সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আপেল-মাল্টায় বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ বাঙালির

নিজস্ব প্রতিবেদক

বছরজুড়ে ফলের দোকানে সহজলভ্য দুটি বিদেশি ফল আপেল ও মাল্টা। এই ফল দুটির স্বাদ নিতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাজারের খুচরা বিক্রয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে খরচের এই বিশাল চিত্রটি উঠে এসেছে। এই বিপুল ব্যয়ের একটি বড় অংশ যেমন গেছে বিদেশি রপ্তানিকারকদের পকেটে, তেমনি ভালো অঙ্কের রাজস্ব পেয়েছে সরকার এবং এর মাধ্যমে দেশে তৈরি হয়েছে বড় একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ১৬ কোটি ১৪ লাখ কেজি আপেল এবং ১৬ কোটি ৮৬ লাখ কেজি মাল্টা আমদানি হয়েছে। সব মিলিয়ে এই দুটি ফলের মোট আমদানির পরিমাণ ৩৩ কোটি কেজি।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এই হিসাবে, গত অর্থবছরে দেশের প্রতিটি মানুষ গড়ে ১ কেজি ৮৭৮ গ্রাম আপেল ও মাল্টা ভোগ করেছেন।

গত অর্থবছরজুড়ে খুচরা বাজারে ফল দুটির দর ওঠানামা করেছে। খুচরা বিক্রেতা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানের আপেল প্রতি কেজি গড়ে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘রয়েল গালা’ জাতের আপেলের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩৪০ থেকে ৩৮০ টাকা। অন্যদিকে, মাল্টা বিক্রি হয়েছে গড়ে ২৮০ টাকা কেজি দরে।

এই গড় দামের হিসাবে, গত অর্থবছরে আপেল কিনতে ক্রেতাদের মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। মাল্টার জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শুধু দুটি ফলের পেছনেই ক্রেতাদের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা।

মাথাপিছু খরচের হিসাবে, ফল দুটি কিনতে বছরে একজন মানুষ গড়ে ৫৬২ টাকা ব্যয় করেছেন। ২০২২ সালের জনগণনা অনুযায়ী দেশে পরিবারের সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ। সেই হিসাবে, প্রতি পরিবারের পেছনে বছরে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টাকা এবং পরিবারপ্রতি গড় ভোগ হয়েছে প্রায় আট কেজি।

অবশ্যই এই গড় হিসাব সবার জন্য সমান নয়। কেউ হয়তো এই হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আপেল-মাল্টা কিনেছেন, আবার অনেকের হয়তো একটিও কেনার সামর্থ্য হয়নি।

১০ হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?

ক্রেতার পকেট থেকে খরচ হওয়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কয়েকটি ধাপে বিভিন্ন খাতে বণ্টিত হয়েছে। এর প্রবাহটি নিম্নরূপ:

১. বিদেশি রপ্তানিকারক: ব্যবসায়ীরা গত অর্থবছরে ১৬ কোটি ১৪ লাখ কেজি আপেল আমদানিতে ব্যয় করেছেন ১০ কোটি ২২ লাখ ডলার (প্রতি কেজিতে গড়ে ৬৩ সেন্ট বা ৭৬ টাকা ৩৫ পয়সা)। এই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৫টি দেশের ৭০২টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের হাতে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সিংহভাগ পেয়েছে চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও পোল্যান্ড। একইভাবে, ১৬ কোটি ৮৬ লাখ কেজি মাল্টা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ডলার, যা ৭টি দেশের ৮৮১টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। এর বড় অংশ গেছে মিসর, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভুটানের কাছে। সব মিলিয়ে বিদেশি বিক্রেতারা পেয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা।

২. সরকারি রাজস্ব: ফল দুটি বন্দর থেকে খালাসের আগে ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রতি কেজি আপেল খালাসের আগে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়েছে গড়ে ১০৩ টাকা। সেই হিসাবে, আপেল থেকে সরকার মোট রাজস্ব পেয়েছে ১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। একইভাবে, মাল্টা থেকে রাজস্ব এসেছে ১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সরকার মোট রাজস্ব পেয়েছে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা।

৩. দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থা ও মুনাফা: ক্রেতার দেওয়া মোট টাকা থেকে বিদেশি রপ্তানিকারকের অংশ ও সরকারি রাজস্ব বাদ দিলে বাকি থাকে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ দেশের অভ্যন্তরে বন্দর খরচ, পরিবহন, সংরক্ষণ, আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফাসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে।

অর্থনীতির অন্য পিঠ: কর্মসংস্থান

আপেল ও মাল্টা আমদানি ক্রেতার পকেট থেকে শুধু অর্থই ব্যয় করে না, দেশের অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে। এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে বড় একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, ফল বেচাকেনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শুধু ফল আমদানি ও বিপণন খাতে সারা দেশে প্রায় ২০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

গত বছর এই দুটি ফল আমদানিতে সরাসরি যুক্ত ছিল ৪৬৯টি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া আমদানিকারক থেকে পাইকারি এবং পাইকারি থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত এই খাতের ওপর নির্ভর করে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় জরিপ ২০২১’ অনুযায়ী, দেশে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফল বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

পাঠকপ্রিয়