সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বাজার স্থিতিশীল রেখে চাষীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের আশ্বাস শিল্প সচিবের

লবণের বাম্পার উৎপাদন, দাম বাড়লেও অস্থিরতা কাটছে না

তরিকুল হাসান

চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে কক্সবাজার ও বাঁশখালী অঞ্চলে লবণের বাম্পার উৎপাদন হচ্ছে। এতে দাম কিছুটা বাড়লেও, আমদানি ও বাজার প্রক্রিয়ার জটিলতায় চাষীদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। মৌসুমের শুরুতে লোকসানের মুখে পড়া প্রান্তিক চাষীরা এখনো উৎপাদন খরচ উঠিয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে পারছেন না বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জানিয়েছে, তীব্র গরম লবণচাষীদের কাছে আশির্বাদ হিসেবে ধরা দিয়েছে এবং গত কয়েকদিনে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে মণ প্রতি লবণের দাম ২৬০-২৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৩১০-৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষীদের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

বিসিকের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে (১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত) কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে। গত ১৭ এপ্রিল বৃষ্টিসহ ঝোড়ো বাতাসে লবণ উৎপাদন ৭ দিন বন্ধ ছিল। এরপর আবার শুরু হয়। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত মৌসুমের পাঁচ মাসে ২১ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। চলতি মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। সে হিসাবে ১৬ মে মৌসুম শেষ হওয়ার আগে প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টনের ঘাটতি থাকতে পারে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ বি হান্নান জানান, গতকাল সোমবার কক্সবাজারে তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই অতি উচ্চ তাপমাত্রার কারণে জমিতে খুব দ্রুত ও প্রচুর লবণ উৎপাদন হচ্ছে। চলমান আবহাওয়া বিরাজ থাকলে প্রতিদিন উৎপাদনের মাত্রা আরও বাড়বে।

মহেশখালীর হোয়ানকের চাষী আমান উল্লাহ জানান, প্রখর তাপের কারণে উৎপাদন অত্যধিক হচ্ছে এবং উৎপাদিত লবণও বেশ পরিপক্ক। এতে চাষীদের মনে এখন স্বস্তি ফিরেছে। কুতুবদিয়া বড়ঘোপের চাষী আবদুল হামিদ বলেন, এতদিন দাম কম ছিল এবং বেশ কিছুদিন টানা বৃষ্টিতে তারা হতাশ ছিলেন, তবে এখন সিজন ভালো।

মহেশখালী লবণচাষী ঐক্য সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি শাহাব উদ্দিন জানান, লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মৌসুমের শুরু থেকে চাষীরা হতাশ ছিলেন এবং লোকসানের কারণে অনেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছিলেন। তাদের দাবি আমলে নিয়ে লবণের দাম কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।

তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম আবারো কমতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, উৎপাদনের সাথে দামের বিষয়টি বেশিরভাগ সময় নির্ভর করে এবং উৎপাদন বাড়লে দাম কমে যাওয়া স্বাভাবিক।

চাহিদা ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হলেও বাজারে বাড়তি লবণের জোগান কীভাবে হয়েছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ লবণ চাষী ও মিল মালিকরা। বিসিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনে মণপ্রতি ৩৪০-৩৫০ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শুরু থেকেই দাম ছিল মণপ্রতি ১৮০-২০০ টাকা। বর্তমানে দাম কিছুটা বেড়ে মণপ্রতি ৩১০-৩২০ টাকায় বিক্রি হলেও উৎপাদন খরচ উঠিয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে পারছেন না প্রান্তিক চাষীরা। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় মিল মালিক ও ব্যাপারীদের কাছে লোকসানে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন মৌসুমেই লবণ ব্যাপারী, ব্যবসায়ীসহ ছোট-বড় মিল মালিকরা কিনে মজুদ করেন। মৌসুম শেষে সরবরাহ কমে এলে তখন দাম বাড়ে, ফলে চাষীদের কোনো লাভ হয় না, মুনাফা করেন ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ রয়েছে, শিল্প সুবিধায় আমদানি করা সোডিয়াম সালফেটসহ বাণিজ্যিক লবণ অবাধে সরবরাহ করায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর আড়ালে ভোজ্য লবণ আমদানি হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান গত রোববার কঙবাজার সফর করে লবণের দামে ন্যায্য পর্যায়ে রাখতে সরকারের করণীয় সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি জানান, চাষীদের টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে লবণ ক্রয় এবং দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে লবণমাঠের বর্গা মূল্য নির্ধারণ, চাষিদের প্রণোদনা, স্বাস্থ্যসেবা ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

লবণ শিল্প উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান ও বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, এখন পর্যন্ত ২১ লাখ টনের বেশি লবণ উৎপাদন হয়েছে। মে মাসের শুরুতে বৃষ্টিতে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হলেও বর্তমানে পুরোদমে উৎপাদন চললেও ১৬ মে মৌসুম শেষ হবে। সেক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হতে পারে। তবে মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম কম থাকায় চাষীরা কষ্টে রয়েছেন বলে তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করে চট্টগ্রামের একটি লবণ মিলের স্বত্বাধিকারী জানান, বড় মিলার ও বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ সোডিয়াম সালফেট ঘোষণা দিয়ে ভোজ্য লবণ আমদানি করছে। এতে প্রান্তিক চাষীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ লাখ টন লবণের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। মূলত আমদানি হওয়া লবণের কারণে চাষীসহ সাধারণ মিলাররা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় দেশীয় লবণ উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দিতে আমদানি প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বিসিকের তথ্যানুযায়ী, গত মৌসুমে ৬৮ হাজার ৩৫৭ একর জমিতে লবণ চাষ করা হয়, যা এ বছর বেড়ে হয়েছে ৬৯ হাজার ১৯৮ একর। এছাড়া চাষীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৬৯৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪১ হাজার ৩৫৫ জন। দেশে ভোজ্য লবণের পাশাপাশি টেক্সটাইল ও শিল্প খাতে লবণের চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ছে।

পাঠকপ্রিয়