মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ ধোঁয়ায় ধূসর। কয়েক দশকের চাপা উত্তেজনা, চোরাগোপ্তা হামলা আর প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা আজ এক ভয়াবহ, উন্মুক্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। যে সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্ববাসী দশকের পর দশক ধরে করে আসছিল, সেই অশনিসংকেত এখন এক জ্বলন্ত বাস্তবতা। ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামক নজিরবিহীন সামরিক অভিযান এবং তার জবাবে ইরানের ‘ট্রু প্রমিজ–৩’ নামের বিধ্বংসী পাল্টা হামলা শুধু দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো অঞ্চলকে এক অন্তহীন সংঘাতের দাবানলে নিক্ষেপ করেছে, যার লেলিহান শিখা যেকোনো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে।
ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড, পারমাণবিক স্থাপনায় উপর্যুপরি আক্রমণ, আবাসিক ভবনে রক্তক্ষয়ী হামলা এবং উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে পুরো বিশ্ব এক রুদ্ধশ্বাস অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তেহরানের রাস্তায় আতঙ্কিত মানুষের ছোটাছুটি আর তেল আবিবের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি—এই দুই চিত্রই বলে দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন, অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এটি শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব অর্থনীতি এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির ভবিষ্যতের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা।
অপারেশন রাইজিং লায়ন: ইসরায়েলের সুপরিকল্পিত ও বিধ্বংসী আঘাত
এই সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় গত বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, দিবাগত রাতে। কিন্তু এর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রায় ২০০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে ছিল এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার এবং দীর্ঘ পাল্লার বোমারু বিমান, রাতের আঁধার চিরে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। তাদের এই অভিযানের নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’, যা এর তীব্রতা ও লক্ষ্যের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
ইসরায়েলের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়া। ভূগর্ভস্থ এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত নাতাঞ্জ ও ফোর্ডো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হয় ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা। ইসপাহানের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র, যেখানে পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের কাজ চলে, সেটিও ছিল হামলার অন্যতম লক্ষ্য। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ) হামলার পর তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা বাড়েনি বলে জানালেও, এসব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই অভিযান শুধু অবকাঠামো ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সহায়তায় পরিচালিত এই হামলায় ইরানের সামরিক ও বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের ওপর এক চরম আঘাত হানা হয়। নিহত হন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তা, চিফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি এবং দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও দুর্ধর্ষ সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সর্বাধিনায়ক জেনারেল হোসেইন সালামি। একই সঙ্গে হত্যা করা হয় ৯ জন শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীকে, যারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মস্তিষ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ইরানের কমান্ড কাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী প্রচেষ্টা।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতের ভাষ্যমতে, এই হামলায় এখন পর্যন্ত মোট ৭৮ জন ইরানি নাগরিক নিহত এবং ৩২০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে তেহরানের একটি বহুতল আবাসিক ভবনে। একটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি ভবনটিতে আঘাত হানলে ২০টি শিশুসহ প্রায় ৬০ জন বেসামরিক নাগরিক ঘুমের মধ্যেই প্রাণ হারান। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলি হামলা শুক্র ও শনিবারও একই তীব্রতায় অব্যাহত থাকে। এবার তাদের লক্ষ্যবস্তু সম্প্রসারিত হয় ইরানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্থাপনার দিকে। দক্ষিণাঞ্চলের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত ইরানের জ্বালানি খাতের হৃৎপিণ্ড সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে বোমা হামলা চালানো হলে সেখানে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত ইরানের প্রধান নৌঘাঁটি এবং বাণিজ্যিক বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসেও হামলা চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করা এবং পারস্য উপসাগরে তাদের নৌ-চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “আমাদের অভিযান এখনো শেষ হয়নি। ইরানের ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই হামলা চলবে।”

ট্রু প্রমিজ–৩: ইরানের তীব্র ও রক্তাক্ত প্রতিশোধ
ইসরায়েলের এমন ভয়াবহ হামলার জবাবে ইরানও তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পক্ষ থেকে ‘কঠোর প্রতিশোধের’ হুঁশিয়ারির পর শুক্রবার রাতেই আইআরজিসি ‘ট্রু প্রমিজ–৩’ নামে তাদের পাল্টা অভিযান শুরু করে। এই নামটি ইঙ্গিত দেয় যে, এটি তাদের পূর্ববর্তী সংঘাতগুলোর ধারাবাহিকতা এবং এক পরিকল্পিত প্রতিশোধ।
গভীর রাতে ইরানের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে শত শত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন একযোগে ইসরায়েলের দিকে ধেয়ে আসে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র—তেল আবিব এবং ধর্মীয় ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করলেও, বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে শহুরে এলাকায় আঘাত হানে।
তেল আবিবের আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। সাইরেনের প্রচণ্ড শব্দে আতঙ্কিত মানুষজন ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটতে থাকে। ইরানের হামলায় তেল আবিবের একটি বহুতল আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শহরের উপকণ্ঠে আরও কয়েকটি ভবন ধ্বংস হয়ে যায়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এক নারীসহ তিনজন নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৩৪ জন।
ইরানের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, এটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিশোধের শুরু মাত্র। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা দেশটির বার্তা সংস্থা ফারস নিউজকে বলেন, “আগ্রাসনকারীদের জন্য এই হামলা খুবই পীড়াদায়ক হবে। নিজেদের কাজের জন্য তারা অনুতপ্ত হবে।” শুধু তাই নয়, ইরান এই সংঘাতে ইসরায়েলের মিত্রদেরও সরাসরি হুমকি দিয়েছে। এক বিবৃতিতে ইরান সরকার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্স যদি ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমস্ত সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এর মধ্যেই তেহরান তিনটি ইসরায়েলি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত এবং দুজন পাইলটকে আটক করার দাবি করেছে। যদিও ইসরায়েল এই দাবি অস্বীকার করেছে, তবে এই ঘোষণা যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক চাপকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গন: ভূ-রাজনৈতিক দাবাখেলা ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ
এই সংঘাত এখন এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি চালের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত ভূমিকা: ওয়াশিংটন এই সংঘাতে সরাসরি জড়িত থাকার কথা বারবার অস্বীকার করলেও, তাদের ভূমিকা অত্যন্ত বিতর্কিত। হামলার ঠিক আগে ইসরায়েলকে গোপনে ৩০০টি অত্যাধুনিক ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার খবরটি ফাঁস হওয়ার পর ইরানের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। এই লেজার-নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের জন্য উপযুক্ত না হলেও, সামরিক নেতা ও বিজ্ঞানীদের মতো চলমান লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানার জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগাম সতর্কতা এবং ওমানে নির্ধারিত পারমাণবিক আলোচনা থেকে ইসরায়েলি হামলার ঠিক আগে সরে আসা—এই সবকিছুই এক গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে নির্দেশ করছে বলে তেহরান মনে করে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া ও বিভক্তি: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হলেও রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। উভয় পক্ষকে সংযত থাকার একটি দুর্বল আহ্বান জানানো ছাড়া বিশ্ব সংস্থাটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। পোপ চতুর্দশ লিও শান্তির আবেদন জানিয়েছেন। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যেও বিভক্তি স্পষ্ট। পাকিস্তান সরাসরি ইরানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো এক জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে। তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও, নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইসরায়েলকে ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বিশ্লেষণ: ভবিষ্যতের অশনিসংকেত ও সম্ভাব্য পরিণতি
এই বিধ্বংসী সংঘাত কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলছেন, যার প্রতিটিই মানব সভ্যতার জন্য এক অশনিসংকেত।
১. যুক্তরাষ্ট্র কি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে?
এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইরান যদি প্রতিশোধের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় বা কোনো মার্কিন নাগরিক নিহত হন, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে চেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে, যার পরিণতি হবে অকল্পনীয়।
২. বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়:
যুদ্ধের আঁচ এর মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে লাগতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরান যদি পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এর ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মধ্যে নিমজ্জিত হবে।
৩. পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি ও নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা:
ইসরায়েলি হামলা যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়, তবে এর ফল হতে পারে সম্পূর্ণ বিপরীত। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ইরানের নতুন সামরিক নেতৃত্ব সব বাধা উপেক্ষা করে পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করবে। ইরানের পারমাণবিক বোমা অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশরও একই পথে হাঁটতে পারে, যা পুরো বিশ্বকে এক পারমাণবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
৪. ইরানে সরকার পতন ও অরাজকতার আশঙ্কা:
ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ইরানে শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো। কিন্তু ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে, জোরপূর্বক শাসক পরিবর্তনের ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ইরানের মতো একটি বিশাল ও বহু-জাতিগোষ্ঠীর দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের পতন ঘটলে এক চরম ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে। এর ফলে দেশটি এক রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং আইসিসের চেয়েও ভয়ংকর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থানের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশক ধরে চলা ছায়াযুদ্ধ আজ এক উন্মুক্ত, রক্তাক্ত সংঘাতে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষই যখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষার নামে চূড়ান্ত শক্তি প্রয়োগে উদ্যত, তখন কূটনীতি, সংলাপ এবং শান্তির সমস্ত সম্ভাবনা যেন সুদূরপরাহত। এই যুদ্ধের পরিণতি শুধু বিজয় বা পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব নির্ধারণ করে দেবে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী কয়েক দশকের ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ এবং পারমাণবিক অস্ত্রের ভবিষ্যৎ। বিশ্ববাসী আজ এক রুদ্ধশ্বাস আতঙ্কের সঙ্গে তাকিয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির দিকে, কারণ এই আগুনের লেলিহান শিখা থেকে হয়তো কেউই নিরাপদ দূরত্বে থাকতে পারবে না।