মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারী প্রাসাদের জৌলুস পেছনে ফেলে কিছুটা এগিয়ে গেলেই পথিকের চোখে পড়বে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভগ্নপ্রায় সিংহদরজা। খসে পড়া পলেস্তারা আর বেরিয়ে থাকা লাল ইটের শরীরজুড়ে যেন লেগে আছে ২৬৮ বছরের দীর্ঘশ্বাস। এই দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই গা ছম ছম করে ওঠে, মনে হয় যেন এক টাইম মেশিনে চড়ে ফিরে গেছি ১৭৫৭ সালের সেই অভিশপ্ত সময়ে।
চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে এক বিধ্বস্ত তরুণ বন্দীর ছবি, যাকে এই দরজা দিয়েই টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার নাম মীর সৈয়দ জাফর আলি খান মির্জা মুহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। আর যে প্রাসাদ-তোরণ দিয়ে তাকে সেদিন প্রবেশ করানো হয়েছিল, আড়াই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে স্থানীয়দের কাছে তার পরিচয় ‘নিমকহারাম দেউরি’ বা বিশ্বাসঘাতকের দরজা। কারণ, এই প্রাসাদ স্বয়ং মীর জাফর আলি খানের।
বিকল্প ইতিহাস: সিরাজকে আমরা মারিনি, বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম
ইতিহাসের প্রচলিত ধারণা, এই প্রাসাদেই মীর জাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল সিরাজকে। কিন্তু মীর জাফরের বংশধররা যে গল্প বংশপরম্পরায় শুনে এসেছেন, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, সিরাজকে হত্যা করেছিল ব্রিটিশ সৈন্যরা।
“আমি আমাদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছেই শুনেছি যে সিরাজকে বন্দী করার পর মীর জাফর ইংরেজদের আসল চাল বুঝতে পারেন,” বলছিলেন মীর জাফরের অষ্টম প্রজন্মের বংশধর সৈয়দা তারাৎ বেগম। “তিনি পুত্র মীরণকে পাঠিয়েছিলেন সিরাজকে গোপনে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু পাহারায় থাকা দুই ব্রিটিশ সিপাহী সেই পরিকল্পনা জেনে ফেলে এবং সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করে সিরাজকে হত্যা করে।”
লালবাগ কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক ফারুক আবদুল্লাও এই পরিবারের কাছ থেকে শোনা আরেকটি ঘটনার কথা বলেন, “সিরাজকে হত্যার পর তার দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে হাতির পিঠে চাপিয়ে শহর ঘোরানো হয়েছিল। এখনকার সরাইখানা এলাকায় সাধারণ মানুষ সেই দৃশ্য দেখে রুখে দাঁড়ায়। ভয়ে সিপাহীরা দেহখণ্ড ভরা বস্তাটি একটি কুয়োতে ফেলে পালিয়ে যায়।”
গ্লানির উত্তরাধিকার: “খারাপ হলেই মীর জাফরের বংশধর”
পলাশীর যুদ্ধের পর ২৬৮ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ‘বিশ্বাসঘাতক’-এর অপবাদ আজও ধুয়েমুছে যায়নি। এই গ্লানির ভার আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন মীর জাফরের উত্তরসূরীরা। মুর্শিদাবাদ, কলকাতা থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড, আমেরিকায় ছড়িয়ে থাকা প্রায় তিন হাজার বংশধরের কাছে ‘মীর জাফরের পরিবার’—এই পরিচয়টি কখনো গর্বের, কখনো বা তীব্র বিদ্রূপের।
সৈয়দা তারাৎ বেগম আক্ষেপের সুরে বলেন, “মীর জাফরকে নিয়ে ইংরেজরা তো খেলা করল, একটা গোটা বংশকে নিয়েই খেলল। দেশের মানুষ সেটা বুঝতে না পেরে মীর জাফরকে শিখণ্ডী বানিয়ে বিশ্বাসঘাতক করে দিল। আজও এই পরিবারের কেউ খারাপ কিছু করলে লোকে বলে, ‘মীর জাফরের বংশধর তো, এমনটাই করবে’। আর ভালো কিছু করলে বলে, ‘এটা মুর্শিদাবাদের লোক’।”
তাদের প্রশ্ন, যদি মীর জাফর বিশ্বাসঘাতকই হবেন, তবে কেন ব্রিটিশরা তাকেও মসনদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল? কেন তার জামাই মীর কাশিমকে নবাব বানিয়েছিল?

“গাদ্দারিটা কোথায়, প্রমাণ করুন”
মীর জাফরের আরেক বংশধর, সৈয়দ মুহাম্মদ বাকের আলি মির্জা সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। তার কথায়, “বলা হয় উনি ট্রেচারি বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। কী ট্রেচারি? যুদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু তিনি প্রধান সেনাপতি হয়েও যুদ্ধে অংশ নেননি। এর জন্য যদি বিশ্বাসঘাতক বলা হয়, সেটা মানা যায় না। যুদ্ধের নির্দেশটা কে দিয়েছিল? আজ পর্যন্ত তো কেউ প্রমাণ করতে পারল না যে উনি গাদ্দারি করেছেন।”
ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়ের মতে, মীর জাফর ছিলেন পারস্যের নাজাফ থেকে আসা একজন আরব বংশোদ্ভূত। সাধারণ অশ্বারোহী থেকে নিজ দক্ষতায় তিনি আলিবর্দি খাঁয়ের সেনাপতি বা ‘বকশী’ পদে উন্নীত হন। আলিবর্দি খাঁ তাকে দিয়ে শপথ করিয়েছিলেন যে তিনি সিরাজের প্রতি অনুগত থাকবেন।
মীর জাফরের বংশধররা দাবি করেন, তারা কেবল সেনাপতির বংশধর নন, বরং ইমাম হাসান ও হোসাইনের উত্তরপুরুষ। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত পূর্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘মসনদ অফ মুর্শিদাবাদ’ গ্রন্থেও তাদের এই বংশপরিচয়ের উল্লেখ রয়েছে। এমনকি পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার আলি মির্জাও এই বংশেরই সন্তান, যার জন্ম হয়েছিল মুর্শিদাবাদের এই কেল্লা নিজামতেই।
আজও মীর জাফরের প্রাসাদের সামনে পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত আছেন তিনি। তার সমাধির ওপর জমেছে শতাব্দীর ধুলো, আর তার নামের ওপর জমেছে ‘বিশ্বাসঘাতক’-এর কলঙ্ক। ইতিহাস তাকে খলনায়ক হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। কিন্তু তার বংশধরদের হৃদয়ে তিনি একজন ষড়যন্ত্রের শিকার, ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক হিরো। এই দুই ভিন্ন আখ্যানের মধ্যেই আজও বেঁচে আছে মীর জাফরের বিতর্কিত উত্তরাধিকার।