একসময়ের ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ বা জেলেদের স্বর্গরাজ্য সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা মাছ ধরা ছেড়ে পর্যটনকে প্রধান জীবিকা হিসেবে বেছে নিলেও এখন পড়েছেন নতুন সংকটে। বছরে মাত্র তিন মাস পর্যটন মৌসুম চালু থাকায় বাকি নয় মাস দ্বীপের হাজারো মানুষের জীবন চলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে।
দ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা নুরুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর আগেও এখানকার ৮০ শতাংশ মানুষ মাছ ধরা বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, সাগরে মাছ কমে যাওয়া এবং পর্যটনের প্রসারের কারণে এখন বেশিরভাগ মানুষ পেশা পরিবর্তন করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পর্যটন মৌসুমে নৌকায় পর্যটক ঘোরানো, হোটেল-রেস্টুরেন্টে চাকরি বা ছোট দোকান চালিয়ে ভালো আয় হলেও, মৌসুম শেষ হতেই দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকলে কিংবা পর্যটন বন্ধ থাকলে অনেক পরিবারেই সংকট দেখা দেয় বলে জানান দ্বীপের বাসিন্দা আমির আলী।
তবে শুধু সংক্ষিপ্ত মৌসুমই নয়, স্থানীয়দের আরও নানা অভিযোগ রয়েছে। ঝালমুড়ি বিক্রেতা আজিজুর রহমান বলেন, “দ্বীপের বাসিন্দারা যেন নিজ দেশে প্রবাসী। বাড়ি তৈরির জন্য সাধারণ টিনটুকুও আমরা টেকনাফ থেকে আনতে পারি না। অথচ প্রভাবশালীরা ঠিকই ইট-পাথরের বড় বড় ভবন বানাচ্ছেন।”

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফজুল ইসলাম বলেন, “পর্যটন থেকে কিছুটা আয় হলেও দ্বীপবাসীর জীবন এখনো অনিশ্চিত। আমরা সরকারের কাছে অন্তত চার মাস পর্যটন মৌসুম চালু রাখার দাবি জানাচ্ছি।”
এসব বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহাসান উদ্দিন বলেন, সেন্টমার্টিনে তালিকাভুক্ত ৭৯৯ জন জেলে নিয়মিত সরকারি নানা সুবিধা পাচ্ছেন এবং মাছ ধরায় কোনো বাধা নেই। তিনি আরও বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়াতে কোনো বিধিনিষেধ নেই, তবে পরিবেশগত কারণে শুধু ইট-পাথরের মতো নির্মাণসামগ্রী আনার ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে হয়।
ইউএনও জানান, দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প জীবিকার পথ তৈরি করতে সরকার বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, একটিমাত্র খাতের ওপর পুরো দ্বীপের অর্থনীতির নির্ভরশীল হয়ে পড়া ঝুঁকিপূর্ণ। পর্যটনের অতিরিক্ত চাপ দ্বীপের পরিবেশ, প্রবাল ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে জেলেদের পুরোনো পেশায় ফেরার পথকেও আরও কঠিন করে তুলবে।