে মানুষের ঢল নামে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় রাখা তাঁর মরদেহ দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ। শুধু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিনেই সেন্ট পিটার্স চত্বরে সমবেত হয়েছিলেন প্রায় ৫০ হাজার ভক্ত ও অনুরাগী।

প্রথাবিরোধী সমাধি: সান্তা মারিয়া ম্যাগিওরের মাটিতে শয়ন

পোপদের সমাধি সাধারণত ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার নীচেই হয়ে থাকে। কিন্তু পোপ ফ্রান্সিস চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁকে সমাহিত করা হয় রোমের অন্যতম প্রধান ব্যাসিলিকা, সান্তা মারিয়া ম্যাগিওরে। এর মাধ্যমে ১৯০৩ সালে প্রয়াত পোপ লিও ত্রয়োদশের পর, অর্থাৎ এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর, কোনো পোপকে ভ্যাটিকানের বাইরে সমাহিত করা হলো।

এই সিদ্ধান্ত আকস্মিক ছিল না। পোপ ফ্রান্সিস নিজেই তাঁর শেষ ঠিকানা হিসেবে এই গির্জাটিকে বেছে নিয়েছিলেন এবং তাঁর সমাধিও চেয়েছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। তাঁর এই ইচ্ছার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়েই সমাধিফলকে শুধু একটি শব্দ লেখা হয়েছে – ‘ফ্রান্সিসকাস’, যা লাতিন ভাষায় তাঁর পোপ নামের রূপ। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ উপাধি বা দীর্ঘ বর্ণনা নয়, কেবল একটি নাম, যা তাঁর সারল্যের প্রতিচ্ছবি।

সেন্ট পিটার্স চত্বর থেকে স্থানীয় সময় বেলা একটার দিকে পোপের মরদেহ বহনকারী কফিন যাত্রা করে সান্তা মারিয়া ম্যাগিওরের পথে। রোমের রাস্তাঘাট তখন জনসমুদ্রে পরিণত। যে পথ ধরে তাঁর কফিন নিয়ে যাওয়া হয়, তার দু’পাশে প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন শুধু শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে, শ্রদ্ধা জানাতে। বাড়িঘর, শপিংমলের বারান্দা, জানালা – সর্বত্র ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বেলা দুইটার দিকে (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ছয়টা) কার্ডিনাল চেম্বারলেইন কেভিন জোসেফ ফ্যারেলের পরিচালনায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন হয়। গির্জার দরজা বন্ধ করে, প্রথা অনুযায়ী অত্যন্ত গোপনীয়তা এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাঁকে সমাহিত করা হয়। এই পর্বটি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়নি, কিন্তু গির্জার বাইরে তখনো অপেক্ষমাণ ছিল হাজারো শোকার্ত মানুষ। পরদিন, রোববার সকাল থেকে তাঁর সমাধি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

জীবনের পথ: বুয়েনস এইরেস থেকে ভ্যাটিকান

পোপ ফ্রান্সিসের জীবনযাত্রা ছিল এক অসাধারণ রূপান্তর এবং উত্থানের গল্প। ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে তাঁর জন্ম, জর্জ মারিও বারগোগ্লিও নামে। তাঁর বাবা মারিও এবং মা রেগিনা সিভোরি ছিলেন ইতালীয় অভিবাসী, যাঁরা ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান থেকে বাঁচতে আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। বাবা ছিলেন রেলওয়ের একজন সাধারণ হিসাবরক্ষক। এই সাধারণ পরিবারেই বেড়ে ওঠেন ভবিষ্যতের পোপ।

প্রাথমিক জীবনে তাঁর পথ ছিল ভিন্ন। তিনি রসায়নবিদ বা কেমিস্ট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ঈশ্বরের ডাক তাঁকে টেনে আনে ধর্মের পথে। তিনি দর্শন ও ধর্মতত্ত্বে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৬৯ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে একজন ধর্মযাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি ক্যাথলিক চার্চ-এর সাংগঠনিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি নিজ শহর বুয়েনস এইরেসের আর্চবিশপ নিযুক্ত হন, যা ছিল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর্চবিশপ হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার জন্য, তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার অংশীদার হওয়ার জন্য পরিচিতি লাভ করেন। তিনি প্রায়শই গণপরিবহনে যাতায়াত করতেন, বস্তি এলাকা পরিদর্শন করতেন এবং দরিদ্রদের জন্য সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন।

পোপ পদে নির্বাচন ও সংস্কারের বারো বছর

২০১৩ সাল। বিশ্বজুড়ে ক্যাথলিক সম্প্রদায় এক অভাবনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় যখন তৎকালীন পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন – যা ছিল প্রায় ৬০০ বছরের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এই শূন্যতা পূরণের জন্য ভ্যাটিকানে অনুষ্ঠিত হয় কনক্লেভ বা কার্ডিনালদের গোপন ভোটাভুটি। সেখানেই বিশ্বকে চমকে দিয়ে পোপ হিসেবে নির্বাচিত হন আর্জেন্টিনার আর্চবিশপ জর্জ মারিও বারগোগ্লিও। তিনি হলেন লাতিন আমেরিকা থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ এবং যিশুইট সম্প্রদায় থেকে আসা প্রথম পোপ।

পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নিজের জন্য যে নামটি বেছে নেন, তাতেই তাঁর ভবিষ্যতের পথনির্দেশ ছিল – ‘ফ্রান্সিস’। এই নামটি তিনি নিয়েছিলেন আসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের নামানুসারে, যিনি ছিলেন দরিদ্র, প্রকৃতি ও শান্তির প্রতি উৎসর্গীকৃত এক সাধক। এই নাম গ্রহণের মধ্য দিয়েই তিনি বার্তা দিয়েছিলেন যে, তাঁর পোপ জীবন হবে দরিদ্র, নম্রতা ও সেবার প্রতি নিবেদিত।

তাঁর বারো বছরের পোপ জীবন ছিল সত্যিই বৈপ্লবিক। তিনি ক্যাথলিক চার্চ-এর অভ্যন্তরে অনেক উদারনীতি ও সংস্কারের সূচনা করেন, যার জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

* দরিদ্র ও প্রান্তিকদের প্রতি মনোযোগ: তিনি বরাবরই ‘গরিবের বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পোপ হওয়ার পরেও তিনি ভ্যাটিকানের বিলাসবহুল অ্যাপোস্টলিক প্রাসাদের পরিবর্তে সাধারণ গেস্ট হাউস কাসা সান্তা মার্তায় বসবাস করতেন, সাধারণ গাড়ি ব্যবহার করতেন এবং বিশ্বজুড়ে দরিদ্র, শরণার্থী ও অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন।

* আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি: তিনি কেবল ক্যাথলিকদের মধ্যেই নন, বরং অন্যান্য খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সংলাপের উপর জোর দিয়েছিলেন। বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ও যৌথ উদ্যোগ বিশ্ব শান্তির পক্ষে এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল।

* ক্ষমা প্রার্থনা ও স্বচ্ছতা: তাঁর কার্যকালে তিনি চার্চের অতীতের কিছু অন্ধকার অধ্যায়ের মুখোমুখি হন। ধর্মযাজকদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের কাছে তিনি নতশিরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একইভাবে, কানাডার আদিবাসী শিশুদের উপর ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত স্কুলগুলোতে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের জন্যও তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চান, যা ছিল ঐতিহাসিক।

* উদারনৈতিক পদক্ষেপ: তিনি সমলিঙ্গের যুগলদের আশীর্বাদ করার জন্য রোমান ক্যাথলিক যাজকদের অনুমতি দেন, যা চার্চের রক্ষণশীল মহলে বিতর্কের সৃষ্টি করলেও, আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার এক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের চার্চের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের বিষয়েও নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছিলেন।

* সরল জীবনযাপন: তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত অনাড়ম্বর, যা পোপ পদের চিরাচরিত জাঁকজমকের থেকে ছিল একেবারেই ভিন্ন। এই সরলতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের খুব কাছের করে তুলেছিল।

বিশ্বজুড়ে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া

পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুতে কেবল ভ্যাটিকান বা ইতালি নয়, শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্বজুড়ে। তাঁর জন্মভূমি আর্জেন্টিনায়, বুয়েনস এইরেসের ক্যাথেড্রালের সামনে খোলা আকাশের নিচে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। বিশাল ডিজিটাল পর্দায় তাঁর জীবনের নানা মুহূর্ত তুলে ধরা হয়। প্লাজা ডি মায়োতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন তাঁদের প্রিয় ভূমিপুত্রকে শ্রদ্ধা জানাতে। ২৬ বছর বয়সী ড্যানিয়েলা ওয়েন্সেসলাও-এর মতো তরুণরা বলেন, “আমাদের মতো অনেক তরুণ যারা গির্জা থেকে দূরে ছিলাম, ফ্রান্সিসের কাজ আমাদের গির্জার কাছে নিয়ে এসেছে।”

ফিলিপাইনের অভিবাসী ডায়ান কার্লা আবানোর স্মৃতিচারণ পোপ ফ্রান্সিসের ব্যক্তিগত স্পর্শের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০১৮ সালে সেন্ট পিটার্স চত্বরের এক অনুষ্ঠানে পোপ তাঁর দুই ছোট মেয়ের কপালে চুম্বন করেছিলেন। আবানো বলেন, “যে মুহূর্তে আমি পোপের কাছে পৌঁছাই এবং তাঁকে হাসতে দেখি, কেন জানি সেই মুহূর্তে আমার সব ব্যথা আনন্দ ও আশায় রূপান্তরিত হয়েছিল।” এই ছোট ছোট ঘটনাই প্রমাণ করে, তিনি কীভাবে সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন। পূর্ব তিমুর, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের অগণিত দেশে তাঁর জন্য প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।

ভবিষ্যৎ: নতুন পোপের নির্বাচন

পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুর পর এখন দৃষ্টি নিবদ্ধ পরবর্তী পোপ নির্বাচনের দিকে। ভ্যাটিকানের নিয়ম অনুযায়ী, পোপের মৃত্যুর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে নতুন পোপ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই হিসাবে, সম্ভবত আগামী ৬ মের মধ্যেই বিশ্ব পেতে পারে নতুন ক্যাথলিক ধর্মগুরুকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৮০ বছরের কম বয়সী কার্ডিনালরা ভ্যাটিকানে এসে সমবেত হবেন। তাঁরা প্রথমে কিছু প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন এবং তারপর ভ্যাটিকান সিটির সিস্টিন চ্যাপেলের ঐতিহাসিক পরিবেশে প্রবেশ করবেন কনক্লেভের জন্য। রুদ্ধদ্বার কক্ষে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোটাভুটি চলবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না কোনো একজন প্রার্থী দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হচ্ছেন। চ্যাপেলের চিমনি থেকে সাদা ধোঁয়া নির্গত হওয়ার মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জানতে পারবে নতুন পোপের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার খবর।

পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক, শান্তির দূত এবং সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের আপনজন। তাঁর পোপ জীবন ছিল সাহস, সহানুভূতি এবং পরিবর্তনের এক অনবদ্য আখ্যান। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগোনো যায়, কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতাকে স্থান দেওয়া যায়। জীবনের শেষ ইচ্ছার মাধ্যমে, ভ্যাটিকানের বাইরে নিজের সমাধি বেছে নিয়ে, তিনি যেন আরো একবার তাঁর স্বতন্ত্র বার্তাটিই দিয়ে গেলেন – প্রথা ভাঙার সাহস এবং নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার শক্তি। রোমের সান্তা মারিয়া ম্যাগিওরের মাটিতে শায়িত পোপ ফ্রান্সিস হয়তো শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর দর্শন এবং তাঁর অগণিত মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসার ছাপ তাঁকে অমর করে রাখবে। তিনি ছিলেন একবিংশ শতাব্দীর এক আলোকবর্তিকা, যাঁর আলো আগামী দিনেও পথ দেখাবে মানবতাকে।

পাঠকপ্রিয়