সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

খেলাপি ঋণের অর্ধেকই শিল্প খাতে, সংকটে কর্মসংস্থান-ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে ওঠা খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেকই তৈরি হয়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া এবং জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো খেলাপি তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট খেলাপি ঋণ ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশই এই খাতের। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং জালিয়াতির কারণে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি দেশের কর্মসংস্থান ও ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট অনুসারে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা বেড়ে মোট ৫ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশেরও বেশি। অথচ ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণ আড়াল করার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়ায় ব্যাংক খাতের অতীত ক্ষত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। আগের শাসনামলে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ ছিল।

অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাব উৎপাদন খাতে পড়েছে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এতে বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হয়েছে। আবার চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়া এবং ডলার সংকটে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আমদানি করতে না পারায় বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান সক্ষমতার ৩০-৫০ শতাংশ উৎপাদনে ছিল। এসব সংকটের প্রভাবে এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।”

অবশ্য জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া ঋণের প্রভাবকেও খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, “জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বড় একটি অংশ উৎপাদনমুখী শিল্পের নামে নেওয়া হয়েছে। ওই সব ঋণ দেশে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এ কারণেও শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।”

দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা, যা এ খাতের বিতরণকৃত ঋণের ২৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। খাতটির কাঁচামাল সরবরাহকারী বস্ত্র শিল্পেও পরিস্থিতি প্রায় একই। এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং কিছু উদ্যোক্তার দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “খেলাপি ঋণ আমাদের একটা জাতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা প্রকৃত ব্যবসায়ী, তারা শিল্প চালানোর জন্য সিআইবি ঠিক রাখে। তবে যারা খেলাপির মধ্যে পড়েছে, তাদের অধিকাংশই গত ১৫ বছর রাজনৈতিক যোগসাজশ কাজে লাগিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়েছে।”

একসময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চামড়া শিল্পে বিতরণকৃত ঋণের ৩৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ এখন খেলাপি, যার অর্থমূল্য ৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। আর শতাংশের হারে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পে, যেখানে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩৯ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা আর ব্যাংকে ফেরেনি। এছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে ওষুধ খাত, যেখানে খেলাপি ঋণ মাত্র ১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা বা ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে ব্যাংক ও গ্রাহকের অসততাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। তিনি বলেন, “খেলাপি ঋণ বেড়েছে মূলত ব্যাংক থেকে অসদুপায়ে টাকা বের করার কারণে। টেক্সটাইল খাতে তাদেরই ক্ষতি হচ্ছে, যাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থায়ন করা হয়েছে। যেমন, একটি পুরনো মিল অধিগ্রহণের জন্য ১৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও ব্যাংক ৬০০ কোটি টাকা দিয়েছে। এসব ঘটনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

উৎপাদন খাতের এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ দেশের শ্রমবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেক প্রতিষ্ঠান রুগ্‌ণ হয়ে পড়ায় বা উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় হাজারো শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট কাটাতে উদ্দেশ্যমূলক খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে হবে এবং ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

পাঠকপ্রিয়