কোরীয় উপদ্বীপের সামরিক অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এবং উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তগুলোর একটি। এখানে কাঁটাতারের বেড়া, ল্যান্ডমাইন আর সশস্ত্র প্রহরীর উপস্থিতি যেন এক চিরস্থায়ী যুদ্ধের নীরব সাক্ষী। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের বাইরেও এখানে এক অদ্ভুত বাস্তবতা চোখে পড়ে। গত মাসে সিউলে নিযুক্ত বিবিসির সাংবাদিক জিন ম্যাকানজি যখন সীমান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন কামানের গর্জনের বদলে তার কানে ভেসে আসছিল অন্য এক সুর। দক্ষিণ কোরিয়ার দিক থেকে বসানো বিশাল সবুজ স্পিকার থেকে বাজছিল জনপ্রিয় কে-পপ গান, আর তার সাথে ভেসে আসছিল উত্তর কোরিয়ার প্রতি সূক্ষ্ম উসকানিমূলক বার্তা। এক নারী কণ্ঠ বলছিল, ‘আমরা যখন বিদেশ ভ্রমণ করি, তখন তা আমাদের উদ্দীপ্ত করে।’—এই কথাটি স্পষ্টতই উত্তর কোরিয়ার সেইসব নাগরিকদের জন্য এক তীব্র ব্যঙ্গ, যারা নিজেদের দেশ ছেড়ে এক পা বাইরে ফেলারও স্বপ্ন দেখতে পারে না।
ওপাশটাও একদম চুপচাপ ছিল না। উত্তর কোরিয়াও তাদের সামরিক প্রচারণার সঙ্গীত বাজিয়ে দক্ষিণের এই বার্তাকে ঢেকে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছিল। এখানে গোলাগুলি নেই, নেই সৈন্যের আস্ফালন, কিন্তু যা চলছে তা কোনো অংশে কম নয়। এটি এক নতুন ধরনের যুদ্ধ—তথ্য যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অস্ত্র হলো পপ সঙ্গীত, টিভি নাটক আর সাধারণ ইউএসবি স্টিক। একদিকে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের ঝলমলে সংস্কৃতি আর স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে লৌহ প্রাচীরের ওপারে, অন্যদিকে কিম জং উন তার একনায়কতন্ত্রের দুর্গ রক্ষা করতে সেই তথ্যপ্রবাহ আটকাতে চালাচ্ছেন নির্মম দমন-পীড়ন। বিশ্বজুড়ে নানা রাজনৈতিক উত্তেজনায় কোরীয় উপদ্বীপের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ফরগটেন ওয়ার’ বা ‘ভুলে যাওয়া যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করে। কিন্তু ৭০ বছর পরেও যে যুদ্ধ শেষ হয়নি, তা এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের প্রতিটি মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিস্মৃতির আড়ালে এক জীবন্ত সংঘাত

কোরিয়া যুদ্ধ (১৯৫০-৫৩) আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো শেষ হয়নি। একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি দুই দেশকে বিভক্ত করে রেখেছে, কিন্তু শান্তিচুক্তি আজও অধরা। এর ফলে দুই কোরিয়া তাত্ত্বিকভাবে এখনও যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই যুদ্ধের রূপ বদলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া আজ বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের গণতন্ত্র, প্রযুক্তি আর কে-পপের বিশ্বজোড়া খ্যাতি আকাশছোঁয়া। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়া কিম পরিবারের স্বৈরশাসনে এক বিচ্ছিন্ন কারাগারে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইন্টারনেট প্রবেশ করতে পারেনি এবং জনগণ বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
এই দুই বিপরীত বাস্তবতাই তথ্য যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বাস করে, যদি উত্তরের সাধারণ মানুষের কাছে তাদের সমৃদ্ধ ও স্বাধীন জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা যায়, তবে কিম জং উনের প্রতিষ্ঠিত মিথ্যার প্রাসাদ একসময় ভেঙে পড়বে। ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মার্টিন উইলিয়ামসের মতে, “কিম জং উনের এই তথ্য নিয়ন্ত্রণের মূল কারণ হলো, কিম পরিবার নিয়ে প্রচলিত গল্পগুলোর বেশিরভাগই মিথ্যা। উত্তর কোরিয়ার জনগণকে এসব মিথ্যা দিয়েই বেঁধে রাখা হয়।” যদি জনগণ জানতে পারে যে, দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ দরিদ্র বা নির্যাতিত নয়, বরং তারা এক উন্নত ও স্বাধীন জীবনযাপন করছে, তবে কিম পরিবারের শাসনের বৈধতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই সত্য ফাঁস হওয়ার ভয় থেকেই কিম জং উন দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতিকে ‘ভয়াবহ ক্যান্সার’ বলে অভিহিত করেছেন, যা তার সমাজকে ‘একটি ভেজা দেয়ালের মতো ভেঙে ফেলবে’ বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
এই যুদ্ধ এখন আর শুধু সীমান্তে লাউডস্পিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পর্দার আড়ালে চলছে আরও ব্যাপক ও সূক্ষ্ম এক লড়াই। এর মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে আধুনিক প্রযুক্তি—রেডিও তরঙ্গ, ইউএসবি স্টিক এবং মাইক্রো-এসডি কার্ড।
পপ সংস্কৃতির পারমাণবিক শক্তি

২০১৮ সালে দুই কোরিয়ার সম্পর্কে যখন কিছুটা উষ্ণতার ছোঁয়া লেগেছিল, তখন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে। দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় কে-পপ গার্ল গ্রুপ ‘রেড ভেলভেট’ উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে ‘স্প্রিং ইজ কামিং’ কনসার্টে পারফর্ম করে। কিম জং উন নিজে তার স্ত্রীকে নিয়ে সেই কনসার্ট উপভোগ করেন। অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাতিল করে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, হলের দর্শকরা ভয়ে চুপচাপ বসে থাকলেও কিম জং উন শিল্পীদের ছন্দে হাততালি দিচ্ছিলেন। সে বছরই কিম জং উনের একটি ছবি ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী আঙুল দিয়ে ‘হার্ট শেইপ’ তৈরি করে বন্ধুত্বের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
এই ঘটনাগুলো কিম পরিবারের এক জটিল দিক তুলে ধরে। একদিকে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতিকে নিজেদের শাসনের জন্য হুমকি মনে করেন, অন্যদিকে তাদের নিজেদের মধ্যেই এর প্রতি এক ধরনের গোপন আকর্ষণ রয়েছে। কিম জং উনের বড় ভাই কিম জং চুল ব্রিটিশ গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটনের একজন বড় ভক্ত হিসেবে পরিচিত।
কিন্তু এই স্বল্পস্থায়ী উষ্ণতা এখন শীতল এক দমন-পীড়নে রূপ নিয়েছে। কিম বুঝতে পেরেছেন, এই সংস্কৃতির প্রভাব নিছক বিনোদন নয়। দক্ষিণ কোরিয়ার টিভি নাটকগুলোতে দেখানো হয় আকাশচুম্বী অ্যাপার্টমেন্ট, দ্রুতগামী গাড়ি, দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার দৃশ্য। এগুলো উত্তরের মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। তারা যখন দেখে, দক্ষিণের সাধারণ মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করছে, তখন তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রিত জীবনের প্রতি প্রশ্ন জাগে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রভাব মারাত্মক। তারা দক্ষিণ কোরীয় নাটক দেখে নিজেদের সঙ্গীদের ‘কমরেড’ এর বদলে ‘ওপ্পা’ (বড় ভাই বা প্রেমিক) বলে ডাকতে শুরু করে, যা কিমের ভাষায় এক ‘বিকৃত’ সংস্কৃতি। তরুণদের পোশাক, চুলের স্টাইল এবং কথাবার্তায় দক্ষিণ কোরীয় প্রভাব এতটাই স্পষ্ট যে, কিম প্রশাসন একে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখছে। আর একারণেই শুরু হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নির্মম সাংস্কৃতিক দমন অভিযান।
তথ্য পাচার: জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক নীরব বিপ্লব

দক্ষিণ কোরিয়ার অলাভজনক সংস্থা ইউনিফিকেশন মিডিয়া গ্রুপ (ইউএমজি)-এর মতো বেশ কিছু সংগঠন এই তথ্য যুদ্ধের একেবারে সম্মুখ সারিতে রয়েছে। প্রতি মাসে তাদের একটি দল উত্তর কোরিয়ার মানুষের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে এমন সব খবর, টিভি নাটক এবং গান দিয়ে একটি প্লে-লিস্ট তৈরি করে। সম্প্রতি তাদের তালিকায় ছিল নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় প্রেমের সিরিজ ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস’ এবং কে-পপ ব্যান্ড ‘ব্ল্যাকপিঙ্ক’-এর তারকা জেনির হিট গান।
এই কন্টেন্টগুলো ইউএসবি স্টিক এবং মাইক্রো-এসডি কার্ডে লোড করা হয়। ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী এগুলোকে ভাগ করা হয়। কম ঝুঁকির ড্রাইভে থাকে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু উচ্চ ঝুঁকির ড্রাইভগুলোতে থাকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং উত্তর কোরিয়ার ইতিহাস নিয়ে তথ্য, যা কিম জং উন সবচেয়ে বেশি ভয় পান।
এই ড্রাইভগুলো প্রথমে চীনের সীমান্তে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ইউএমজি-র বিশ্বস্ত সহযোগীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পেরিয়ে এগুলো উত্তর কোরিয়ায় পৌঁছে দেয়। সেখানে ধরা পড়ার শাস্তি জেল থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ইউএমজি-র পরিচালক লি কোয়াং-বেক বলেন, এই প্রচেষ্টা বৃথা যাচ্ছে না। তিনি জানান, “কিছু মানুষ আমাদের জানিয়েছে যে, এই নাটকগুলো দেখে তারা কেঁদেছে এবং প্রথমবারের মতো নিজের স্বপ্নের কথা ভাবতে শুরু করেছে।”
ঠিক কতজন মানুষ এই তথ্যগুলো দেখতে পাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা জানাচ্ছেন, এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়ছে। লিবার্টি ইন নর্থ কোরিয়া নামের একটি সংস্থার সোকিল পার্ক জানান, “সাম্প্রতিক কালে যারা পালিয়ে এসেছেন, তাদের বেশিরভাগই বলেছেন যে, এসব বিদেশি কনটেন্টই তাদের জীবন বাজি রেখে দেশ ছাড়ার মূল প্রেরণা জুগিয়েছে।”
এক দলত্যাগকারীর চোখে দেখা উত্তর কোরিয়া
২৪ বছর বয়সী কাং গিউরির গল্প এই তথ্য যুদ্ধের প্রভাবকে মূর্ত করে তোলে। উত্তর কোরিয়ায় মাছ ধরার ব্যবসা চালানো এই তরুণী ২০২৩ সালের শেষের দিকে একটি ছোট নৌকায় করে পালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছান। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় অনুপ্রেরণা ছিল লুকিয়ে দেখা বিদেশি টিভি অনুষ্ঠান।
সিউলের এক পার্কে বসে কাং তার শৈশবের কথা স্মরণ করেন। কীভাবে তিনি মায়ের সঙ্গে লুকিয়ে বিদেশি রেডিও শুনতেন, মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রথম কে-ড্রামা হাতে পেয়েছিলেন, আর ফলের বাক্সে ভরে পাচার করা ইউএসবি এবং এসডি কার্ডের গল্প বন্ধুদের কাছে শুনতেন।
“আমি ভাবতাম আমাদের ওপর এত নিয়ন্ত্রণ থাকাটাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু বিদেশি অনুষ্ঠান দেখার পর বুঝলাম, সরকার আমার সঙ্গে মিথ্যা বলেছে। এমন নিয়ন্ত্রণ শুধু উত্তর কোরিয়াতেই আছে,” বলেন কাং। তিনি জানান, সেখানে প্রায় সবাই গোপনে দক্ষিণ কোরিয়ার টিভি অনুষ্ঠান দেখে। বন্ধুদের সঙ্গে তারা জনপ্রিয় নাটক, অভিনেতা এবং কে-পপ তারকাদের নিয়ে আলোচনা করে। বিটিএস-এর সদস্যরাও তাদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়।
“আমরা প্রায়ই দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি কতটা উন্নত, তা নিয়ে কথা বলতাম। তবে সরাসরি শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা করার সাহস পেতাম না,” জানান তিনি। এই অনুষ্ঠানগুলোর প্রভাবে তাদের প্রজন্মের মধ্যে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে বলে তিনি মনে করেন।

কিমের প্রতিরোধ: যখন প্রযুক্তিই পরিণত হয় কারাগারে
কিম জং উন এই ‘ইউএসবি বিপ্লব’ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত। করোনা মহামারির সময় তিনি চীনের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে নতুন বৈদ্যুতিক বেড়া তৈরি করিয়েছেন, যাতে তথ্য প্রবেশ কঠিন হয়ে যায়। ২০২০ সাল থেকে চালু হওয়া নতুন আইন অনুযায়ী, বিদেশি ভিডিও বিতরণ করলে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এর ফলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। লি কোয়াং-বেক বলেন, “আগে এসব ভিডিও খোলা বাজারেও পাওয়া যেত। এখন শুধু খুব বিশ্বস্ত ও কাছের মানুষদের কাছ থেকেই এগুলো সংগ্রহ করা যায়।” কাং গিউরি জানান, কড়াকড়ি শুরুর পর তারা অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়ার ভিডিও দেখার অপরাধে অনেক তরুণের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবরও তিনি শুনেছেন।
কিম জং উন এখন আচরণ দমনেও মন দিয়েছেন। ২০২৩ সালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষা বা উচ্চারণ ব্যবহার করাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেন। ‘ইয়ুথ ক্র্যাকডাউন স্কোয়াডস’ নামে একটি দল শহরের রাস্তায় টহল দেয় এবং তরুণদের পোশাক, চুল ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। কাং জানান, পালানোর আগে তাকে বারবার আটকানো হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পোশাক পরার জন্য তিরস্কার করা হয়েছে। স্কোয়াডের সদস্যরা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে টেক্সট মেসেজ পড়ত, এটা নিশ্চিত করতে যে সে কোনো ‘নিষিদ্ধ’ শব্দ ব্যবহার করেনি।
সম্প্রতি ডেইলি এনকে নামে একটি সংবাদ সংস্থা উত্তর কোরিয়ার একটি মোবাইল ফোন পাচার করে বের করতে সক্ষম হয়। দেখা যায়, ফোনটি এমনভাবে প্রোগ্রাম করা, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো শব্দ লিখলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে গিয়ে উত্তর কোরীয় প্রতিশব্দ বসে যায়—যা জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটি-ফোর’ উপন্যাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ: আশার আলো কি নিভে আসছে?
এই চরম দমন-পীড়নের মুখে তথ্য যোদ্ধারা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। মার্টিন উইলিয়ামসের মতে, এই তথ্য যুদ্ধে উত্তর কোরিয়া এখন “অধিকাংশ দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে”।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে বাইরের দিক থেকে। ২০২৫ সালের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর উত্তর কোরিয়ায় তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত বেশ কয়েকটি সংস্থার তহবিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল রেডিও ফ্রি এশিয়া ও ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ)-র মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম, যারা রাতের বেলা উত্তর কোরিয়ায় রেডিও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করত। হোয়াইট হাউস এই পদক্ষেপের কারণ হিসেবে ‘করদাতাদের থেকে চরমপন্থী প্রচারণার বোঝা কমানো’র কথা বলেছে।
সিউলে ভিওএ-র প্রাক্তন ব্যুরো প্রধান স্টিভ হারম্যান বলেন, “এটি ছিল উত্তর কোরিয়ার মানুষের জন্য বিশ্বকে জানার খুব সীমিত একটি জানালা, যা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বন্ধ হয়ে গেছে।”
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিনের এই তথ্য যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? একদিকে কিম জং উনের নির্মম দমন-পীড়ন এবং প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সীমিত তহবিল আর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলা কিছু সাহসী মানুষ। উত্তর কোরিয়ায় কোনো সংগঠিত বিরোধী দল নেই, তাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
তবুও সোকিল পার্কের মতো মানুষেরা আশা ছাড়েননি। তিনি বিশ্বাস করেন, এই কন্টেন্টগুলো দেখে অন্তত কিছু মানুষ একা একা হলেও প্রতিরোধের পথ খুঁজে পাবে। কাং গিউরির মতো তরুণ-তরুণীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালাচ্ছে, যা প্রমাণ করে তথ্যের শক্তিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করা সম্ভব নয়।
কোরীয় উপদ্বীপের এই বিস্মৃত যুদ্ধ এখন এক নির্ণায়ক মোড়ে দাঁড়িয়ে। এই যুদ্ধ হয়তো কামানের গোলায় জেতা যাবে না, কিন্তু একটি গান, একটি নাটক বা একটি ইউএসবি স্টিক হয়তো কোনো একদিন সেই লৌহ প্রাচীরে ফাটল ধরাতে পারে, যা কয়েক দশকের স্বৈরশাসনেও সম্ভব হয়নি। সেই দিনের অপেক্ষাতেই হয়তো সীমান্তের দুই পারে আজও বেজে চলে দুই ভিন্ন সুর।