মাথার খুলি ভেদ করে দেখা যাচ্ছে মগজের অংশ, কাঁধ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলছে একটি হাত—এটি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনা নয়, দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভয়াল বাস্তবতার চিত্র। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া মধ্যযুগীয় বর্বরতার পর এখন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে সায়েম ও নাইমুলের মতো তাজা দুটি প্রাণ। তাদের ঘিরে স্বজনদের আহাজারি আর সহপাঠীদের অসহায়ত্বে ভারী হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাতাস।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল সায়েমকে। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাতে কপাল থেকে ঘাড় পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষত। ৭২ ঘণ্টার জন্য লাইফ সাপোর্টে থাকা সায়েমের মাথার ভাঙা খুলি কেটে অপারেশন সম্পন্ন করেছেন চিকিৎসকরা, কিন্তু তার জ্ঞান ফেরার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এরই মধ্যে ৫-৬ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও রক্তের প্রয়োজন ফুরায়নি।
অন্যদিকে, নাইমুলের কাঁধে পড়েছে চাপাতির কোপ। হাতটি কাঁধ থেকে প্রায় আলাদা হয়ে ঝুলছিল, হাড় দুই টুকরো। তার হাতের অবস্থা এতটাই গুরুতর যে চট্টগ্রামে অপারেশন সম্ভব কি না, তা নিয়েই সন্দিহান চিকিৎসকরা। হাতটি আর জোড়া লাগবে কি না, সেই উত্তরও অজানা।
শনিবার রাত থেকে রোববার বিকেল পর্যন্ত চলা এই নারকীয় তাণ্ডবে আহত হয়েছেন অন্তত ২২০ জন, যাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোর আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল। চিকিৎসক শামীম আহমেদ জানান, দুজনের অবস্থা গুরুতর। আহত শিক্ষার্থী আব্দুর রহমানের কথায় ফুটে ওঠে সেই ভয়াবহতা, ‘স্থানীয়রা আমাদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় রামদা ও কিরিচ নিয়ে হামলা চালিয়েছে।’
সংঘর্ষের সূত্রপাত এক ছাত্রীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে হলেও তা মুহূর্তেই রূপ নেয় রণক্ষেত্রে। একদিকে শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠি-রড, অন্যদিকে গ্রামবাসীদের হাতে ছিল রামদা ও লোহার পাইপ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার পর অবশেষে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার, ঘটে গেছে।
এই ধ্বংসযজ্ঞের পর একে অপরকে দুষছে বিবদমান দুই পক্ষ। স্থানীয় দোকানদার খায়রুল আলমের প্রশ্ন, ‘আমি তো কাউকে আঘাত করিনি, তাহলে শিক্ষার্থীরা আমার দোকান লুট করল কেন? ওরা গ্রামে এসে আমাদের আক্রমণ করেছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আহতদের চিকিৎসার সব খরচ বহন করার এবং প্রয়োজনে ঢাকায় পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে। উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হলেও সায়েমের ভাঙা খুলি আর নাইমুলের ঝুলন্ত হাত এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে এই রক্তগঙ্গা কার দায়? এই বর্বরতার ক্ষত কি আদৌ শুকাবে?