সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

এস আলম কেলেঙ্কারি: যেভাবে ১০ ব্যাংক থেকে উধাও সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এস আলম গ্রুপ নামে পরিচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদের বিরুদ্ধে দেশীয় ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে, যাকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রাথমিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, গ্রুপটি নিজেদের ও বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, যার বেশিরভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এই অর্থ কেলেঙ্কারির প্রভাবে ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে এবং পুরো ব্যাংক খাত একটি পদ্ধতিগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিএফআইইউ’র অনুসন্ধান অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের নামে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৯২,৬৭৭ কোটি, বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৭,৪৮৬ কোটি এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও পরোক্ষ সুবিধার মাধ্যমে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ৩৪,৮৬৭ কোটি টাকা।

এই কেলেঙ্কারিতে এস আলমের প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দিনের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হওয়ার পর তিনি নিজের ও পরিবারের নামে শতাধিক বেনামি অ্যাকাউন্ট খোলেন, যেখান থেকে প্রায় ১,২৬৬ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন হয়। এই কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত আকিজ উদ্দিন, মিফতা উদ্দিন ও জেকিউএম হাবিবুল্লাহ ইতোমধ্যে দেশ ত্যাগ করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা নীতি সহায়তা দিয়ে এবং এস আলমের দখলে থাকা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ লুকাতে সহযোগিতা করে এই অর্থ লোপাটে সহায়তা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো কাউকে পরিচালক বা ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

এই কেলেঙ্কারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একসময়ের দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক, যেখান থেকে লোপাট হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকে ব্যাংকটি এখন চরম মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েছে।

অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (৪৫,৬৩৬ কোটি), ইউনিয়ন ব্যাংক (২৩,৫২৬ কোটি), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (১৩,২৫০ কোটি), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (১২,৮৭৬ কোটি), জনতা ব্যাংক (১২,৩৩২ কোটি), এক্সিম ব্যাংক (৬,৩৪৬ কোটি), ন্যাশনাল ব্যাংক (২,৩৪৬ কোটি), বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (৫০ কোটি), আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক (৩৭৬ কোটি) এবং আভিভা ফাইন্যান্স (১,৮৫৭ কোটি টাকা)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপুল অর্থ লোপাট ও পাচারের কারণে ব্যাংক খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। তারল্য সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিরাপত্তা, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ বিষয়ে স্বচ্ছ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

পাঠকপ্রিয়