সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৫ লাখ কোটি, আড়ালে আরও সোয়া লাখ কোটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগের সরকারের সময় চাপা থাকা খেলাপি ঋণ এখন প্রকাশ হতে শুরু করায় ব্যাংক খাতে এর পরিমাণ পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না আরও এক লাখ ৬৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এক হাজার ৮৬ জন ঋণগ্রহীতার ২৭ হাজার ৩০২টি ঋণের বিপরীতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে আছে। আদালতের আদেশের কারণে এসব ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি দেখানো না যাওয়ায় তারা নিয়মিত গ্রাহকের মতোই সব সুবিধা পাচ্ছেন।

প্রতিবেদন অনুসারে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান খেলাপি মিলিয়ে জুন মাস পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯৩ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩৯ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুনে যেখানে দৃশ্যমান খেলাপি ঋণ ছিল দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে পাঁচ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর আগে ২০২৩ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ২০০৯ সালে যা ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য হয়। খেলাপি হলে নতুন ঋণ পাওয়া, আমদানি-রপ্তানির জন্য এলসি খোলা, ব্যাংকের পরিচালক হওয়া এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ায় ঋণ পরিশোধ না করেও অনেকে এসব সুবিধা নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, “খেলাপিকে খেলাপিই বলা উচিত। কেউ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ আনলেও তাকে খেলাপি দেখানো উচিত। আর এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার এবং বিচার বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তা না হলে আর্থিক খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, এদের অনেকেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং তারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। তার মতে, “খেলাপিরা জানে, মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা যাবে। তারা ঘুষ দিয়ে মামলা পিছিয়ে দিচ্ছে। এই চক্র থেকে বের হতে হলে খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল করতে হবে কিংবা সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করে এদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”

আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি ঋণ আড়াল করার চর্চা বন্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং অর্থ ঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আগের সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে খেলাপিদের নীতি সহায়তা বন্ধ করা হয়েছে এবং গুণগত মান বিচারে ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি থাকা ব্যাংকগুলোকে ২০২৪ সালের জন্য লভ্যাংশ দিতে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়া ঋণ নিয়ে অর্থ পাচারকারীদের সম্পত্তি ফ্রিজ করার জন্য বিভিন্ন দেশে আবেদন করা হয়েছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এখন উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেওয়া আগের চেয়ে কঠিন হয়েছে এবং আদালত আগের মতো দীর্ঘ সময় দিচ্ছেন না। তিনি বলেন, “উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের জন্য আবেদন করতে হলে বকেয়া স্থিতির অন্তত ১০ শতাংশ দেওয়ার বিধান করা উচিত।”

পাঠকপ্রিয়