সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বদলে যাওয়া রণকৌশল

নিজস্ব প্রতিবেদক

আধুনিক যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রে সৈন্য, অস্ত্র এবং কৌশলের সংঘাত নয়; এটি এখন প্রযুক্তি, তথ্য এবং মনস্তত্ত্বের এক জটিল সমন্বয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এই নতুন বাস্তবতাকে বিশ্বের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এই সংঘাতের অন্যতম অভিনব এবং বিতর্কিত একটি দিক হলো ইউক্রেনের ‘আর্মি অব ড্রোনস: বোনাস’ বা ‘ই-পয়েন্টস’ নামক উদ্যোগ।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউক্রেনীয় সেনারা রুশ সৈন্যদের হত্যা বা তাঁদের সরঞ্জাম ধ্বংস করার বিনিময়ে পয়েন্ট অর্জন করেন, যা অনেকটা ভিডিও গেমের মতো শোনালেও এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং জটিল নৈতিক প্রশ্ন। এই বিশ্লেষণটি ইউক্রেনের এই ‘গেম-সদৃশ’ যুদ্ধরীতির কার্যকারিতা, পেছনের দর্শন, সৈন্যদের ওপর এর প্রভাব এবং আধুনিক যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ সম্পর্কে এর ইঙ্গিতগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

খেলার ছকে যুদ্ধ

‘কল অব ডিউটি’ বা সত্তরের দশকের কোনো টিভি গেম শোর মতো, যেখানে প্রতিটি অর্জনের জন্য পয়েন্ট এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে, ইউক্রেনের ‘ই-পয়েন্ট’ ব্যবস্থাটিও ঠিক একই নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট কোনো ভার্চুয়াল জগৎ নয়, বরং এক নির্মম ও রক্তক্ষয়ী বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র। ইউক্রেনের সরকার ও সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ‘ব্রেভ ১’ নামক একটি দল এই প্রকল্পের মূল চালিকাশক্তি। তাদের প্রণীত নীতি অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস করা লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে পয়েন্টের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

এই ব্যবস্থার কাঠামো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:

* কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু: সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট বরাদ্দ করা হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুশ সরঞ্জাম ধ্বংসের জন্য। যেমন, একটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারলে একটি সেনা ইউনিট সর্বোচ্চ ৫০ পয়েন্ট অর্জন করে। এটি নির্দেশ করে যে, ইউক্রেনীয় কমান্ড কোন ধরনের হুমকিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

* সাঁজোয়া যান: একটি রুশ ট্যাংক পুরোপুরি ধ্বংস করার জন্য ৪০ পয়েন্ট এবং সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ২০ পয়েন্ট দেওয়া হয়। এই বিভাজনটি শুধু ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শত্রুকে দুর্বল করার প্রচেষ্টাকেও স্বীকৃতি দেয়।

* মানব লক্ষ্যবস্তু: সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি হলো মানব জীবনকে পয়েন্টের সঙ্গে যুক্ত করা। প্রাথমিকভাবে একজন রুশ সৈন্যকে হত্যা করার জন্য ২ পয়েন্ট দেওয়া হতো, যা পরে রাশিয়ার কৌশল পরিবর্তনের সাথে সাথে ৬ পয়েন্টে উন্নীত করা হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একজন রুশ সৈন্যকে জীবিত আটক করতে পারলে হত্যার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০ পয়েন্ট দেওয়া হয়। এর কারণ হলো, জীবিত বন্দীরা ভবিষ্যতে বন্দী বিনিময়ের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।

* বিশেষজ্ঞ লক্ষ্যবস্তু: শত্রুপক্ষের ড্রোন অপারেটরদের মতো বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন সৈন্যদের মূল্য সাধারণ সৈন্যদের চেয়ে বেশি ধরা হয়, যা আধুনিক যুদ্ধে প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

এই পয়েন্ট অর্জনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ-নির্ভর। সেনারা ড্রোন বা অন্যান্য ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের প্রতিটি আক্রমণের ভিডিও ধারণ করেন। এই ভিডিও ফুটেজগুলো কিয়েভে একটি কেন্দ্রীয় বিশ্লেষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে একদল বিশেষজ্ঞ প্রতিটি ভিডিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে হামলার সত্যতা যাচাই করেন এবং লক্ষ্যবস্তুর ধরন ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সেনা ইউনিটকে পয়েন্ট প্রদান করেন। এই কঠোর যাচাই-প্রক্রিয়া ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং ভুল তথ্য বা অতিরঞ্জিত দাবির সুযোগ কমিয়ে দেয়।

কৌশলগত লক্ষ্য: নিছক অনুপ্রেরণা নাকি তথ্যভিত্তিক যুদ্ধ?

ইউক্রেনের ডিজিটাল রূপান্তর বিষয়কমন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরোভ, যিনি এই পরিকল্পনার মূল কারিগর, তাঁর মতে এই ব্যবস্থার পেছনে একাধিক গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে। এটি কেবল সৈন্যদের উৎসাহিত করার একটি পদ্ধতি নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী তথ্য সংগ্রহ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার।

১. মানসম্মত উপাত্ত সংগ্রহ: ফেদোরোভের মতে, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “মানসম্মত উপাত্ত পাওয়া”। প্রতিটি সফল বা ব্যর্থ হামলার ভিডিও রেকর্ডিং এবং তার বিশ্লেষণ ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট এবং রিয়েল-টাইম চিত্র প্রদান করে। তারা বুঝতে পারে কোন ধরনের অস্ত্র বা কৌশল শত্রুর বিরুদ্ধে বেশি কার্যকর, শত্রুরা কোথায় তাদের সম্পদ লুকিয়ে রাখছে, এবং তাদের যুদ্ধকৌশল কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। যেমন, ভলোদিয়া নামের একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, রুশরা সরঞ্জাম লুকানো এবং মাটি খুঁড়ে বের করার ক্ষেত্রে পারদর্শী। এই ধরনের তথ্য ড্রোন পাইলটদের আরও কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করতে সাহায্য করে।

২. সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: যুদ্ধ একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, এবং ইউক্রেনের মতো একটি দেশের জন্য সীমিত সম্পদকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। ই-পয়েন্ট ব্যবস্থাটি একটি প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করে, যা সৈন্যদের সবচেয়ে মূল্যবান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে উৎসাহিত করে। যখন একটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার জন্য ৫০ পয়েন্ট এবং একটি পুরোনো ট্রাকে হামলার জন্য কম পয়েন্ট থাকে, তখন সেনারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের সীমিত ড্রোন এবং গোলাবারুদ আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর জন্য সংরক্ষণ করবে। এর ফলে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

৩. অনুপ্রেরণা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রমাগত ক্লান্তি, ভয় এবং অনিশ্চয়তা সৈন্যদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। জ্যাক নামের ২২তম মেকানাইজড ব্রিগেডের একজন সেনার ভাষায়, “আমাদের সেনারা অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সত্যিকার অর্থে এখন আর কোনো কিছুতে তাঁরা উৎসাহ পান না।” এই পরিস্থিতিতে, ই-পয়েন্ট ব্যবস্থা একটি দৃশ্যমান এবং অর্জনযোগ্য লক্ষ্য প্রদান করে। প্রতিটি ধ্বংস করা ট্যাংক বা আটক করা শত্রু সৈন্য যখন পয়েন্টে রূপান্তরিত হয়, তখন তা সৈন্যদের মধ্যে এক ধরনের অর্জনের অনুভূতি তৈরি করে এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়। ফেদোরোভ নিজেও স্বীকার করেছেন, “আমরা যখন পয়েন্টের পরিমাণ বদলাই, তখন দেখি সেনাদের উৎসাহ-উদ্দীপনাও কীভাবে পাল্টে যায়।”

রণাঙ্গনের প্রতিচ্ছবি: সেনাদের চোখে এই নতুন বাস্তবতা

যেকোনো সামরিক কৌশলের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, এবং ই-পয়েন্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইউক্রেনীয় সৈন্যদের মধ্যে এই পদ্ধতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, যা এর কার্যকারিতা এবং সীমাবদ্ধতা উভয়কেই তুলে ধরে।

ইতিবাচক দিক: অনেক সৈন্য এই ব্যবস্থাকে একটি কার্যকর এবং প্রয়োজনীয় উদ্ভাবন হিসেবে দেখছেন। ১০৮তম টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ব্রিগেডের সৈনিক ভলোদিমির এটিকে একটি “ক্ষতিপূরণ” এবং “শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার একটি উপায়” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন ড্রোন এবং অন্যান্য সরঞ্জাম প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে, তখন এই পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহ করাটা তাদের জন্য একটি বড় সুবিধা। ২২তম মেকানাইজড ব্রিগেডের জ্যাকও মনে করেন যে, একবার এর কার্যকারিতা বুঝতে পারলে এটি একটি “যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা”। তাঁর মতে, ক্লান্ত সৈন্যদের জন্য পুরস্কার এবং নতুন ড্রোন পাওয়ার সুযোগ একটি বাস্তবসম্মত অনুপ্রেরণা। এই সৈন্যদের কাছে, যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় টিকে থাকার জন্য যেকোনো কার্যকর সরঞ্জামই স্বাগত।

নেতিবাচক দিক ও সীমাবদ্ধতা: তবে সব সৈন্য এই ব্যবস্থাকে ইতিবাচকভাবে দেখেননি। ‘স্নেক’ নামে পরিচিত এক সেনাসদস্যের মতে, এই পদ্ধতিটি সেনাবাহিনীর মূল সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে না। তার মতে, সৈন্যদের উৎসাহে ভাটা পড়া বা সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো গভীর সমস্যার সমাধান পয়েন্ট দিয়ে করা সম্ভব নয়।

‘দিমিত্র’ নামে আরেকজন সেনাসদস্য আরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি কয়েকটি গুরুতর সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন:

* কৃতিত্বের লড়াই: বিভিন্ন সেনা দলের সদস্যরা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন, যা মূল্যবান সময় নষ্ট করে এবং ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি করতে পারে।

* সিস্টেমের অপব্যবহার: কিছু সৈন্য বেশি পয়েন্ট লাভের আশায় রাশিয়ার পুরোনো এবং ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়িতে হামলা করে। এটি কেবল গোলাবারুদের অপচয়ই নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে।

* নৈতিক অবক্ষয়: দিমিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অভিযোগটি হলো নৈতিকতা সংক্রান্ত। তিনি বলেন, “এ ব্যবস্থা আমাদের এমন মানসিকতার ফল, যেখানে আমরা সবকিছু মুনাফার সঙ্গে জড়িয়ে বিবেচনা করি। এমনকি আমাদের নিজের মৃত্যুকেও।” এই মন্তব্যটি যুদ্ধকে ‘গ্যামিফাই’ বা খেলার ছকে ফেলার অন্তর্নিহিত বিপদকে নির্দেশ করে, যেখানে জীবন-মৃত্যুর মতো গভীর বিষয়গুলো নিছক পয়েন্ট অর্জনের খেলায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

নৈতিকতার সংকট: যখন জীবন-মৃত্যু পয়েন্টের হিসাবে বাঁধা

ই-পয়েন্ট ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় এবং জটিল প্রশ্নটি হলো এর নৈতিকতা নিয়ে। শত্রুপক্ষের একজন সৈন্যকে হত্যা করার জন্য পয়েন্ট অর্জনের ধারণাটি স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিকর। এটি যুদ্ধকে আরও এক ধাপ অমানবিক করে তোলার এবং সৈন্যদের মানসিকতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা তৈরি করে।

দিমিত্রের “মুনাফার মানসিকতা” বিষয়ক মন্তব্যটি এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। যখন একজন মানুষকে হত্যা করা একটি “লেনদেন” বা “অর্জন” হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই কাজের নৈতিক গুরুত্ব হ্রাস পায়। এটি সৈন্যদের মধ্যে এক ধরনের সংবেদনহীনতা তৈরি করতে পারে, যেখানে শত্রুকে আর মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল ‘পয়েন্ট’ বা ‘লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে নির্মূল করাই মূল লক্ষ্য, কিন্তু এই প্রক্রিয়াটিকে যখন একটি পুরস্কার ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন তা এক ধরনের বিকৃত উদযাপনে পরিণত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ড্রোন হামলার ভিডিওগুলোতে শত্রুর “মৃত্যু উদযাপন” করার প্রবণতা এই মানসিকতারই প্রতিফলন।

তবে এর অন্য একটি দিকও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একজন রুশ সৈন্যকে হত্যা করার জন্য ১ পয়েন্ট, কিন্তু জীবিত আটক করার জন্য ১০ পয়েন্ট দেওয়ার ব্যবস্থাটি একটি কৌশলগত এবং কিছুটা হলেও মানবিক দিক নির্দেশ করে। কারণ জীবিত বন্দীরা যেমন বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের সৈন্যদের ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে, তেমনই এই পয়েন্ট ব্যবস্থাটি সৈন্যদের হত্যা করার চেয়ে আটক করতে বেশি উৎসাহিত করতে পারে। যদিও এর পেছনের মূল কারণ কৌশলগত, তবু এর ফলস্বরূপ কিছু জীবন বেঁচে যেতে পারে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি আধুনিক যুদ্ধের এক নির্মোহ এবং প্রায় করপোরেট মানসিকতার প্রতিফলন, যেখানে প্রতিটি ক্রিয়াকে তার কার্যকারিতা এবং দক্ষতার নিরিখে পরিমাপ করা হয়, নৈতিকতার নিরিখে নয়।

বদলে যাওয়া রণকৌশল ও ‘যুদ্ধের অ্যামাজন’

ই-পয়েন্ট ব্যবস্থাটি একটি স্থির বা অপরিবর্তনশীল কাঠামো নয়। এটি যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে। রাশিয়ার যুদ্ধকৌশল বদলানোর সাথে সাথে ইউক্রেনও তাদের পয়েন্ট ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। যেমন, মস্কো যখন সাঁজোয়া যানের পরিবর্তে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে চলাচলকারী ছোট ছোট দল পাঠানো শুরু করে, তখন ইউক্রেনীয় কমান্ড পদাতিক সৈন্য হত্যার জন্য পয়েন্টের পরিমাণ ২ থেকে বাড়িয়ে ৬ করে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, এই ব্যবস্থাটি একটি জীবন্ত এবং প্রতিক্রিয়াশীল কৌশলগত হাতিয়ার।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং উল্লেখযোগ্য বিবর্তন হলো ‘ব্রেভ-১ মার্কেট’ নামক একটি ডিজিটাল বাজারের সংযোজন, যাকে এর ডিজাইনাররা “যুদ্ধের অ্যামাজন” বলে অভিহিত করেছেন। পূর্বে, সেনা ইউনিটগুলো তাদের অর্জিত পয়েন্টকে নগদ অর্থে রূপান্তর করত এবং সেই অর্থ দিয়ে সরঞ্জাম কিনত। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায়, তারা তাদের জমানো পয়েন্ট ব্যবহার করে সরাসরি ‘ব্রেভ-১ মার্কেট’ থেকে ১,৬০০-এর বেশি সামরিক পণ্য অর্ডার করতে পারে।

এই ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসটি বেশ কয়েকটি সুবিধা প্রদান করে:

* দ্রুত সরবরাহ: এটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ এবং আমলাতান্ত্রিক ক্রয় প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে সৈন্যদের হাতে সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়।

* সরাসরি প্রতিক্রিয়া: সেনারা কোনো সরঞ্জাম ব্যবহারের পর তার কার্যকারিতা সম্পর্কে রিভিউ দিতে পারে, যা প্রস্তুতকারকদের তাদের পণ্য উন্নত করতে এবং অন্যান্য ইউনিটকে সঠিক সরঞ্জাম বেছে নিতে সাহায্য করে।

* স্বচ্ছতা: প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সরাসরি এই কেনাকাটার জন্য অর্থ প্রদান করে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ করে তোলে।

এই “যুদ্ধের অ্যামাজন” ধারণাটি যুদ্ধ এবং প্রযুক্তিগত বাণিজ্যিকীকরণের এক চূড়ান্ত উদাহরণ। এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে অর্জিত পয়েন্ট ব্যবহার করে সেই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য আরও উন্নত সরঞ্জাম কেনা হয়।

আধুনিক যুদ্ধের নির্মোহ বাস্তবতা

ইউক্রেনের ‘ই-পয়েন্ট’ ব্যবস্থাটি আধুনিক যুদ্ধের এক যুগান্তকারী কিন্তু অস্বস্তিকর চিত্র তুলে ধরে। এটি একদিকে যেমন প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং উদ্ভাবনী চিন্তার মাধ্যমে একটি দেশের সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার অসাধারণ সক্ষমতার প্রমাণ, তেমনই অন্যদিকে এটি যুদ্ধের অমানবিকীকরণ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিকেও সামনে নিয়ে আসে।

এই ব্যবস্থাটি প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রগুলো কেবল ভৌত জগতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ডিজিটাল এবং মনস্তাত্ত্বিক জগতেও এর বিস্তৃতি ঘটবে। ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সৈন্যদের মনোবল ধরে রাখার জন্য ‘গ্যামিফিকেশন’-এর মতো কৌশল ভবিষ্যতে আরও অনেক দেশের সেনাবাহিনী গ্রহণ করতে পারে।

তবে শত্রুপক্ষের সেনাদের হত্যার জন্য পয়েন্ট পাওয়া এবং সেই পয়েন্ট দিয়ে ‘যুদ্ধের অ্যামাজন’ থেকে কেনাকাটা করার ধারণাটি মানবতাকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ইউক্রেনের জন্য এটি হয়তো টিকে থাকার লড়াইয়ে একটি প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর কৌশল। কিন্তু বিশ্ববাসীর জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা—প্রযুক্তি যখন যুদ্ধের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যায়, তখন দক্ষতা এবং কার্যকারিতার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা যেন সেই মৌলিক মানবিক মূল্যবোধগুলো হারিয়ে না ফেলি, যা আমাদের অমানবিক হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখে। যুদ্ধ নির্মম, কিন্তু সেই নির্মমতাকে যখন পয়েন্ট, পুরস্কার এবং বাজারের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন তা যুদ্ধের প্রকৃতি এবং মানব অস্তিত্বের জন্য এক নতুন এবং গভীর সংকট তৈরি করে।

পাঠকপ্রিয়