সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

হার্টের রিং: ভারতে কম, বাংলাদেশে দ্বিগুণ-তিনগুণ দাম, সিন্ডিকেটের কারসাজি?

নিজস্ব প্রতিবেদক

হৃদযন্ত্রের রক্তনালীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী করোনারি স্টেন্ট বা রিংয়ের দাম ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত হলেও একই কোম্পানির একই ব্র্যান্ডের রিং ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের জিম্মি করে একটি চক্র, কিছু অসাধু চিকিৎসক ও আমদানিকারকদের যোগসাজশে এই অতিরিক্ত দাম আদায়ের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় রিং পরানোরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রিংয়ের দাম পর্যালোচনার জন্য সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিভিন্ন প্রকার রিংয়ের দাম ১৪ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত আছে। তবে ভারতের বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, আয়ারল্যান্ডের অ্যাবোট ভাসকুলারের ‘জিয়েন্স প্রাইম’ রিং বাংলাদেশে ৬৬,৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও ভারতে এর দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩২,০৯৫ টাকা। একই কোম্পানির ‘জিয়েন্স আলপাইন’ রিং বাংলাদেশে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা, কিন্তু ভারতে এর দাম প্রায় ৫৪,৫৮৩ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন সায়েন্টিফিকের ‘সিনার্জি’ রিং বাংলাদেশে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা, যা ভারতে ৫৪,৫৮৩ টাকায় পাওয়া যায়। একইভাবে, ভারতে তৈরি ‘মেটাফর’ ও ‘বায়োমাইম’ ব্র্যান্ডের স্টেন্ট বাংলাদেশে যথাক্রমে ৪০ হাজার ও ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও ভারতে উভয়েরই দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩২,০৯৫ টাকা। এমন দামের ফারাক অন্যান্য অনেক ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু চিকিৎসক অপ্রয়োজনেও রোগীদের রিং পরান বা পরামর্শ দেন। রাজধানীর ফজলুর রহমান নামে এক রোগী জানান, বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাকে রিং পরানোর পরামর্শ দেওয়া হলেও আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তিনি ওষুধ সেবন করেন এবং এখনও মোটামুটি সুস্থ আছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে ওষুধেই চিকিৎসা সম্ভব হলেও কমিশনের লোভে কিছু চিকিৎসক রিং পরানোর জন্য উৎসাহিত করেন, যা নৈতিকতাবিরোধী।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেডিকেল ডিভাইস আমদানিকারক সমিতির এক নেতা জানান, রিংয়ের নির্ধারিত মূল্যের মধ্যেই খুচরা বিক্রেতাদের জন্য কমিশন ধরা থাকে, যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়ে থাকে। আরেকজন নেতা বলেন, কার্ডিওলজিস্টদের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের রিংয়ের প্রতি পছন্দ থাকে এবং কোম্পানিগুলো সেভাবেই তাদের ‘ম্যানেজ’ করে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম বলেন, “আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা শতভাগ লাভ করতে চান। সরকারি শুল্ক এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধি দাম বাড়ার কারণ হতে পারে। এছাড়া, সীমিত সংখ্যক আমদানিকারকের মনোপলিও একটি বিষয়।” চিকিৎসকদের কমিশন নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট দামের বাইরে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোম্পানিগুলো তাদের রিং বেশি ব্যবহার করা চিকিৎসকদের বিদেশে কনফারেন্সে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারে।”

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হক বুলবুল মনে করেন, সরকার নির্ধারিত দামও তুলনামূলকভাবে বেশি। তিনি বলেন, “আমরা সার্জারি করি, কিন্তু সঠিক দাম জানতে পারি না। ট্রেড সিক্রেট হিসেবে আমদানিকারকরা দাম প্রকাশ করেন না।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “শুধু রিং নয়, অন্যান্য ওষুধের দাম নির্ধারণেও ঔষধ প্রশাসনের প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বার্থ প্রতিফলিত হয় না। আমদানিকারকরা রাজনৈতিক আনুকূল্যে প্রভাব বিস্তার করেন।” তিনি অপ্রয়োজনীয় রিং পরানোর ঘটনাকে ‘জোচ্চুরি’ আখ্যা দিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির (জেল) দাবি জানান।

এসব প্রেক্ষাপটে, চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সভাপতি করে ১৭ সদস্যের ‘কার্ডিয়াক পরামর্শক স্টেন্ট কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আমদানিকারক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করে এবং প্রতিবেশী চারটি দেশের বাজারদর ও শুল্ক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে রিংয়ের মূল্য নির্ধারণে সুপারিশ করবে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও মুখপাত্র ড. আকতার হোসেন এ বিষয়ে বলেন, “আগে যা-ই হোক, এখন হার্টের রিংয়ের দাম নিয়ন্ত্রিত। নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা নিয়মিত কাজ করছে। শিগগিরই কমিটির বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসবে। সমস্যা ছিল বলেই হয়তো মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে চিন্তা করেছে এবং আমরা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছি।”

দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত এবং অনেকেই অর্থের অভাবে রিং বসাতে পারেন না বা চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পাঠকপ্রিয়