নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের শিক্ষাজীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের ‘পূর্ব বাথুয়া আলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’।
৯২ বছরের পুরোনো এই বিদ্যালয়টি একসময় চাটগাঁইয়া ভাষায় ‘মহাজন ফইরের স্কুল’ (মহাজনের পুকুরের স্কুল) নামে পরিচিত ছিল, কারণ এটি এলাকার একটি বড় পুকুরের পাড়ে অবস্থিত ছিল। তবে যে স্কুলটি একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে, সেটিই আজ অবহেলা আর সংকটের শিকার; এর গৌরবময় ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানা।
১৯৩৩ সালে ‘পূর্ব বাথুয়া আলামিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুল’ নামে এই বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ‘১৯৩৭ সাবান’ কারখানার মালিকের ছেলে নেয়ামত আলী স্কুলটির জন্য জমি দান করেছিলেন। অধ্যাপক ইউনূসের শৈশবের খেলার সঙ্গী ও তাঁর চেয়ে বয়সে দেড় বছরের ছোট চাচা মুহাম্মদ শফি জানান, ১৯৪৫ সালে ইউনূস এই স্কুলেই ভর্তি হন এবং তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন।
শফি স্মৃতিচারণ করে বলেন, শৈশব থেকেই ইউনূস লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বয়েজ স্কাউটে যোগ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন, যা দেখে সবাই বুঝত তিনি একদিন অনেক বড় হবেন। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক ছিল; ১৯৬১ সালের দিকে তিনি ‘বিজ্ঞান সাময়িকী’ নামে একটি পত্রিকাও বের করতেন। বাংলা ভাষার প্রতি তার অনুরাগ ছিল গভীর, একবার বক্তৃতা দিতে উঠে ‘হ্যালো’ না বলে তিনি বলেছিলেন, ‘মনোযোগ দিন, মনোযোগ দিন’।
কিন্তু এমন একজন কৃতী ছাত্রের স্মৃতিচিহ্ন বিদ্যালয়টিতে প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমান শিক্ষার্থীরা তো বটেই, অনেক শিক্ষকও জানতেন না যে অধ্যাপক ইউনূস তাদেরই স্কুলে পড়তেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা আকতার বলেন, “আমরা শিক্ষকেরাও জানতাম না। কোনো কারণে আগে এই তথ্য প্রচার হয়নি। এখন আমরা কৃতী শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা করার কথা ভাবছি।”
এই বিস্মৃতির পাশাপাশি বিদ্যালয়টি অবকাঠামোগতভাবেও চরম অবহেলিত। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, ৪৫ বছরের পুরোনো ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পাঠদান চলছে। শ্রেণিকক্ষে নেই পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক পাখা। দরজা-জানালা ভাঙা হওয়ায় চুরির ভয়ে ডিজিটাল ক্লাসের সরঞ্জাম ব্যবহার না করে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক নাসিমা আকতারকে চুরির ভয়ে এমনকি ওয়াই-ফাই রাউটারও প্রতিদিন সাথে করে বাড়িতে নিয়ে যেতে হয়। বিদ্যালয়ের মাঠ বালুর স্তূপে ভরা থাকায় শিক্ষার্থীদের খেলারও কোনো সুযোগ নেই। এই জীর্ণ পরিবেশের কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে ১০৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
হাটহাজারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোজিনা রহমান বিদ্যালয়টির প্রতি পূর্ববর্তী অবহেলার কথা স্বীকার করে বলেন, “আগে নানা চাপের কারণে অধ্যাপক ইউনূসের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য কিছু করার থাকলেও আমরা সেটি করতে পারিনি।”
তবে তিনি দৃঢ়ভাবে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “ওই স্কুল সংস্কার এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে আমরা কাজ করছি। আগামী এক মাসের মধ্যে ওই স্কুলে সব দিকে পরিবর্তন আনা হবে।”