মানসম্মত শিক্ষা, চাকরির নিশ্চয়তা ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কেবল গত অর্থবছরেই (২০২৪-২৫) এ খাতে বাংলাদেশ থেকে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধা ফিরিয়ে আনার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর তথ্যমতে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই গত এক দশকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫০ শতাংশ বেড়েছে, যা দেশটিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী প্রেরণে বাংলাদেশকে অষ্টম অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দেশে কর্মসংস্থানের অভাবই তাদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে। ডেনমার্কে অধ্যয়নরত জাহিদুল ইসলাম বলেন, “অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সবাই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। তাই উন্নত জীবনের জন্য শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।”
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী এই প্রবণতার পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেশে শিল্পায়ন না হওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের অভাবকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “একজন তরুণ শিক্ষাজীবন শেষে বুঝে উঠতে পারছে না সে কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে। তরুণদের দেশে রাখতে চাইলে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত কর্মজীবনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।”
তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বিষয়টিকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার কথা বলছেন।
ড. আবরার বিদেশে যাওয়াকে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ না ভেবে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ বা মেধা সঞ্চালনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “বিদেশে থেকেও তারা বিভিন্নভাবে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারে। আমাদের ব্যর্থতা হলো আমরা এখনো তাদের সেভাবে সংযুক্ত করতে পারিনি।”
শিক্ষা উপদেষ্টা আরও বলেন, “বিগত সময়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতির প্রভাব ও নিরাপত্তাহীনতাও শিক্ষার্থীদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করেছে। রাষ্ট্রকে এটি নিশ্চিত করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ পায়।” তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়া আটকানোর চেষ্টা না করে দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নই মূল সমাধান।