মানুষের স্বপ্ন দেখার কোনো সীমা নেই। কেউ হয়তো মহাকাশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখে, আবার কেউ হয়তো সমুদ্রের গভীরে ডুব দিয়ে মুক্তা খুঁজে আনার কল্পনায় বিভোর থাকে। কিন্তু কিছু স্বপ্ন থাকে আরও অদ্ভুত, আরও চ্যালেঞ্জিং। তেমনই এক স্বপ্নের পেছনে ছুটেছিলেন সফটওয়্যার কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহী মাইক কনার। তার স্বপ্নটি ছিল ইতিহাসের ধুলোয় ঢাকা, দেড়শ বছরেরও বেশি পুরোনো এক পরিত্যক্ত দুর্গ কিনে তাকে নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে তোলা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তাকে যে এমন এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
“আমার এই উদ্যোগকে অনেকেই ‘মধ্যবয়সের সংকট’ বলে ঠাট্টা করেছে,” হাসতে হাসতে বলছিলেন ৫২ বছর বয়সী মাইক কনার। “সত্যি বলতে, আমি আসলে জানতামই না যে ঠিক কীসের সঙ্গে নিজেকে জড়াচ্ছি।” তার এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের উপকূলে অবস্থিত ‘থর্ন আইল্যান্ড’ নামের এই দ্বীপটিকে পুনরুজ্জীবিত করার যাত্রাটি কতটা কঠিন ছিল। এটি কেবল একটি স্থাপনা সংস্কারের গল্প নয়, বরং এটি এক ব্যক্তির অদম্য ইচ্ছা, প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের এক জীবন্ত উপাখ্যান।
থর্ন আইল্যান্ড: ইতিহাসের এক নীরব প্রহরী
এই গল্পের গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে থর্ন আইল্যান্ডের ইতিহাসের দিকে। যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম ওয়েলসের পেমব্রোকশায়ারে অবস্থিত মিলফোর্ড হ্যাভেন বন্দরটি একসময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাঁটি ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের নৌবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়ে ব্রিটিশদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সেই সম্ভাব্য হামলা থেকে অত্যন্ত ব্যস্ত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরকে রক্ষা করার জন্যই ১৮৫০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার একগুচ্ছ দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করে, যার মধ্যে থর্ন আইল্যান্ডের দুর্গটি অন্যতম।
সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট এক পাথুরে দ্বীপের উপর নির্মিত এই দুর্গটি ছিল ভিক্টোরিয়ান যুগের সামরিক প্রকৌশলের এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় এক হাজার শ্রমিক দুই বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে এটি নির্মাণ করেছিল। এর নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যেন প্রায় একশ সৈন্য সেখানে অবস্থান করে শত্রুপক্ষের জাহাজের উপর নজরদারি চালাতে এবং প্রয়োজনে কামান দাগতে পারে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, যে ফরাসি আক্রমণের ভয়ে এই দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই আক্রমণ কখনোই ঘটেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং কৌশলগত গুরুত্ব কমে যাওয়ায় দুর্গটি ধীরে ধীরে তার উপযোগিতা হারায়। একটা সময় পর ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।
এরপর বহু বছর দুর্গটি প্রকৃতির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। সমুদ্রের নোনা হাওয়া আর ঢেউয়ের আঘাতে এর দেয়ালগুলো ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে প্রথমবার দুর্গটিকে মেরামত করে একটি হোটেলে রূপান্তর করার চেষ্টা করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে এর মালিকানা বদল হয়েছে। জন্মদিন, বিয়ে এবং বিভিন্ন করপোরেট অনুষ্ঠানের জন্য এটি ভাড়া দেওয়া হতো। কিন্তু মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে এটি কখনোই বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি সফল হতে পারেনি।
২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের ‘ভন এসেন হোটেল গ্রুপ’ দুর্গটি কিনে নেয় এবং সেখানে প্রায় চার মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করে একটি বিলাসবহুল হোটেল তৈরির পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ‘ক্যাবল কার’ স্থাপনের মতো চমকপ্রদ ধারণাও ছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এরপর প্রায় সতেরো বছর ধরে দুর্গটি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। সমুদ্রের বুকে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গটি যেন তার গৌরবময় অতীতকে সঙ্গী করে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন মাইক কনার।

এক সফটওয়্যার মোঘলের অদ্ভুত স্বপ্ন এবং কঠিন বাস্তবতা
মাইক কনার তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন প্রযুক্তির জগতে। সফটওয়্যার কোম্পানির সিইও হিসেবে তার দিন কাটত মিটিং, ডেডলাইন আর ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজি নিয়ে। কিন্তু তার ভেতরে বাস করত এক অন্য মানুষ, যিনি ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী এবং যিনি নকশা ও প্রযুক্তির শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ২০১৭ সালের মে মাসে তিনি যখন প্রথম থর্ন আইল্যান্ড বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখেন, তখন এর জরাজীর্ণ অবস্থার ছবি সত্ত্বেও এর স্থাপত্যশৈলী তাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। তিনি প্রায় পাঁচ লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার পাউন্ড খরচ করে দ্বীপটি কিনে ফেলেন।
তার এই সিদ্ধান্তটি ছিল আবেগতাড়িত। তিনি ভেবেছিলেন, কিছু সংস্কার কাজ করলেই হয়তো দুর্গটিকে বসবাসের উপযোগী করে তোলা যাবে। কিন্তু দ্বীপে পা রাখার পরই তিনি বুঝতে পারেন, বাস্তবতা তার কল্পনার চেয়েও শতগুণ কঠিন। “সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না, পানি ছিল না, এমনকি খাবার আনা বা বর্জ্য অপসারণেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না,” বলছিলেন কনার। চারদিকে ছিল জনশূন্যতা আর প্রকৃতির রুক্ষতার ছাপ।
এই কঠিন বাস্তবতার প্রথম ধাক্কাটি আসে তার স্ত্রীর কাছ থেকে। “আমার স্ত্রীকে আমি যখন প্রথম খবরটা জানালাম যে, দুর্গটি আমি কিনেছি, তখন সে বেশ বিরক্ত হয়েছিল। সে বলেছিল, সে ওখানে তখনই থাকার জন্য যাবে যখন অন্তত ফ্লাশ করা যায় এমন শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকবে।” স্ত্রীর এই আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ দাবিটিই মাইক কনারের জন্য প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি যখন দুর্গটিতে একটি আধুনিক ফ্লাশওয়ালা শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করেন, তখন প্রকৌশলীরা তাকে জানান যে এর জন্য দ্বীপের প্রায় ১৬ ফুট কঠিন পাথর কাটতে হবে। আর এই কাজের জন্য খরচ হবে প্রায় দুই লক্ষ পাউন্ড! এই কথা শুনে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি বুঝতে পারেন, এটি কোনো সাধারণ সংস্কার প্রকল্প নয়, এটি এক অসম সাহসের লড়াই। “ওয়েলসের কিছু অসাধারণ ঐতিহাসিক ভবন আছে সত্যি, কিন্তু সেগুলোর অবস্থা আসলেই করুণ,” আক্ষেপ করে বলেন কনার। একটি শৌচাগার নির্মাণেই যদি এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ও শ্রমের প্রয়োজন হয়, তাহলে পুরো দুর্গটিকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ বাসযোগ্য করে তুলতে কী পরিমাণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, তা ভেবে তিনি শিউরে ওঠেন।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক অবিশ্বাস্য লড়াই: সংস্কার পর্ব
থর্ন আইল্যান্ডের সংস্কার কাজ ছিল এক কথায় হারকিউলিয়ান টাস্ক। পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে আধুনিক জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ সেখানে শূন্য থেকে তৈরি করতে হয়েছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সময় লেগে যায় প্রায় পাঁচ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দ্বীপটিতে মাত্র ছয়জন কর্মী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন, যারা সবাই ছিলেন পুরুষ।
১. লজিস্টিকসের দুঃস্বপ্ন: সংস্কার কাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রয়োজনীয় মালামাল ও সরঞ্জাম দ্বীপে নিয়ে যাওয়া। যেহেতু দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এর চারপাশে উত্তাল সমুদ্র, তাই নৌকায় করে ভারী নির্মাণসামগ্রী পরিবহন করা ছিল প্রায় অসম্ভব এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একমাত্র উপায় ছিল হেলিকপ্টার। নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সিমেন্টের ব্যাগ, স্টিলের বিম, জানালা, দরজা, এমনকি জেনারেটর পর্যন্ত হেলিকপ্টারে করে দ্বীপে উড়িয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। “এটা ছিল অবিশ্বাস্যরকম কঠিন একটা কাজ,” বলছিলেন কনার। প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হতো এবং পুরো প্রক্রিয়াটিই নির্ভর করত আবহাওয়ার মর্জির উপর। সামান্য ঝড়ো হাওয়া বা বৃষ্টির কারণে দিনের পর দিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
২. জীবনযাপনের সংগ্রাম: যারা এই প্রকল্পে কাজ করতে রাজি হয়েছিলেন, তাদের জীবনযাপন ছিল এক কথায় মানবেতর। দ্বীপে বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের জেনারেটরের উপর নির্ভর করতে হতো, যা দিয়ে তারা কেবল তাদের যন্ত্রপাতি চালাত এবং মোবাইল ফোন চার্জ দিত। পরিষ্কার পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। গোসলের জন্য তাদের নির্ভর করতে হতো সমুদ্রের হিমশীতল নোনা পানির উপর। প্রতিবার টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তাদের এই প্রতিকূল পরিবেশে কাজ চালিয়ে যেতে হতো। “জীবনযাপন করা ছিল ভীষণ কঠিন,” স্মৃতিচারণ করেন মাইক কনার। এতসব সমস্যার কথা জেনেও যে কর্মীরা সেদিন তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের প্রতি তিনি আজও কৃতজ্ঞ। তিনি জানান, সেই দলের বেশিরভাগ সদস্য এখনও তার সঙ্গেই কাজ করছেন।
৩. ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা: মাইক কনার নিজে নকশা ও প্রযুক্তির শিক্ষক হওয়ায় দুর্গটির মূল স্থাপত্যের প্রতি তার ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ। তিনি এর নকশা দেখে রীতিমতো অভিভূত হয়েছিলেন। “শুরুতে আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে, ভিক্টোরিয়ানরা এত দুর্দান্ত কিছু সৃষ্টি করতে পারে। এটি স্টোনহেঞ্জের (ব্রোঞ্জ যুগের একটি স্তম্ভ) মতোই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল,” বলেন কনার। তার লক্ষ্য ছিল দুর্গটির ঐতিহাসিক সত্তাকে অক্ষুণ্ণ রেখে একে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সজ্জিত করা। তিনি কোনো কিছু ভাঙার আগে শতবার ভেবেছেন, চেষ্টা করেছেন মূল কাঠামোকে বাঁচিয়ে রাখতে। “সেটা দেখার পর মনে হয়েছিল, আমার কাজ হচ্ছে একে আধুনিকীকরণ করা। এটা তাদের (মূল নকশাকারদের) কঠোর পরিশ্রমের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা নিবেদন,” বলছিলেন তিনি। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপে চেষ্টা করেছেন যেন তার আধুনিকায়ন ইতিহাসের উপর কোনো আঁচড় না ফেলে, বরং তাকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে।

রূপান্তর: পরিত্যক্ত দুর্গ থেকে বিলাসবহুল ‘পার্টি আইল্যান্ড’
পাঁচ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর ঘামের বিনিময়ে থর্ন আইল্যান্ড অবশেষে তার নতুন রূপ ফিরে পায়। একসময়ের পরিত্যক্ত, স্যাঁতসেঁতে দুর্গটি এখন পরিণত হয়েছে এক অবিশ্বাস্য সুন্দর এবং বিলাসবহুল স্থাপনায়।
সংস্কার শেষে দুর্গটিতে এখন প্রায় ৪০টি বিছানা, চারটি সংযুক্ত গোসলখানা, একটি আধুনিক রান্নাঘর এবং নিজস্ব একটি নাইট ক্লাবও রয়েছে। অতীতে যেখানে এক ফোঁটা পরিষ্কার পানি পাওয়া যেত না, সেখানে এখন রয়েছে আধুনিক পানির ব্যবস্থা। বিদ্যুতের জন্য রয়েছে শক্তিশালী জেনারেটর এবং সৌরশক্তির ব্যবস্থা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থাপন করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব সেপটিক সিস্টেম। সব মিলিয়ে, একসময়ের পরিত্যক্ত দুর্গটি এখন এক পরিপূর্ণ ‘পার্টি আইল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় তিন মিলিয়ন পাউন্ড।
এই রূপান্তরের পর মাইক কনার তার পঞ্চাশতম জন্মদিনটি উদযাপন করেন এই দ্বীপেই। সেদিন দুর্গ প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল বন্ধু-বান্ধবদের হৈ-হুল্লোড়, গান-বাজনা আর আনন্দের ফোয়ারা। যে দুর্গ একসময় যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়েছিল, তা এখন মানুষের মিলনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। “এটা এমন একটা জায়গা যেখানে কোনো প্রতিবেশী নেই। ফলে কেউ বিরক্তও হয় না,” রসিকতা করে বলেন কনার। এখানে গভীর রাত পর্যন্ত পার্টি চললেও কারো কাছে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে এই বিলাসবহুল জীবনের একটি মজার দিকও রয়েছে। দ্বীপে যেহেতু কোনো পৌরসভা বা বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই, তাই যারা এখানে বেড়াতে আসেন, ফেরার সময় তাদের নিজেদের তৈরি করা সমস্ত ময়লা-আবর্জনা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয়। “সপ্তাহ শেষে ছুটি কাটাতে যেসব পর্যটকরা এখানে আসেন, তাদেরকে সঙ্গে করে আবর্জনা ফিরিয়ে নিতে বললে তারা রীতিমতো অবাক হন,” হাসতে হাসতে বলেন মাইক কনার। এই নিয়মটি একদিকে যেমন দ্বীপটিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সাহায্য করে, তেমনই পর্যটকদের পরিবেশের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
দ্বীপ জীবন: এক নতুন দর্শন
মাইক কনারের কাছে থর্ন আইল্যান্ড এখন কেবল একটি সম্পত্তি নয়, এটি তার জীবনের এক নতুন দর্শন। প্রযুক্তির জগতের ছকে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে এসে তিনি এখানে খুঁজে পেয়েছেন জীবনের প্রকৃত অর্থ। “আমরা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা জীবন যাপন করে থাকি, যেখানে ব্যস্ততা থাকে, মিটিং থাকে। কিন্তু দ্বীপের জীবন সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে আপনি প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করতে পারেন, যা আপনাকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়,” বলেন তিনি।
তার মতে, দ্বীপের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং নির্জনতা মানুষকে তাদের ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করে। এখানে এসে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ পায়, নিজেদের সঙ্গে কথা বলার অবকাশ পায়। “আমি মনে করি এটাই থর্নকে একটি বিশেষ জায়গা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে,” বলেন কনার। এটি এমন এক জায়গা যা “জনবহুল উৎসব থেকে শুরু করে জনশূন্য নির্জনতা”—সবকিছুরই সাক্ষী।
মাইক কনারের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা আমাদের শেখায় যে, স্বপ্ন দেখতে সাহস লাগে, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে লাগে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রম। তার গল্পটি কেবল একটি পরিত্যক্ত দুর্গ পুনর্নির্মাণের গল্প নয়, এটি ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী। থর্ন আইল্যান্ড আজ শুধু ওয়েলসের উপকূলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি দুর্গ নয়, এটি এক ব্যক্তির স্বপ্নের স্মারক, যা সমুদ্রের বুকে বাতিঘরের মতো জ্বলজ্বল করছে।