গাড়ির চাকা ঘুরছে তো ঘুরছেই। পিচঢালা সর্পিল পথ বেয়ে উঠছি আরও উঁচুতে, তিন হাজার ফুটেরও বেশি। চারদিকে মেঘের ভেলা, শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে শরীরে। জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় নরম মেঘ। নিচে যত দূর চোখ যায়, কেবল সবুজ পাহাড়ের ঢেউ। চূড়াগুলোতেও সাদা মেঘের অবিরাম ওড়াওড়ি। এটি দার্জিলিং বা শিলং নয়, বাংলাদেশেরই বান্দরবানের পূর্বে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বঙ্কুপাড়ার দৃশ্য। একসময় যা ছিল কল্পনাতীত, আজ তাই বাস্তব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শ্রমে-ঘামে নির্মিত সীমান্ত সড়ক এই অদেখা ভুবনকে নিয়ে এসেছে চোখের সামনে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারত ও মিয়ানমার সংলগ্ন হাজার কিলোমিটারের বেশি আন্তর্জাতিক সীমান্ত ছিল কার্যত অরক্ষিত। দুর্গমতার কারণে বহু এলাকায় ছিল না সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির কার্যকর উপস্থিতি। কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় এই বিশাল সীমান্ত ছিল চোরাকারবারি, মাদক পাচারকারী আর বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। কিন্তু সেই দিন এখন অতীত। দেশের সার্বভৌমত্বকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে এক হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক নির্মাণের মহাযজ্ঞ বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। এটি কেবল একটি সড়ক নয়, এটি দুর্গম পাহাড়ের বুকে রাষ্ট্রের চোখ, নিরাপত্তার বর্ম এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি।
সার্বভৌমত্বের নতুন বর্ম
কয়েক বছর আগেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত ছিল শুধুই মানচিত্রে আঁকা একটি রেখা। বাস্তবে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল অনেকটাই নাগালের বাইরে। সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধিনায়ক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামছুল আলম যেমনটা বলছিলেন, “সীমান্তে আমরা অনেক জায়গায় যাচ্ছি, যেখানে অতীতে কারও পদচিহ্ন পড়েনি। এখন আমার জায়গার মালিকানা আমি বুঝে নিচ্ছি। ভিনদেশের কেউ সহজেই বুঝতে পারবে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সোজা কথায় বলতে গেলে, দেশকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি।”
এই সড়ক নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুর্গমতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের সহজে আইনের আওতায় আনতে পারত না। সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে গহীন পাহাড়ে লুকিয়ে থাকত। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আসিফ আহমেদ তানজিল বলেন, “এখন যে এলাকায় সড়ক হচ্ছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কুইক রেসপন্স করতে পারছে। এ কারণে ধীরে ধীরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।” শুধু তা-ই নয়, সড়কের পাশে এখন বিজিবির নতুন ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে, যা সীমান্তকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন এবং আধুনিক রেডিও কমিউনিকেশন ব্যবস্থার সমন্বয়ে নজরদারিও বেড়েছে বহুগুণ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম এই সড়ককে সীমান্তে বাংলাদেশের ‘প্রথম ঢাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, “সড়কটি অনেক আগেই আমাদের করা দরকার ছিল। এই বিস্তৃত সড়কটি চালু হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীরা নিজেদের গুটিয়ে নেবে। তারা এখন বাইরের শত্রুর সহায়তায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।”
বদলে গেছে জীবন, ঘুচে গেছে দূরত্ব
এই মহাযজ্ঞের সবচেয়ে বড় সুফলভোগী পাহাড়ের সাধারণ মানুষ। একসময় যাদের কাছে জেলা শহর ছিল বিদেশের মতো, এই সড়ক তাদের যুক্ত করেছে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে। বান্দরবানের থানচি উপজেলার শালোকিয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাগরিকা ত্রিপুরার কথায় ফুটে ওঠে সেই বদলে যাওয়া জীবনের ছবি। তিনি বলেন, “পাঁচ বছর আগেও বান্দরবান শহরে যেতে আমাদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হতো। মনে হতো যেন বিদেশে যাচ্ছি। প্রথমে থানচি যাওয়ার জন্য রওনা দিতাম, পথে আত্মীয়ের বাড়িতে রাত কাটাতে হতো। সব মিলিয়ে যাতায়াতে লাগত চার দিন। এখন আমরা গাড়িতে করে দিনে দিনে যাতায়াত করতে পারি।”
যোগাযোগের এই বিপ্লব বদলে দিয়েছে পাহাড়ের অর্থনীতি। রাঙ্গামাটির জুরাছড়ি উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী বগাখালী বাজারের কৃষক পুলনাথ চাকমা জানান, আগে তিনি উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পেতেন না। এখন সড়ক হওয়ায় গাড়িযোগে সরাসরি রাজস্থলী কিংবা জেলা শহরে গিয়ে ভালো দামে ফসল বিক্রি করতে পারছেন।
শিক্ষার আলো থেকেও বঞ্চিত ছিল পাহাড়ের শিশুরা। দীর্ঘ ও বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া ছিল অসম্ভব। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সেনাবাহিনী দুর্গম এলাকায় স্থাপন করেছে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে প্রায় ২৫০ জন শিশু বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির গবাইছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান শিক্ষক মিঠুন বাবু চাকমা জানান, এই স্কুলকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
থানচির প্রদীপ পাড়ার বাসিন্দা প্রদীপ ত্রিপুরা আক্ষেপ করে বলেন, “এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, পরিবারের কেউ মারা গেলেও খবর পেতাম না। এসব প্রতিকূলতার কারণে আমি ডিগ্রি কোর্স শুরু করেও শেষ করতে পারিনি।” কিন্তু এখন সড়ক হওয়ায় নতুন প্রজন্ম উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে।
মেঘের রাজ্যে পর্যটনের হাতছানি
নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পাশাপাশি সীমান্ত সড়ক খুলে দিয়েছে পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার। সাজেক বা নীলগিরির বাইরেও যে বাংলাদেশে এত অনিন্দ্যসুন্দর স্থান থাকতে পারে, তা ছিল অকল্পনীয়। বান্দরবানের বঙ্কুপাড়া, রাঙ্গামাটির জুরাছড়ির সাইচল এলাকা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যেকোনো আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রকে হার মানাতে পারে।
সম্প্রতি এই সড়ক ঘুরে আসা পর্যটক জমির উদ্দিনের কণ্ঠে ছিল মুগ্ধতা। তিনি বলেন, “আমি ভারতের দার্জিলিং, শিলং আর কাশ্মির ঘুরেছি। বরফ ঢাকা উপত্যকা, হিমালয়ের কোলে গড়া পথে চলেছি। বাংলাদেশের দুর্গম পাহাড়ে সীমান্ত সড়কের সৌন্দর্য এর চেয়ে বেশি। যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠবে।”
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও এই সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামছুল আলম বলেন, “পুরো কাজ শেষ হলে একজন পর্যটক ফেনী হয়ে রামগড়, তারপর সেখান থেকে শুরু করে তিন পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী সড়ক দিয়ে ঘুমধুম পৌঁছাবে। সেখান থেকে পরবর্তীতে মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে কক্সবাজার পৌঁছাতে পারবে।” বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও এই সড়ককে ঘিরে পর্যটন স্পট নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
প্রকৃতি ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই
তবে মেঘছোঁয়া এই পথ নির্মাণের গল্পটা কোনো রূপকথার মতো সহজ ছিল না। এটি ছিল প্রকৃতি ও শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর সংগ্রামের আখ্যান। সমতলের মতো এখানে একবারে পুরো পথের পরিকল্পনা করা যায় না। কোথাও পাহাড়ের মাটি নরম, মুহূর্তেই ধসে পড়ে; আবার কোথাও পাথরের মতো শক্ত, ড্রিল মেশিন ছাড়া কাটার উপায় নেই। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মাঝিপাড়া এলাকায় মাত্র ৩০০ মিটার সড়ক বানাতে প্রায় দুই মাস সময় লেগেছে, যেখানে ১৫০ থেকে ২০০ লোক দিনরাত কাজ করেছে।
নির্মাণসামগ্রী দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো ছিল আরেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল মো. দেলোয়ার হোসেন তালুকদার বলেন, “একটি ইট সমতলে ১০ টাকা হলে, সেটি সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় ১০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে যায়।” এর সঙ্গে ছিল পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের হুমকি। সন্ধ্যা নামলেই নিরাপত্তার কারণে কাজ বন্ধ করে দিতে হতো।
এই প্রতিকূল পরিবেশে পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন সেনাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক শ্রমিকরা। ২৬ ইসিবিতে কর্মরত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার প্রিয় রঞ্জন চাকমা বলেন, “পাহাড়ে আমাদের প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয়। সহকর্মীদের অনেকে আত্মীয়-স্বজন মারা গেলে শেষবারের মতো দেখতে যেতে পারেন না। তারপরও দেশসেবার লক্ষ্য নিয়ে জীবন বাজি রেখে কাজ করে যাই।”
একটি স্বপ্নের রূপরেখা
২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদনের পর সীমান্ত সড়ক প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের ৩১৭ কিলোমিটারের কাজ প্রায় শেষ, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে পুরো ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সড়কের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ভারত সীমান্তে ৫৬০ কিলোমিটার, মিয়ানমার সীমান্তে ২৭০ কিলোমিটার এবং বাকি ২০৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মিত হবে।
এই সড়ক কেবল ইট-কংক্রিটের নির্জীব কাঠামো নয়। এটি দেশের সার্বভৌমত্বের এক জাগ্রত প্রহরী, পাহাড়ের বুকে অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন মহাসড়ক এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগের এক মায়াবী পথ। একসময়ের বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ এই পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে অপার সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির দিকে।