একাডেমিক কিংবা ভর্তি পরীক্ষার সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পেলেও দেশের হাজারো কোচিং সেন্টার চলছে মূলত ‘ব্যবসা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম চালালেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা এর অধীন কোনো দপ্তরের নজরদারির আওতায় নেই এসব প্রতিষ্ঠান।
এর ফলে এসব কোচিং সেন্টারের পাঠদান পদ্ধতি, ফি নির্ধারণ এবং সামগ্রিক মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭টি। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিবন্ধনহীন কোচিংয়ের সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
নিবন্ধনের আইনি ফাঁক
স্থানীয় সরকার আইনের অধীনে কোচিং সেন্টারগুলোকে সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো নিবন্ধন দেওয়া হয়। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও তাদের কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বা পাঠ্যক্রম নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো তদারকির সুযোগ থাকছে না।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ.ন.ম. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, “বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বোর্ডের মাধ্যমে নিবন্ধন নেয় এবং সেগুলো পরিদর্শন করা হয়। কিন্তু কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার আওতায় না থাকায় কোনো পরিদর্শন হয় না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এগুলোর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।”
বিবিএসের জরিপ বলছে, দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ১৭ হাজার এবং শিক্ষক রয়েছেন ৬১ হাজার ৮১২ জন। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশই ব্যক্তিমালিকানাধীন।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষকই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে কোচিং সেন্টারে বেশি সময় দেন। ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধে’ নীতিমালা করলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম বলেন, “এখন যেভাবে চলছে, তাতে এগুলোকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই বলা যায়। যদি সহায়তামূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতে হয়, তবে নিবন্ধন অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা উচিত।”
কেন কোচিংমুখী শিক্ষার্থীরা?
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মতে, স্কুলের পাঠদান মানসম্মত না হওয়ায় এবং পরীক্ষায় ভালো ফলের চাপের কারণেই তারা কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এতে শিক্ষার মান না বাড়লেও পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে বহুগুণ।
রাজধানীর এক অভিভাবক উম্মে হাবিবা বলেন, “সরকারের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানকে সুস্পষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে মনিটরিং বাড়ানো, যেন তারা ইচ্ছেমতো ফি বাড়াতে কিংবা শিক্ষার আড়ালে অন্য কোনো কার্যক্রম চালাতে না পারে।”
শিক্ষাবিদরা বলছেন, কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষায় বৈষম্য তৈরি করছে। যার যত বেশি অর্থ, সে তত ভালো কোচিংয়ের সুযোগ পেয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “কোচিং বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকারের অধীনে এর নিবন্ধন—কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি শিক্ষায় বৈষম্য দূর করতে হয়, তাহলে সরকারকে কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কিছু কোচিং সেন্টার রাখার প্রয়োজন হলেও তা অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কঠোর নীতিমালায় পরিচালনা করতে হবে।”
বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের তথ্যও বলছে, অধিকাংশ কোচিং সেন্টারই নিবন্ধনের বাইরে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জরিপে ৪০১টি কোচিং সেন্টারের মধ্যে মাত্র ১২০টি নিবন্ধিত। রংপুরে দেড় শতাধিক কোচিংয়ের মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৩৫টির।