চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিসে আজ (রোববার) দিনভর ছিল টানটান উত্তেজনা। সাধারণ একটি দিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দলের আকস্মিক আগমনে নড়েচড়ে বসেছেন সবাই। উপলক্ষ্য—এক থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানানো ভূমি জালিয়াতির তদন্ত, যেখানে নিছক কলমের খোঁচায় প্রায় ৩৮ শতক সরকারি জমি পরিণত হয়েছে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে!
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু নগরের হালিশহর থানার রামপুর মৌজার প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একখণ্ড জমি। সরকারি নথিপত্রে যেটি ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ (এপি) হিসেবে চিহ্নিত। আইন অনুযায়ী, এ ধরনের সম্পত্তি সরকারের অনুমতি ছাড়া হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করাই যেন এখানকার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘জাদুকরি’ দক্ষতা!
যেভাবে ঘটলো এই ‘কাগুজে জাদু’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই জালিয়াতির মূল কারসাজিটি করা হয়েছে সরকারি নিবন্ধন খাতা বা ‘বালাম বই’-এ। পরিত্যক্ত সম্পত্তির কঠোর বিধিবিধান এড়াতে দুর্বৃত্ত চক্রটি বালাম বইয়ে ঘষামাজা করে ‘পরিত্যক্ত’ শব্দটিকে বানিয়ে দিয়েছে ‘অর্পিত’ (ভিপি)। এই একটি শব্দ পরিবর্তনের মাধ্যমেই খুলে যায় জালিয়াতির পরবর্তী সব দরজা। কারণ, অর্পিত সম্পত্তির মালিকানা বদলের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শিথিল।
এই কাগুজে জাদুর ওপর ভর করেই জমিটি এ পর্যন্ত তিন-তিনবার বিক্রিও হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই নিখুঁতভাবে করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে তা কারও নজরেই আসেনি।
ছোট এক ভুলে ফাঁস হলো বড় জালিয়াতি
এই বিশাল জালিয়াতির মুখোশ উন্মোচিত হয় খুবই সাধারণ একটি ঘটনা থেকে। চলতি বছরের শুরুতে মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি জমিটির খাজনা পরিশোধের জন্য ভূমি অফিসে আবেদন করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই জমিটি ভোগদখল করে আসছিলেন। তার আবেদন পেয়েই কর্মকর্তারা নথি যাচাই করতে গিয়ে খটকার মধ্যে পড়েন। তারা দেখতে পান, কামাল উদ্দিনের নামে যে খতিয়ানটি তৈরি হয়েছে, তাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সই নেই।
গভীরে অনুসন্ধান করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে কেঁচো খুঁড়তে সাপ! দেখা যায়, যে দাগ ও খতিয়ানের ভিত্তিতে আবেদন করা হয়েছে, সেটি আসলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি, যা বালাম বইয়ে ঘষামাজা করে অর্পিত দেখানো হয়েছে।
তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা ও দুদকের প্রবেশ
অবশ্য জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ মে আগ্রাবাদ সার্কেল ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত কানুনগো তনক চাকমাকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। কিন্তু এসব অভ্যন্তরীণ তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক তনক চাকমা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একইভাবে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও দিয়েছেন গতানুগতিক উত্তর। আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর হাসান বলেন, “আমরা তদন্ত করে কিছু অসংগতি পেয়েছিলাম। সরকারি স্বার্থ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে জেলা প্রশাসনের এই ধীরগতির তদন্তের মধ্যেই অবশেষে মাঠে নেমেছে দুদক। আজ (রোববার) দুদকের একটি দল আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে অভিযান চালিয়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগ্রহ করেছে। দুদক চট্টগ্রামের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমাদের দল আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে নথিপথ সংগ্রহ করেছে।” দুদকের এই পদক্ষেপে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
কী এই পরিত্যক্ত সম্পত্তি?
ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, জমিটি মূলত ১৯৬৪ সালে মেসার্স আশরাফ অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান কিনেছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক পাকিস্তান চলে গেলে জমিটি সরকারি তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, “তদন্তে যদি জালিয়াতির প্রমাণ মেলে, তবে এটি গুরুতর অপরাধ। পরিত্যক্ত বা অর্পিত—যেকোনো সরকারি সম্পত্তি হস্তান্তরে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মানতে হয়।”
এই একটি ঘটনাই হয়তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র। আগ্রাবাদ ভূমি অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, জাল খতিয়ান ও ভুয়া ওয়ারিশ সনদ তৈরির মতো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের তদন্তে এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতারা বেরিয়ে আসে কি না এবং সরকারি সম্পদ লুটের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্য বন্ধ হয় কি না। চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এখন দুদকের দিকেই তাকিয়ে আছে।