সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

যেসব প্রাচীন ভাষা হাজার হাজার বছর পেরিয়ে আজও জীবিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভাষা কেবল ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি মানব সভ্যতার এক বহমান নদী। এই নদীর স্রোতে মিশে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর অগণিত মানুষের হাসি-কান্নার গল্প। কালের পরিক্রমায় পৃথিবীতে যেমন নতুন নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে, তেমনি বিলুপ্তির অন্ধকারে হারিয়ে গেছে সহস্রাধিক ভাষা। তবে এর মধ্যেও কিছু ভাষা আশ্চর্যজনকভাবে সময়ের সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে আজও টিকে আছে। এগুলো শুধু টিকে নেই, বরং কোটি কোটি মানুষের মুখে প্রতিদিন উচ্চারিত হয়ে চলেছে, বিকশিত হচ্ছে এবং বর্তমান বিশ্বকে সমৃদ্ধ করছে আপন মহিমায়।

এই প্রাচীন ভাষাগুলো মানব ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এদের শরীরে লেগে আছে প্রাচীন সভ্যতার ধুলো, এদের শব্দে কান পাতলে শোনা যায় হাজার বছর আগের মানুষের কণ্ঠস্বর। ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে মহাকাব্য, দর্শন থেকে বিজ্ঞান—জ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে এই ভাষাগুলো তাদের গভীর ছাপ রাখেনি। তামিল, সংস্কৃত, গ্রিক, হিব্রু, আরবি, ফারসি কিংবা চীনা মান্দারিনের মতো ভাষাগুলো কেবল অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়, এগুলো বর্তমানেরও প্রাণশক্তি। এই প্রতিবেদনে আমরা এমনই দশটি প্রাচীন ভাষার কথা তুলে ধরব, যারা সহস্রাব্দ পেরিয়েও সগৌরবে টিকে আছে এবং সভ্যতার বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

তামিল: পাঁচ হাজার বছরের এক জীবন্ত ঐতিহ্য

বিশ্বের প্রাচীনতম ভাষাগুলোর মধ্যে তামিল অন্যতম, যার ইতিহাস পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর সদস্য এই ভাষাটি শুধু তার বয়সের জন্য নয়, বরং তার অবিচ্ছিন্ন সাহিত্যিক ঐতিহ্যের জন্যও অনন্য। পৃথিবীর অনেক প্রাচীন ভাষা কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়ে মূল রূপ হারিয়ে ফেললেও, তামিল তার প্রাচীন রূপ এবং আধুনিক কথ্য রূপের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তামিলের প্রাচীনতম সাহিত্যকর্ম, যা ‘সঙ্গম সাহিত্য’ নামে পরিচিত, তার ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য অপরিসীম। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রচিত এই সাহিত্য সংকলনে তৎকালীন তামিল সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জীবনযাত্রার এক নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে। এই সাহিত্য আজও তামিলভাষীদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার এবং এটি আধুনিক তামিল সাহিত্যের অন্যতম অনুপ্রেরণা।

তামিলের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর ব্যবহারিক উপযোগিতা। এটি কেবল পুঁথির ভাষা হয়ে থেমে থাকেনি, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভাষায় পরিণত হয়েছে। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য এবং শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে এটি প্রধান ভাষা। এ ছাড়াও সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় এটি অন্যতম দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ তামিল ভাষায় কথা বলেন। তাদের নিত্যদিনের ব্যবহার, গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র এবং শিক্ষাব্যবস্থায় এর ব্যাপক প্রচলনই এই ভাষাকে জীবন্ত রেখেছে। ভারতভিত্তিক ‘জার্নাল অব ইমার্জিং টেকনোলজিস অ্যান্ড ইনোভেটিভ রিসার্চ’-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তামিলের সাংস্কৃতিক শিকড় এতটাই গভীর যে, এটি তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে, যা অনেক ভাষার ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি।

সংস্কৃত: দেবভাষা ও জ্ঞানের ভান্ডার

সংস্কৃত

সংস্কৃতকে বলা হয় ‘দেবভাষা’ বা দেবতাদের ভাষা। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো এই ভাষাটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বহু ভাষার জননী হিসেবে স্বীকৃত। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ উত্তর ভারতের প্রায় সব প্রধান ভাষার শব্দভান্ডার এবং ব্যাকরণ সংস্কৃত দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত।

একটা সময় ছিল যখন ভারতজুড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য এবং ধর্মচর্চার প্রধান মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারতের মতো মহান ধর্মগ্রন্থ ও মহাকাব্যগুলো সংস্কৃত ভাষায় রচিত। কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ বা আর্যভট্টের জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূত্র—সবই এই ভাষার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’-তে সংস্কৃত ব্যাকরণের যে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তা আজও ভাষাবিদদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

তবে কালের বিবর্তনে সংস্কৃত তার কথ্য রূপ হারিয়ে ফেলে। বর্তমানে এটি মূলত একটি শাস্ত্রীয় ও ধর্মীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খুব অল্প কিছু মানুষ দৈনন্দিন জীবনে সংস্কৃতে কথা বলেন। কিন্তু এর গুরুত্ব এতটুকুও কমেনি। আজও হিন্দুধর্মের সমস্ত পূজা-অর্চনা ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারিত হয়। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা হয়। আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানে, বিশেষ করে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে সংস্কৃতের সুশৃঙ্খল ব্যাকরণ একটি আদর্শ মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই কথ্য ভাষা হিসেবে সীমিত হলেও, জ্ঞানের ভাষা হিসেবে সংস্কৃতের আবেদন চিরন্তন।

গ্রিক: পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি

গ্রিক ভাষার ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো। এর প্রাচীনতম লিখিত রূপ, ‘লিনিয়ার বি’, খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৫০ সালের দিকে পাওয়া যায়। তবে হোমারের ‘ইলিয়ড’ ও ‘ওডিসি’ মহাকাব্যের মাধ্যমে গ্রিক ভাষা বিশ্বসাহিত্যে তার অমর স্থান করে নেয়। প্লেটো, সক্রেটিস, অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিকদের চিন্তাধারা এই ভাষার মাধ্যমেই মানব সভ্যতাকে এক নতুন পথের দিশা দেখিয়েছিল।

পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে মূলত গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। দর্শন, গণতন্ত্র, গণিত, বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, নাটক—এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে প্রাচীন গ্রিকদের অবদান নেই। ‘ফিলোসফি’, ‘ডেমোক্রেসি’, ‘বায়োলজি’, ‘জিওমেট্রি’র মতো হাজারো শব্দ আজকের আধুনিক ভাষাগুলোতে গ্রিক থেকেই প্রবেশ করেছে। একটা সময় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে গ্রিক ছিল যোগাযোগের প্রধান ভাষা।

আজও প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আধুনিক গ্রিক ভাষায় কথা বলেন, যা প্রাচীন গ্রিক ভাষারই একটি বিবর্তিত রূপ। গ্রিস এবং সাইপ্রাসের দাপ্তরিক ভাষা এটি। গ্রিক ভাষা তার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সাবধানে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে, যা একে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ভাষা হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

চীনা মান্দারিন: অক্ষরের ঐক্যে বাঁধা এক সভ্যতা

চীনা মান্দারিন

চীনা ভাষার লিখিত ইতিহাস তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। শাং রাজবংশের আমলে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০-১০৪৬) কচ্ছপের খোলস ও পশুর হাড়ে খোদাই করা লিপি, যা ‘ওরাকল বোন স্ক্রিপ্ট’ নামে পরিচিত, চীনা অক্ষরের প্রাচীনতম নিদর্শন। এই চিত্রভিত্তিক লিখন পদ্ধতি হাজার হাজার বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে আজকের আধুনিক চীনা অক্ষরে রূপ নিয়েছে।

চীনা ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর কথ্য ও লিখিত রূপের পার্থক্য। চীনে বহু উপভাষা প্রচলিত থাকলেও, তাদের সকলের লিখিত রূপ এক। এই একক লিখন পদ্ধতিই চীনের বিশাল ভূখণ্ডকে ভাষাগতভাবে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে।

মান্দারিন হলো চীনের প্রধান এবং সর্বাধিক প্রচলিত কথ্য রূপ। মাতৃভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় এটি বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা। বর্তমানে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ মান্দারিনে কথা বলেন। এটি কেবল চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা চীনা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রধান ভাষা। চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মান্দারিন শেখার আগ্রহও বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। এই ভাষা চীনা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে এবং আধুনিক বিশ্বে তার প্রভাব ক্রমাগত বিস্তার করে চলেছে।

হিব্রু: পুনরুজ্জীবনের এক অবিশ্বাস্য উপাখ্যান

হিব্রু একটি প্রাচীন সেমিটিক ভাষা, যার ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের। এটি ইহুদিদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘তোরাহ’ বা ওল্ড টেস্টামেন্টের ভাষা। প্রাচীনকালে এটি কথ্য ভাষা হিসেবে প্রচলিত থাকলেও, খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের পর থেকে এটি মূলত একটি ধর্মীয় ও সাহিত্যিক ভাষায় পরিণত হয় এবং কথ্য রূপ হিসেবে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে হিব্রু কেবল সিনাগগে প্রার্থনা এবং ধর্মগ্রন্থ পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দিকে জায়নবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে হিব্রুকে একটি আধুনিক কথ্য ভাষা হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার এক অভাবনীয় প্রচেষ্টা শুরু হয়। এলিইজার বেন-ইয়েহুদা নামের এক ভাষাবিদ এই আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে হিব্রু আবার মানুষের মুখের ভাষায় পরিণত হয়। এটি ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

আজ হিব্রু ইসরায়েলের দাপ্তরিক ভাষা এবং ৯০ লাখের বেশি মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। আধুনিক জীবনের সমস্ত চাহিদা মেটাতে—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য, গণমাধ্যম—সব ক্ষেত্রে হিব্রু একটি জীবন্ত ও বিকাশমান ভাষা। এটি ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক জাতীয় পরিচয়ের এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন।

আরামীয়: যিশুর ভাষা ও বিস্মৃতির পথে যাত্রা

হিব্রুর মতোই আরামীয় একটি প্রাচীন সেমিটিক ভাষা, যার বয়স তিন হাজার বছরের বেশি। একটা সময় এই ভাষা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ভাষা ছিল। পারস্য এবং ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা ছিল আরামীয়। ঐতিহাসিকদের মতে, যিশুখ্রিষ্ট এবং তার অনুসারীরা আরামীয় ভাষায় কথা বলতেন।

আরামীয় লিপির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। হিব্রু, আরবি, সিরিয়াকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু লিপির উদ্ভব হয়েছে আরামীয় লিপি থেকে। কিন্তু ইসলামের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষার ব্যাপক বিস্তারে আরামীয় ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারাতে থাকে।

আজ আরামীয় একটি বিপন্ন ভাষা। ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও তুরস্কের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে কয়েকটি ছোট ছোট খ্রিষ্টান ও মেন্ডিয়ান সম্প্রদায় এর কিছু উপভাষায় কথা বলে। তবে বক্তার সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। একসময়ের প্রভাবশালী এই ভাষাটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যা ভাষার উত্থান-পতনের এক করুণ সাক্ষী।

ফারসি: কবিতার ভাষা ও সংস্কৃতির বাহক

ফারসি বা পার্সিয়ান ভাষার ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। এটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর ইন্দো-ইরানীয় শাখার একটি ভাষা। প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের ভাষা হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও কবিতার এক সমৃদ্ধশালী ভাষায় পরিণত হয়েছে।

জালাল উদ্দিন রুমি, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসীর মতো বিশ্ববিখ্যাত কবিদের রচনায় ফারসি ভাষা এক শৈল্পিক উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছেছে। তাদের কবিতা ও দর্শন আজও বিশ্বজুড়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। মধ্যযুগে ফারসি কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে মোগল ভারত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের রাজদরবার, প্রশাসন এবং সংস্কৃতির ভাষা ছিল এটি।

বর্তমানে ইরান, আফগানিস্তান (যেখানে এটি দারি নামে পরিচিত) এবং তাজিকিস্তানে (যেখানে এটি তাজিক নামে পরিচিত) ফারসি প্রধান ভাষা। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। এর সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব ফারসিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

লাতিন: এক ‘মৃত’ ভাষার অমর উত্তরাধিকার

লাতিন ছিল প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ভাষা। রোমানদের রাজ্যজয়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভাষা ইউরোপের বিশাল অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখানকার প্রধান প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ভাষায় পরিণত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরেও মধ্যযুগ জুড়ে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, আইন এবং ধর্মচর্চার একমাত্র ভাষা ছিল লাতিন।

সংস্কৃতের মতোই লাতিন থেকেও বহু আধুনিক ভাষার জন্ম হয়েছে। ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ইতালীয় এবং রোমানিয়ান—এই ভাষাগুলোকে একত্রে ‘রোমান্স ভাষা’ বলা হয়, কারণ এদের প্রত্যেকেরই উৎস লাতিন। ইংরেজি ভাষার শব্দভান্ডারের প্রায় ৬০ শতাংশ শব্দ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লাতিন থেকে এসেছে।

আজ লাতিন একটি ‘মৃত’ ভাষা, অর্থাৎ এটি আর কারো মাতৃভাষা নয়। কিন্তু এর প্রভাব আজও সর্বত্র বিদ্যমান। জীববিজ্ঞানে নামকরণ (যেমন হোমো স্যাপিয়েন্স), আইনশাস্ত্র, এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে লাতিন পরিভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ভ্যাটিকান সিটিতে এটি এখনও দাপ্তরিক ভাষা। তাই কথ্য রূপে মৃত হলেও, সভ্যতার গভীরে লাতিন এক অমর ভাষা হিসেবে বেঁচে আছে।

জাপানি: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

জাপানি ভাষার উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এর লিখিত রূপের ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। জাপানি লিখন পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল এবং এটি তিনটি ভিন্ন লিপির সমন্বয়ে গঠিত: চীনা অক্ষর থেকে নেওয়া ‘কাঞ্জি’ এবং জাপানের নিজস্ব ধ্বনিভিত্তিক লিপি ‘হিরাগানা’ ও ‘কাতাকানা’।

জাপানের দীর্ঘ বিচ্ছিন্ন ইতিহাস এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় এই ভাষাকে বাইরের প্রভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত রেখেছে। এটি জাপানের ১২ কোটির বেশি মানুষের ভাষা। জাপানি ভাষা তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধারণ করার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সফলভাবে মানিয়ে নিয়েছে। জাপানের অ্যানিমে, মাঙ্গা, সাহিত্য এবং প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপানি ভাষার প্রতিও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।

আরবি: ধর্ম ও সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী বিস্তার

আরবি একটি সেমিটিক ভাষা, যার ইতিহাস দেড় হাজার বছরের বেশি পুরোনো। সপ্তম শতকে ইসলামের আবির্ভাব এবং পবিত্র কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল হওয়ার পর থেকে এই ভাষার গুরুত্ব ও বিস্তার অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। মুসলিমদের জন্য কোরআনের ভাষা হিসেবে আরবির মর্যাদা সর্বোচ্চ।

ইসলামের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আরবি ভাষা মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং স্পেনের বিশাল অংশে ছড়িয়ে পড়ে। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় বাগদাদ যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, তখন গ্রিক ও ভারতীয়দের বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়, যা পরে ইউরোপে রেনেসাঁর সূচনা করতে সাহায্য করেছিল।

বর্তমানে প্রায় ৩০টি দেশের দাপ্তরিক ভাষা আরবি এবং ২৭ কোটির বেশি মানুষ এতে কথা বলেন। এটি জাতিসংঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষার একটি। আরবি ভাষার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ডান থেকে বামে লিখন পদ্ধতি। ধর্মীয় গুরুত্ব, বিশাল ভাষিক অঞ্চল এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আরবি আজকের বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং প্রভাবশালী ভাষা হিসেবে টিকে আছে।

শেষ কথা

ভাষা নদীর মতো। সে জন্মায়, বিকশিত হয়, বাঁক পরিবর্তন করে, আবার কখনও শুকিয়েও যায়। যে ভাষাগুলো হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে, তারা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মানব অভিজ্ঞতার এক বিশাল সংগ্রহশালা। প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ, শব্দভান্ডার এবং প্রকাশভঙ্গির মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। তামিলের অবিচ্ছিন্ন ঐতিহ্য, হিব্রুর পুনরুজ্জীবন, সংস্কৃত ও লাতিনের অমর প্রভাব—প্রতিটি ভাষার গল্পই মানব সভ্যতার সহনশীলতা ও সৃজনশীলতার প্রতীক।

গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে যখন কিছু প্রভাবশালী ভাষার দাপটে অনেক ছোট ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রাচীন ভাষাগুলোর টিকে থাকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভাষাগত বৈচিত্র্য মানব সভ্যতার জন্য কতটা মূল্যবান। এরা অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সেতু, যা আমাদের শেখায় আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং আমাদের শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। এই জীবন্ত ইতিহাসকে রক্ষা করা এবং তার চর্চা চালিয়ে যাওয়াই মানব সভ্যতাকে আরও সমৃদ্ধ করার অন্যতম উপায়।

পাঠকপ্রিয়