সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

যেভাবে লোহালক্কড় দিয়ে বদলে যাচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি

চীনের পাহাড়ি ওয়ার্কশপে এক ‘পাগল’ উদ্ভাবকের জন্ম

নিজস্ব প্রতিবেদক

চীনের ইউনান প্রদেশের গভীরে, যেখানে পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা মেঘ আর ঝরনার মৃদু শব্দ প্রকৃতির এক আদিম ঐকতান তৈরি করে, সেখানে এখন শোনা যায় এক নতুন সুর। এটি পাখির কলতান নয়, নয় কোনো ঝরনার কুলকুল ধ্বনি। এ হলো ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সংঘর্ষের শব্দ, ওয়েল্ডিং টর্চের হিসহিস আওয়াজ আর পুরোনো ইঞ্জিনের আকস্মিক গর্জন। শত শত বছর ধরে যে গ্রাম প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দে চলছিল, গত সাত বছর ধরে সেখানে এক ভিন্ন ধারার শিল্পবিপ্লব ঘটে চলেছে। এই বিপ্লবের কেন্দ্রে আছেন ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, গু ইউপেং, যিনি অনলাইন দুনিয়ায় ‘স্ট্রং পিগ’ নামে পরিচিত। পরিত্যক্ত লোহালক্কড়, ভাঙা যন্ত্রাংশ আর নিজের অদম্য কৌতূহলকে পুঁজি করে তিনি এমন সব অদ্ভুত যান তৈরি করছেন, যা শুধু চীনেরই নয়, গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছে।

গ্রামটি এখন আর নিছকই একটি পাহাড়ি জনপদ নয়, এটি এখন এক উদ্ভাবকের কর্মশালা। যে কর্মশালায় ফেলে দেওয়া ইস্পাত, মোটরসাইকেলের পুরোনো ইঞ্জিন, আর নির্মাণাধীন ভবনের ভাঙা কাঠামো নতুন জীবন পায়। গু ইউপেংয়ের হাতে এগুলো রূপান্তরিত হয় বিস্ময়কর সব গাড়িতে—কোনোটি হয়তো খাড়া পাহাড় বেয়ে অনায়াসে উঠে যায়, কোনোটি আবার জলে-স্থলে সমান পারদর্শী উভচর যান, আবার কোনোটি যেন এক চলমান অফিস, যেখানে কাজের ফাঁকে মাছ ধরে ভেজে খাওয়ারও ব্যবস্থা আছে।

তাঁর এই সৃষ্টিশীলতার গল্প এখন চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর কাজ দেখছে, মন্তব্য করছে। কেউ তাঁকে বলছে ‘পাহাড়ি উদ্ভাবক’, কেউ বা ‘চীনের এলন মাস্ক’। একজন মন্তব্য করেছেন, ‘চীনে প্রতিভার অভাব নেই। দরকার শুধু খুঁজে বের করা।’ গু ইউপেংয়ের গল্প যেন সেই খুঁজে বের করারই উপাখ্যান—এক জেদি মানুষের শিকড় থেকে শিখরে ওঠার গল্প, যা চীনের নতুন ‘মেকার’ সংস্কৃতি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

নতুন একটি গাড়ি চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন গু ইউপেংছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে
নতুন একটি গাড়ি চালিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন গু ইউপেংছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে

শিকড় থেকে শিখরে: একঘেয়েমি থেকে মুক্তির পথে যাত্রা

গু ইউপেংয়ের জীবন সবসময় এমন সৃষ্টিশীলতায় ভরা ছিল না। তাঁর জন্ম উত্তর-পূর্ব চীনের হেইলংজিয়াং প্রদেশের কনকনে ঠাণ্ডা আবহে। পড়াশোনা শেষে তিনি একটি অটো পার্টস কারখানায় কাজ শুরু করেন। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি একই ছাঁচে ঢালা যন্ত্রাংশ তৈরি করেছেন। প্রতিদিন একই কাজ, একই নিয়ম, একই উৎপাদন ব্যবস্থা। এই যান্ত্রিক একঘেয়েমি তাঁর ভেতরের সৃষ্টিশীল সত্তাকে ক্রমশ গ্রাস করছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর জন্ম শুধু অন্যের নির্দেশে যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য হয়নি। তিনি স্বাধীনভাবে কিছু করতে চাইলেন, এমন কিছু যা তাঁর নিজের চিন্তার ফসল হবে।

এই ভাবনা থেকেই তিনি বড় এক ঝুঁকি নিলেন। কারখানার স্থিতিশীল জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পা বাড়ালেন। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না। পরপর দুটি ছোট ব্যবসার উদ্যোগে তিনি ব্যর্থ হন। পুঁজি হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অনেকেই হয়তো এই ব্যর্থতার পর পুরনো জীবনে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবত, কিন্তু গু ইউপেং ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যর্থতা মানে শেষ নয়, ব্যর্থতা হলো নতুন কিছু শেখার সুযোগ।’

এই দর্শনকে পুঁজি করেই ২০১৮ সালে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় বাজিটা ধরলেন। মাত্র ৩০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৪ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার), যা তাঁর শেষ সম্বল ছিল, তা নিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশে। হেইলংজিয়াংয়ের শিল্পাঞ্চল থেকে ইউনানের সবুজ পাহাড়—এ ছিল এক আমূল পরিবর্তন। কুনমিং শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, এক প্রায়-বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি গ্রামে তিনি গড়ে তুললেন তাঁর স্বপ্নের একক ওয়ার্কশপ। জায়গাটি ছিল যেমন শান্ত, তেমনই প্রতিকূল। খাড়া পাহাড়ি ঢাল, বর্ষায় ভূমিধসের তীব্র শঙ্কা আর আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে যোজন যোজন দূরত্ব। কিন্তু এই নির্জনতাই ছিল তাঁর জন্য আশীর্বাদ। এখানে প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে তিনি নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা পেলেন।

গু ইউপেং উদ্ভাবিত আরেকটি গাড়িছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে
গু ইউপেং উদ্ভাবিত আরেকটি গাড়িছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে

প্রকৃতি থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা

ইউনানের এই অঞ্চলটি হানি ও নাসা জাতিগোষ্ঠীর বাসস্থান। শত শত বছর ধরে তারা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের জীবন টিকিয়ে রেখেছে। তাদের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো ‘টেরেস পদ্ধতিতে’ চাষাবাদ। এই পদ্ধতিতে তারা খাড়া পাহাড়ি ঢালকে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে কেটে ধানখেত তৈরি করে। প্রতিটি ধাপ এমনভাবে সমতল করা হয় যেন বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়। পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে আসা পানি প্রতিটি ধাপে জমা হয়ে সেচের ব্যবস্থা করে, যা এই রুক্ষ অঞ্চলেও সফলভাবে ধান ফলাতে সাহায্য করে।

গু ইউপেং স্থানীয়দের এই চাষাবাদ পদ্ধতি দেখে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। তিনি দেখেন, কীভাবে ন্যূনতম সম্পদ ব্যবহার করে প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করা যায়। হানি কৃষকদের মতো তিনিও তাঁর পারিপার্শ্বিক অবস্থাকেই নিজের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর কাছে সহজলভ্য ছিল পুরোনো লোহালক্কড় আর ফেলে দেওয়া যন্ত্রাংশ। তিনি ভাবলেন, এই সব অকেজো জিনিস দিয়েই তিনি এমন কিছু তৈরি করবেন যা এই পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিকূলতাকে জয় করতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘স্থানীয়দের জীবন সংগ্রামের পদ্ধতিই আমার কাজের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা।’

নিজের তৈরি একটি গাড়িতে দুজনের সঙ্গে নাশতা করছেন গু ইউপেংছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে
নিজের তৈরি একটি গাড়িতে দুজনের সঙ্গে নাশতা করছেন গু ইউপেংছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে

একাই একশো: ওয়ার্কশপের জাদুকর

গু ইউপেংয়ের ওয়ার্কশপটি যেন এক আধুনিক কামারশালা, যেখানে তিনি একাই সব। তিনিই গাড়ির নকশা করেন, তিনিই ভাঙা লোহা আর পুরোনো যন্ত্রাংশ জোগাড় করে আনেন। তিনিই ইস্পাতের কাঠামো কাটেন, আগুনের ফুলকি ছুটিয়ে ওয়েল্ডিং করেন। গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার কোড বা কন্ট্রোল প্রোগ্রামও তিনি নিজেই তৈরি করেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই সবকিছুর জন্য তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ইন্টারনেট, বই আর নিজের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমেই তিনি সবকিছু শিখেছেন।

তাঁর কাছে কিছুই ফেলনা নয়। পরিত্যক্ত ইস্পাতের পাত, পুরোনো মোটরসাইকেলের শক-অ্যাবসর্বার, বাড়ি তৈরির কাজে ব্যবহৃত আই-বিম, ফেলে দেওয়া নাট-বল্টু—এই সবকিছুই তাঁর কাছে মূল্যবান উপাদান। খরচ বাঁচানোর জন্য তিনি বলতে গেলে নতুন কিছুই কেনেন না। তাঁর কাজের গতিও বিস্ময়কর। গড়ে প্রতি ১০ থেকে ১১ দিনের মধ্যে তিনি একটি সম্পূর্ণ নতুন গাড়ি তৈরি করে ফেলেন। এই অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতায় গত সাত বছরে তিনি ৩০০টিরও বেশি স্বতন্ত্র গাড়ি তৈরি করেছেন, যার প্রতিটিই একে অপরের থেকে আলাদা।

গাড়ির জাদু: কল্পনা যখন বাস্তবে রূপ নেয়

ইউপেংয়ের তৈরি প্রতিটি গাড়িই যেন তাঁর খামখেয়ালি কল্পনার বাস্তব রূপ। তবে এর মধ্যে কয়েকটি গাড়ি তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে।

* ‘অল-টেরেন বেড-কার’: এটি তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উদ্ভাবন। এই গাড়িটি ৪৫ ডিগ্রি খাড়া ঢাল বেয়ে তরতর করে উঠে যেতে পারে, ১ দশমিক ৫ মিটার চওড়া খাদ অনায়াসে পার হতে পারে, এমনকি সিঁড়িও ডিঙিয়ে চলতে পারে। এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো গাড়ির ভেতরে থাকা গুটিয়ে রাখার মতো (ফোল্ডেবল) বিছানা। অর্থাৎ, আপনি চাইলে এই গাড়িতে শুয়ে শুয়েই দুর্গম পাহাড় পাড়ি দিতে পারবেন। দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত হলে যেখানে খুশি গাড়ি থামিয়ে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

* ‘ওয়ার্ক-ডেস্ক ভেহিকল’: এটি আরেকটি অদ্ভুত সুন্দর উদ্ভাবন। এটি আদতে একটি ছোট চলমান অফিস। বড় হাতলওয়ালা আরামদায়ক চেয়ার, কাজ করার ডেস্ক, টেবিল ল্যাম্প—সবই আছে এতে। কিন্তু এর বিশেষত্ব হলো, পুরো কাঠামোটি এমনভাবে বানানো হয়েছে যাতে এটি পানিতে অনায়াসে ভাসতে পারে। ফলে আপনি চাইলে লেকের মাঝখানে ভাসতে ভাসতে অফিসের কাজ সারতে পারবেন। এখানেই শেষ নয়, গাড়ির পাশে একটি ছোট গ্রিল আর মাছ ধরার যন্ত্রও বসানো আছে। কাজের বিরতিতে বা হুট করে খিদে পেলে, পাশের লেক থেকে মাছ ধরে তা ভেজে খাওয়ার ব্যবস্থাও করে রেখেছেন তিনি!

* উড়ুক্কু আবর্জনাপাত্র: তাঁর উদ্ভাবন শুধু গাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দৌউইনে একবার একজন অনুসারী তাঁকে মজা করে লিখেছিলেন, ‘একটা উড়ুক্কু আবর্জনাপাত্র বানাতে পারেন?’ সাধারণ কেউ হলে হয়তো এটিকে নিছকই রসিকতা বলে উড়িয়ে দিত। কিন্তু গু ইউপেং এটিকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন। পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশ আর ড্রোন থেকে নেওয়া প্রপেলার ব্যবহার করে তিনি সত্যিই বানিয়ে ফেললেন এমন একটি ট্র্যাশক্যান, যা রিমোট কন্ট্রোলে উড়তে পারে! এই ঘটনাটি তাঁর দর্শনকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাঁর কাছে উদ্ভাবন মানে শুধু প্রয়োজন মেটানো নয়, বরং কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আনন্দ।

নেট–দুনিয়ার প্রিয় ‘স্ট্রং পিগ’

চীনের নিজস্ব টিকটক ‘দৌউইন’-এ গু ইউপেং ‘শিয়াংঝু’ বা ‘স্ট্রং পিগ’ নামে পরিচিত। নামটি যেমন অদ্ভুত, তাঁর কাজও তেমনই। দৌউইনে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ২৯ লাখেরও বেশি। তাঁর ভিডিওগুলো কোনো পেশাদার ক্যামেরাম্যান দিয়ে শুট করা নয়। সেখানে কোনো চাকচিক্য নেই, আছে কাঁচা বাস্তবতার ঘ্রাণ। কোনো ভিডিওতে দেখা যায়, ইউপেং ওয়েল্ডিং মাস্ক পরে লোহা কাটছেন, কোনোটিতে নতুন বানানো গাড়ি নিয়ে পাহাড়ি পথে পরীক্ষামূলক ড্রাইভে বেরিয়ে পড়েছেন, আবার কোনো ভিডিওতে তিনি তাঁর গাড়ির ‘ডিজাইন ট্যাব’ খুলে দেখাচ্ছেন।

‘ডিজাইন ট্যাব’ হলো তাঁর কাজের পেছনের গল্প। সেখানে তিনি মূল কাজের খুঁটিনাটি, নির্মাণের পদ্ধতি, ব্যবহৃত উপাদান ও বিভিন্ন ধাপগুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর এই স্বচ্ছতা এবং সাধারণ উপস্থাপনাই তাঁকে অনুসারীদের কাছে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে। দৌউইনে তাঁর প্রোফাইলের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিতে (বায়ো) লেখা আছে মাত্র কয়েকটি শব্দ—‘জীবন মানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর আনন্দ।’ এই একটি বাক্যই যেন তাঁর পুরো জীবনের সারসংক্ষেপ।

চীনের নতুন ‘মেকার’ সংস্কৃতি ও গু ইউপেং

গু ইউপেংয়ের কাজ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি চীনের বৃহত্তর এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। ২০১৫ সালের পর থেকে চীন সরকার ‘সাংহুয়ান স্যাংচুয়াং’ নামে একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি চালু করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো—দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিদের একত্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করা। বিশেষ করে ইউনান, সিচুয়ান, গুইঝুর মতো কম উন্নত প্রদেশগুলোতে সরকার ‘মেকার’ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে।

‘মেকার’ সংস্কৃতি হলো এমন একটি সামাজিক ও প্রযুক্তিগত আন্দোলন, যেখানে মানুষ প্রচলিত শিল্পকারখানার উপর নির্ভর না করে নিজেরা নতুন কিছু তৈরি করে, সমস্যার সমাধান করে এবং জ্ঞান ভাগাভাগি করে নেয়। গু ইউপেং এই নতুন ‘মেকার’ সংস্কৃতির একজন আদর্শ প্রতিভূ। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ন্যূনতম সম্পদ এবং স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে বিশ্বমানের উদ্ভাবন সম্ভব।

তাঁর গাড়িগুলো মূলত প্রোটোটাইপ, অর্থাৎ পরীক্ষামূলক নমুনা। তবে সম্প্রতি তাঁর খ্যাতি এতটাই ছড়িয়েছে যে, এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তাঁর এক বন্ধুর মতে, তিনি সম্প্রতি তিনটি ‘বেড-কার’ প্রতিটি ৪০ হাজার ইউয়ান দামে বিক্রিও করেছেন। এটি প্রমাণ করে, তাঁর এই ‘পাগলামি’ এখন শুধু শখ বা আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি টেকসই জীবিকার মডেলেও পরিণত হতে পারে।

পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বর্তমানে চীন সরকার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদের ব্যবহারের উপর ব্যাপক জোর দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গু ইউপেংয়ের কাজ এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেক গবেষক তাঁর এই গাড়িগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে দেখছেন না, বরং শহরের যান্ত্রিক বর্জ্য কমানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবেও বিবেচনা করছেন। ইউনানের পরিবেশবিজ্ঞানী চাও মিং সিং বলেন, ‘ইউপেংয়ের মডেলটি শহুরে বর্জ্যকে গ্রামীণ প্রযুক্তিতে রূপান্তরের একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ হতে পারে।’

 নিজের একটি গাড়ির পরীক্ষা চালাচ্ছেন গু ইউপেংছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে
নিজের একটি গাড়ির পরীক্ষা চালাচ্ছেন গু ইউপেংছবি: সিল্ক, টি অ্যান্ড টেরাকোটা নামের এক্স অ্যাকাউন্টের ভিডিও থেকে

এদিকে, গু ইউপেংয়ের স্বপ্ন এখন আকাশ ছুঁতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমি এখন অনেক কিছু করতে চাই। আমার পরবর্তী লক্ষ্য এমন একটি যানবাহন তৈরি করা, যা জল-স্থল-আকাশ—তিন মাধ্যমেই চলতে পারবে।’ এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি এখন ড্রোনপ্রযুক্তি শেখার চেষ্টা করছেন। পুরোনো কোয়াডকপ্টারের মোটর এবং হালকা ধাতু ব্যবহার করে তিনি একটি ছোট ফ্লাইং-কার বানাতে চান। তবে এর উদ্দেশ্য শুধু আকাশে ওড়া নয়। তিনি চান, এই যানটি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার মতো মানবিক কাজে ব্যবহৃত হবে।

তাঁর এই উদ্ভাবনী চেতনার সুফল এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। হানি সম্প্রদায়ের কৃষক লি হুয়ান বলেন, ‘বর্ষাকালে ভূমিধসে আমাদের রাস্তাঘাট ভেঙে যায়। তখন বাইরের জগতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই সময় ইউপেংয়ের বানানো ট্রাক আমাদের ধান বাজারে পৌঁছে দেয়, অসুস্থ মানুষদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। এটাই আমাদের অ্যাম্বুলেন্স, আমাদের ভরসা।’

গু ইউপেংয়ের গল্প তাই শুধু একজন ব্যক্তির অদ্ভুত সব গাড়ি বানানোর গল্প নয়। এটি মানুষের অদম্য কৌতূহল, প্রতিকূলতাকে জয় করার ইচ্ছা, পুনর্ব্যবহারের দর্শন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে জীবিকা তৈরির এক আধুনিক উপাখ্যান। ইউনানের সেই নিস্তব্ধ পাহাড়ে বসে গু ইউপেং এখনো পরবর্তী উদ্ভাবনের জন্য ধাতুর টুকরা জোড়া লাগিয়ে যাচ্ছেন। উদ্ভাবনের নেশায় তাঁর দিন-রাত একাকার। কে জানে, আগামী সপ্তাহেই হয়তো তাঁর ওয়ার্কশপ থেকে বেরিয়ে আসবে এমন কোনো যান, যা আমাদের কল্পনাকেও হার মানাবে!

পাঠকপ্রিয়