ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ অন্যতম এবং এটি প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে একবার পালন করা ফরজ। ‘হজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘সংকল্প করা’ বা ‘কোনো পবিত্র স্থানের দিকে গমন করার ইচ্ছা পোষণ করা’। ইসলামি পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পবিত্র কাবা শরিফ ও সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহ জিয়ারত করাকে হজ বলে। হজের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে, পাপ মোচন করে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করে। এটি কেবল একটি শারীরিক ইবাদতই নয়, বরং এটি আত্মিক, মানসিক এবং আর্থিক ত্যাগের এক সমন্বিত রূপ। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম প্রদর্শনী এই হজ।
হারাম শরিফ: পবিত্রতার কেন্দ্রভূমি
হজের মূল কার্যক্রম যে এলাকাকে কেন্দ্র করে সম্পাদিত হয়, তাকে ‘হারাম শরিফ’ বলা হয়। ‘হারাম’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ নিষিদ্ধ, সম্মানিত বা পবিত্র। এই শব্দটি একটি অতি পবিত্র ও সংরক্ষিত স্থান নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট কাজ নিষিদ্ধ এবং জীব হত্যা বা বৃক্ষ কর্তনও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। মক্কা নগরীর এই হারাম এলাকার সীমানা ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত। বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে এর চতুর্দিকে এই সীমা বিস্তৃত। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, হারাম শরিফের সীমা বায়তুল্লাহর পূর্বে জেরুজালেমের পথে প্রায় ৯ মাইল (প্রায় ১৪.৫ কিলোমিটার), পশ্চিমে জেদ্দার পথে শুআইবিয়া পর্যন্ত প্রায় ১০ মাইল (প্রায় ১৬ কিলোমিটার), উত্তরে মদিনা শরিফের পথে প্রায় ৫ মাইল (প্রায় ৮ কিলোমিটার) এবং দক্ষিণে তায়েফের পথে প্রায় ৭ মাইল (প্রায় ১১ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানের চেয়ে অধিক পবিত্রতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়। এখানে প্রবেশকারী প্রত্যেকেই নিরাপদ, এমনকি জীবজন্তু ও বৃক্ষরাজিও।
হারাম শরিফের প্রাণকেন্দ্র হলো ‘মসজিদুল হারাম’। এটি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মসজিদ, যার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মানব ইতিহাসের প্রথম ইবাদতখানা ‘কাবা শরিফ’। এই মসজিদের প্রতিটি অংশে ইবাদত করলে অন্য স্থানের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায় বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। যুগ যুগ ধরে এই মসজিদটি সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্থাপত্যকর্ম, যেখানে একত্রে লক্ষ লক্ষ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
কাবা শরিফ: তাওহিদের কেন্দ্রবিন্দু

পবিত্র কাবা শরিফ, যা ‘বায়তুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর ঘর’ নামেও পরিচিত, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কিবলা বা প্রার্থনার দিক। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুসলমানরা নামাজ আদায় করুক না কেন, তারা কাবার দিকে মুখ করেই তা করে থাকেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা ও ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)–এর সৃষ্টির পরপরই ফেরেশতাদের দ্বারা, অথবা স্বয়ং হজরত আদম (আ.) কর্তৃক আল্লাহর আদেশে কাবাগৃহের প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। সময়ের বিবর্তনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন কারণে এই পবিত্র গৃহ একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। এযাবৎ কাবা শরিফ প্রায় ১২ বার সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বলে প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। এর মধ্যে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কর্তৃক পুনর্নির্মাণ সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। পরবর্তীতে কোরাইশদের দ্বারা এবং ইসলামের আগমনের পর বিভিন্ন সময়ে খলিফা ও শাসকদের তত্ত্বাবধানে কাবাঘরের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। বর্তমান কাবাঘরের কাঠামোটি মূলত উসমানীয় খলিফা সুলতান মুরাদ খানের সময়ে নির্মিত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে সংস্কারকৃত।
কাবা শরিফের স্থাপত্য সরল হলেও এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম। এটি ঘনকাকৃতির একটি স্থাপনা, যা কালো বর্ণের রেশমি কাপড় ‘কিসওয়া’ দ্বারা আবৃত থাকে। এই কিসওয়া প্রতিবছর হজের সময় পরিবর্তন করা হয়। কিসওয়ার ওপর স্বর্ণখচিত হরফে কোরআনের আয়াত লেখা থাকে, যা এর সৌন্দর্য ও মহিমাকে আরও বৃদ্ধি করে।
হাতিম: কাবাঘরের অংশবিশেষ

কাবা শরিফের উত্তর পাশে, কাবাঘরের মূল কাঠামোর বাইরে একটি অর্ধবৃত্তাকার নিচু দেয়ালঘেরা স্থান রয়েছে, যাকে ‘হাতিম’ বা ‘হিজরে ইসমাইল’ বলা হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই স্থানটুকু পূর্বে মূল কাবাঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কোরাইশরা যখন কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করে, তখন হালাল অর্থের সংকুলান না হওয়ায় তারা কাবাঘরের সম্পূর্ণ অংশ নির্মাণ করতে পারেনি এবং এই অংশটি বাইরে থেকে চিহ্নিত করে রাখে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘হাতিম কাবাঘরেরই অংশ।’ তাই হাতিমের ভেতরে নামাজ পড়া মানে কাবাঘরের ভেতরে নামাজ পড়ার সমান সওয়াব ও মর্যাদা রাখে। এখানে দোয়া কবুলের বিশেষ আশা করা যায়, তাই হজ ও উমরা পালনকারীরা হাতিমে নফল নামাজ আদায় ও দোয়ায় মশগুল হন। এটি দোয়া কবুলের জন্য সর্বোত্তম স্থানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মিজাবে রহমত: রহমতের বারিধারা
হাতিমের ঠিক ওপরে, কাবা শরিফের ছাদের উত্তর দিকে একটি সোনার পরনালা বা পানি নির্গমনের পথ রয়েছে। বৃষ্টির সময় এই পরনালা দিয়ে কাবাঘরের ছাদের জমে থাকা পানি হাতিমের মধ্যে পড়ে। এই পরনালাটি ‘মিজাবে রহমত’ বা ‘রহমতের নালা’ নামে পরিচিত। কথিত আছে, এই পবিত্র পানি যেখানে পড়ে, সেখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা সেই দোয়া কবুল করেন। বৃষ্টির সময় মিজাবে রহমতের নিচে দাঁড়িয়ে বরকতময় পানি গায়ে মাখা এবং দোয়া করাকে অনেকে সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করেন। এটি মূলত স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত এবং এর ওপর আল্লাহর নাম ও বিভিন্ন দোয়া খোদাই করা থাকে।
হাজরে আসওয়াদ: জান্নাতি পাথর

‘হাজরে আসওয়াদ’ অর্থ কালো পাথর। এটি একটি অতি সম্মানিত ও পবিত্র পাথর, যা জান্নাত থেকে আনীত হয়েছিল বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। হজরত আদম (আ.) যখন পৃথিবীতে আসেন, তখন এই পাথরটি তাঁর সঙ্গে আনা হয়েছিল। এটি প্রথমে দুধের চেয়েও সাদা ছিল, কিন্তু বনি আদমের পাপ স্পর্শে এটি ধীরে ধীরে কালো বর্ণ ধারণ করে। পাথরটি মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উঁচুতে কাবাঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, দরজার কাছাকাছি, দেয়ালের বহির্ভাগে প্রোথিত রয়েছে। তাওয়াফ শুরু করার সময় এই পাথরকে চুম্বন করা, স্পর্শ করা অথবা এর দিকে ইশারা করে তাওয়াফ শুরু করা সুন্নত। স্বয়ং নবী করিম (সা.) অত্যন্ত বিনয় ও মহব্বতের সঙ্গে এই পবিত্র প্রস্তরখণ্ডকে চুম্বন করতেন। তবে এটি মনে রাখতে হবে যে, পাথর নিজে কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না; এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কেবল আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সুন্নতের অনুসরণ মাত্র। হজের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা স্পর্শ করার জন্য প্রচণ্ড ভিড় হয়, যা এই পাথরের প্রতি মুসলমানদের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রমাণ।
মুলতাজিম: দোয়া কবুলের বিশেষ স্থান
হাজরে আসওয়াদ ও কাবাঘরের দরজার মধ্যবর্তী দেয়ালের অংশটুকু ‘মুলতাজিম’ নামে পরিচিত। ‘মুলতাজিম’ শব্দের অর্থ হলো ‘আঁকড়ে ধরার স্থান’। এই স্থানটি দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈনগণ এখানে বুক ও গাল লাগিয়ে, হাত প্রসারিত করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও এখানে দোয়া করেছেন বলে বর্ণিত আছে। হাজিগণ তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর অথবা অন্য যেকোনো উপযুক্ত সময়ে মুলতাজিমে এসে আল্লাহর দরবারে নিজেদের হাজত পেশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বিশ্বাস করা হয়, এখানে আন্তরিকভাবে কৃত দোয়া আল্লাহ তাআলা কবুল করেন।
মাকামে ইব্রাহিম: হজরত ইব্রাহিমের পদচিহ্ন
কাবা শরিফের পূর্ব দিকে, তাওয়াফের স্থানের (মাতাফ) প্রান্তসীমায়, একটি কাঁচের আবরণে সুরক্ষিত অবস্থায় একটি পাথরখণ্ড রক্ষিত আছে, এটিই ‘মাকামে ইব্রাহিম’। এই পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কাবাঘরের প্রাচীর গাঁথতেন। যখন দেয়াল উঁচু হয়ে যেত, তখন আল্লাহর কুদরতে পাথরটিও উঁচু হয়ে যেত, যা তাঁকে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। এই পাথরে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কওমের সুস্পষ্ট চিহ্ন বিদ্যমান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন: এবং তোমরা ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর স্থানকে নামাজের স্থানরূপে গ্রহণ করো (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৫)। হজরত ওমর (রা.) প্রথম এই স্থানে স্বতন্ত্রভাবে নামাজ পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াত নাজিল হয়। প্রতিটি তাওয়াফ (সাত চক্কর) সম্পন্ন করার পর এই পবিত্র স্থানের পেছনে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত ‘তাওয়াফের ওয়াজিব নামাজ’ আদায় করতে হয়। যদি ভিড়ের কারণে ঠিক পেছনে জায়গা না পাওয়া যায়, তবে মসজিদুল হারামের যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে এই নামাজ আদায় করা যায়।
জমজম কূপ: আল্লাহর অশেষ কুদরতের নিদর্শন

কাবাঘরের পূর্ব দিকে, মসজিদুল হারাম চত্বরেই ঐতিহাসিক জমজম কূপ অবস্থিত। বর্তমানে মাতাফ বা তাওয়াফের জায়গা সম্প্রসারণের কারণে জমজম কূপের মূল মুখটি ভূগর্ভস্থ চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ওপর থেকে তা ঢেকে দেওয়া হয়েছে। তবে মসজিদুল হারামের সর্বত্র এবং মক্কার বিভিন্ন স্থানে জমজমের পানি সরবরাহ করার সুব্যবস্থা রয়েছে। এই কূপের সৃষ্টি এক অলৌকিক ঘটনার ফসল। আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর আদেশে জনমানবশূন্য মক্কা উপত্যকায় রেখে যান, তখন তাঁদের সঙ্গে থাকা সামান্য খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে যায়। তৃষ্ণার্ত শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.) পানির জন্য ছটফট করতে থাকেন এবং মাটিতে পদাঘাত করতে থাকেন। সন্তানের এই অবস্থা দেখে মা হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে নিকটবর্তী সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পদাঘাতের স্থান থেকে অথবা হজরত জিবরাইল (আ.)-এর পাখার আঘাতে একটি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে। বিবি হাজেরা (আ.) এই পানি দেখে ‘জম জম’ (থামো থামো) বলেন এবং চারপাশে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর চেষ্টা করেন, তাই এর নাম হয় ‘জমজম’। এই কূপের গভীরতা প্রায় ৬০ গজ (প্রায় ১৮০ ফুট) এবং এর মুখের প্রাথমিক প্রসার ছিল প্রায় ৪ গজ। জমজমের পানি অত্যন্ত বরকতময় এবং পুষ্টিকর। হাদিস শরিফে একে ‘খাদ্যের ন্যায় খাদ্য এবং রোগের শেফা’ বলা হয়েছে। হাজিগণ এই পানি প্রাণভরে পান করেন, অজু-গোসল করেন এবং দেশে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যান।
সাফা ও মারওয়া: আল্লাহর নিদর্শন ও সাঈর স্থান
মসজিদুল হারাম শরিফের অতি সন্নিকটে পূর্ব দিকে সাফা ও মারওয়া নামক দুটি ছোট পাহাড় অবস্থিত। এই দুটি পাহাড় বর্তমানে মসজিদুল হারামের সম্প্রসারিত অংশের অন্তর্ভুক্ত। এই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে হজরত বিবি হাজেরা (আ.) তাঁর শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর জন্য পানীয় জলের অনুসন্ধানে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাসহকারে সাতবার ছোটাছুটি করেছিলেন। তাঁর সেই চরম অসহায়ত্ব ও আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য এবং তাঁর ত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে হাজিদের জন্য এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাত চক্কর দ্রুত হাঁটা বা দৌড়ানো (অবস্থানুসারে) ওয়াজিব করা হয়েছে। এই আমলটিকে ‘সাঈ’ বলা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে ব্যক্তি কাবাঘরের হজ বা উমরা সম্পন্ন করে, তার জন্য এই দুটি প্রদক্ষিণ করলে কোনো পাপ নেই (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮)। সাঈ সাধারণত তাওয়াফের পর করতে হয়। এটি হজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরাফাত ময়দান: হজের মূল স্তম্ভ ও মহা সমাবেশের প্রান্তর

আরাফাত মক্কা থেকে প্রায় ৯ মাইল (প্রায় ১৪.৫ কি.মি.) পূর্বে অবস্থিত একটি বিশাল ও প্রশস্ত ময়দান। হজের প্রধান রোকন বা স্তম্ভ হলো ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা, যাকে ‘উকূফে আরাফা’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরাফাতেই হজ। অর্থাৎ, কোনো হাজি যদি নির্ধারিত সময়ে এক মুহূর্তের জন্যও আরাফাত ময়দানে অবস্থান না করে, তবে তার হজ আদায় হবে না। ‘আরাফাত’ শব্দের একটি অর্থ হলো ‘পরিচয়’। কথিত আছে, এই ময়দানেই জান্নাত থেকে পৃথিবীতে প্রেরিত হওয়ার পর হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুনর্মিলন ঘটেছিল এবং তাঁরা পরস্পরকে চিনতে পেরেছিলেন। এখানেই তাঁরা স্বীয় ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তাআলার দরবারে কায়মনোবাক্যে মোনাজাত করেছিলেন এবং তাঁদের তওবা কবুল হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে তাঁদের দোয়ার উল্লেখ রয়েছে: তাঁরা উভয়ে বললেন, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব) (সুরা আরাফ, আয়াত: ২৩)। অন্য আয়াতে আছে, অতঃপর আদম তার প্রতিপালকের কাছ থেকে কিছু বাণী প্রাপ্ত হলো। এরপর আল্লাহ তার তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৭)। ৯ জিলহজ দ্বিপ্রহরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ওয়াজিব। এই সময় হাজিরা আল্লাহর জিকির, তালবিয়া পাঠ, দোয়া-দরুদ, কোরআন তিলাওয়াত ও কান্নাকাটিতে মশগুল থাকেন। আরাফাতের দিন আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
জাবালে রহমত: করুণার পাহাড়
আরাফাত ময়দানের মাঝখানে অবস্থিত একটি ছোট পাহাড় ‘জাবালে রহমত’ বা ‘করুণার পাহাড়’ নামে পরিচিত। এর উচ্চতা প্রায় ৩০০ ফুট। এই পাহাড়ের ওপরেই হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর দোয়া কবুল হয়েছিল। এই পাহাড়ের উপরিভাগে একটি সাদা রঙের স্তম্ভ বা মিনার রয়েছে, যা দূর থেকে দেখা যায়। এই স্থানটির কাছে দাঁড়িয়েই আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ হজ অর্থাৎ বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, যা মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। জাবালে রহমতে আরোহণ করা হজের কোনো অংশ নয়, তবে দোয়া কবুলের আশায় অনেক হাজি এখানে এসে নফল নামাজ আদায় করেন ও মোনাজাত করেন। এই পাহাড় দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্র ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ তালবিয়া ও দরুদ শরিফ পাঠ করার কথা বলা হয়ে থাকে।
মিনা: ত্যাগের উপত্যকা ও কোরবানির স্থান
মক্কা শরিফ থেকে পূর্ব দিকে, মুজদালিফা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার (৩ মাইল) দূরত্বে মিনা উপত্যকা অবস্থিত। মিনা হজের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর অন্যতম কেন্দ্র। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে একনিষ্ট আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার জন্য যে স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ঐতিহাসিক স্থানটিই হলো মিনা। পবিত্র কোরআনে এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: যখন তারা উভয়ে আত্মসমর্পণ করল এবং ইব্রাহিম তাকে কাত করে শায়িত করল, তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে! এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি) (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০৩-১০৫)। হাজিদের হজের সময় বেশ কয়েকদিন মিনায় অবস্থান করতে হয়। ৮ জিলহজ (হজের আগের দিন, যা ইয়াওমুত তারবিয়া নামে পরিচিত) জোহরের নামাজের আগে মিনায় পৌঁছে সেখানে রাত্রিযাপন করা সুন্নত। অতঃপর ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ তারিখে মিনায় রাত্রিযাপন করতে হয় এবং এখানেই পশু কোরবানি করতে হয়। বর্তমানে মিনায় হাজিদের অবস্থানের জন্য লক্ষ লক্ষ আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জামারাত: শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপের স্থান
মিনার প্রান্তরের পশ্চিম দিকে তিনটি স্তম্ভ বা পিলার অবস্থিত, যেগুলোকে একত্রে ‘জামারাত’ (জুমরা শব্দের বহুবচন) বলা হয়। এগুলো ছোট শয়তান (জুমরায়ে উলা বা সুগরা), মেজ শয়তান (জুমরায়ে উস্তা) এবং বড় শয়তান (জুমরায়ে আকাবা বা কুবরা) নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর আদেশে কোরবানি করতে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এই স্থানগুলোতে শয়তান তাঁকে তিনবার কুমন্ত্রণা দিয়ে এই মহান কাজ থেকে বিরত করার চেষ্টা করেছিল। প্রত্যেকবারই হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নাম নিয়ে শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতিকে অনুসরণ করে এবং শয়তানের প্রলোভনের বিরুদ্ধে নিজের ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশের প্রতীক হিসেবে হাজিদের এখানে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। ১০ জিলহজ তারিখে শুধুমাত্র বড় শয়তানকে (জুমরায়ে আকাবা) সাতটি কঙ্কর মারতে হয়। এরপর ১১ ও ১২ জিলহজ তারিখে ক্রমানুসারে ছোট, মেজ ও বড় শয়তানকে সাতটি করে মোট একুশটি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। কেউ যদি ১৩ জিলহজও মিনায় অবস্থান করেন, তবে সেদিনও একইভাবে তিনটি শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। এই কঙ্কর নিক্ষেপ বা ‘রমি’ হজের ওয়াজিবসমূহের অন্যতম।
হজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
উল্লিখিত স্থান ও আমলসমূহ ছাড়াও হজের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যেমন, হজের নিয়তে নির্দিষ্ট স্থান (মিকাত) থেকে ‘ইহরাম’ বাঁধা, যা সেলাইবিহীন সাদা দুটি কাপড় পরিধান করা (পুরুষদের জন্য) এবং কিছু বিধি-নিষেধ মেনে চলার শপথ নেওয়া। ইহরাম অবস্থায় ‘তালবিয়া’ পাঠ করা – “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক” (আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির! তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির! নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই এবং রাজত্বও তোমার, তোমার কোনো শরিক নেই)। এটি আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার এক অপূর্ব ঘোষণা।
আরাফাত থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার দিকে রওনা হওয়া এবং সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করা ও কঙ্কর সংগ্রহ করাও হজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১০ জিলহজ তারিখে বড় শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি, মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা এবং তাওয়াফে ইফাযা (ফরজ তাওয়াফ) সম্পন্ন করার মাধ্যমে হাজিগণ ইহরামের অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হন।
হজ কেবল কতগুলো আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, বরং এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক সফর। এই সফরে একজন মুসলিম তার অতীত জীবনের পাপরাশি থেকে ক্ষমা লাভের সুযোগ পায়, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসার নতুন শপথ গ্রহণ করে এবং বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে। হজের প্রতিটি কাজই প্রতীকী, যা বান্দাকে আল্লাহর নির্দেশ নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়ার শিক্ষা দেয়। হজ থেকে ফিরে এসে একজন হাজি যেন নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে এক নতুন জীবন শুরু করার প্রেরণা লাভ করে। তার আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসাটাই হজের প্রকৃত সার্থকতা। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই পবিত্র হজ নসিব করুন। আমিন।