সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পাহাড়ে কমছে আবাদি জমি, তবুও বাড়ছে কাঁঠালের উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফল হিসেবেও পরিচিত। এই কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। আর দেশের মধ্যে কাঁঠাল উৎপাদনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের তিন জেলার রয়েছে পুরোনো খ্যাতি। এখানকার পাহাড়ে কাঁঠালের উৎপাদনও ক্রমবর্ধমান। পার্বত্য চট্টগ্রামের ঢালু পাহাড়জুড়ে বিভিন্ন প্রজাতির মৌসুমি ফলের বাগানের পাশাপাশি দেখা মেলে কাঁঠাল গাছের সারি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে কাঁঠাল উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে বান্দরবান। এরপরই রয়েছে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিগত পাঁচ বছরের আবাদ ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এক চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে – পার্বত্য চট্টগ্রামে কাঁঠালের আবাদ ভূমি কিছুটা কমলেও মোট উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বান্দরবান কার্যালয়ের উপপরিচালক এম এম শাহ নেওয়াজ জানান, “বান্দরবান জেলার সব উপজেলায়ই কমবেশি কাঁঠাল আবাদ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে বাজারে কাঁঠাল আসাও শুরু হয়েছে। তবে পুরো জেলার মধ্যে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি উপজেলায় কাঁঠাল উৎপাদন বেশি হয়। অন্যদিকে লামা ও আলীকদমে সমতল ভূমি বেশি থাকায় অন্যান্য ফসলের চাষ বেশি হয়, তাই সেখানে কাঁঠাল উৎপাদন তুলনামূলকভাবে কম।”

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৯-২০ মৌসুমে তিন পার্বত্য জেলায় ৯ হাজার ৪৪২ হেক্টর বাগানে কাঁঠালের ফলন হয়েছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৯৫ টন। পরের বছর, ২০২০-২১ মৌসুমে আবাদ সামান্য কমে ৯ হাজার ৪০৯ হেক্টর হলেও উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০১ টনে। ২০২১-২২ মৌসুমে ৯ হাজার ১৬০ হেক্টরে উৎপাদন আরও বেড়ে ৩ লাখ ৯ হাজার ৬৫৯ টনে পৌঁছায়। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৮ হাজার ৪৪২ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৩০৯ টন এবং সর্বশেষ ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৮ হাজার ৩৮৭ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৭৭০ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়েছে। চলতি মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা এখনো কৃষি বিভাগ নির্ধারণ না করলেও, এবারও কাঁঠালের ভালো ফলনের প্রত্যাশা তাদের।

ডিএই রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “জেলার সব উপজেলায়ই কাঁঠালের আবাদ হয়, তবে সদর, নানিয়ারচর, কাপ্তাই ও কাউখালীতে কিছুটা বেশি। এখন মূলত আগাম জাতের কাঁঠাল বাজারে আসতে শুরু করেছে। মৌসুমি কাঁঠাল পরিপক্ব হতে আরেকটু সময় লাগবে। কাঁঠালসহ অন্যান্য মৌসুমি ফল বিপণনের ক্ষেত্রে এখনো কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়নি। সামনের দিনগুলোতে কৃষকরা কেমন দাম পান, তা বোঝা যাবে।”

স্থানীয় চাষীরা জানিয়েছেন, সাধারণত বছরের এপ্রিল মাস অর্থাৎ গ্রীষ্মের শুরু থেকেই পার্বত্য অঞ্চলের হাটবাজারগুলোতে পাকা কাঁঠাল আসতে শুরু করে। সাপ্তাহিক হাটের দিন ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় চাষীরা বাজারে কাঁঠাল নিয়ে আসেন। এসব কাঁঠাল বাজার থেকে পাইকারি দরে কিনে নেন ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা, যা পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার মাটি কাঁঠাল আবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তিন পার্বত্য জেলার ২৬টি উপজেলার ঢালু পাহাড়ে প্রায় সব ধরনের ফসল উৎপাদন করা গেলেও, কাঁঠাল চাষ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী।

ডিএই রাঙ্গামাটি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাসিম হায়দার উল্লেখ করেন, “কৃষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। কীভাবে চাষাবাদ ও পরিচর্যা করতে হয়, সেসব কৌশল তারা ভালোভাবে রপ্ত করেছেন। বিশেষ করে বান্দরবানে ক্রমাগত কাঁঠাল বাগান ও ফলন বাড়ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণত দুই ধরনের কাঁঠাল চাষ হয় – একটি হলো ‘গালা’ এবং অন্যটি ‘খাঁজা’। তবে ‘আসামি’ নামে আরেকটি প্রজাতি রয়েছে, যা আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বাজারে আসে।”

পাঠকপ্রিয়