মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির হাতে বাবাকে হারানোর পর মা আর ভাইবোনদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের খোঁজে এসেছিলেন রোহিঙ্গা তরুণী উম্মে সলিমা (১৮)। কিন্তু নাফ নদ পাড়ি দেওয়ার আগেই দুই ভাইবোনকে হারিয়ে ফেলেন। এখন কক্সবাজারের লেদা ক্যাম্পে মায়ের সঙ্গে আশ্রয় হলেও ভাইবোনের চিন্তায় দিন কাটছে তার।
সলিমার মতোই গত নভেম্বর থেকে নতুন করে সোয়া লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এ নিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৩ লাখ ২৪ হাজারে। অথচ গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
এই নতুন অনুপ্রবেশের স্রোত এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় ক্যাম্পগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। তহবিলের অভাবে হাজার হাজার অনানুষ্ঠানিক স্কুল বন্ধ হওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষাজীবন। এর সঙ্গে ক্যাম্পে খুন, অপহরণ ও মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, রাখাইনে জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বলেন, “নতুন সংকট মোকাবিলা এবং প্রত্যাবাসনের পথরেখা তৈরিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে। এর সুপারিশগুলো সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ আয়োজিত রোহিঙ্গা সম্মেলনে তুলে ধরা হবে।”
এদিকে, রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মির হাতে মারাত্মক নির্যাতন ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে বলে খবর আসছে। টেকনাফের ২৭ নম্বর ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মো. নুর জানান, তার যে নয়জন স্বজন এখনো রাখাইনে আছেন, তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লুটপাট করছে আরাকান আর্মি এবং তাদের জোর করে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নজরদারি চালালেও দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। বিজিবি জানায়, এই পাচার চক্রে আরাকান আর্মির সদস্যদের পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গাও জড়িত।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খুন, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৫০টি মামলা হয়েছে। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, আট বছরে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যায়নি, উল্টো অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি এবং ক্যাম্পে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, যা একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।