বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৮৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী তাদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতে চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। এই সংকট নিরসনে প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যে তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
এ অবস্থায় অবসরের ছয় মাসের মধ্যে শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধের সাম্প্রতিক এক উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও বাস্তবায়ন ‘সম্ভব নয়’ বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষকরা বলছেন, বছরের পর বছর নিজেদের জমানো টাকা না পাওয়ায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চিকিৎসা, সন্তানদের বিয়ে বা অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্ব পালনে তারা চরম সংকটে পড়েছেন।
ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ
মুন্সীগঞ্জের রামপাল ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক কাজী আলাউদ্দিন চার বছর ধরে তার অবসর সুবিধার টাকার জন্য অপেক্ষা করছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেলেও টাকার অভাবে তিনি চিকিৎসা করাতে পারছেন না।
কাজী আলাউদ্দিনের মতো হাজারো শিক্ষক পেনশনের টাকার আশায় ঢাকার ব্যানবেইস ভবনে অবস্থিত অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের অফিসে ঘুরে ঘুরে হতাশ হচ্ছেন। অনেকে ধারদেনা করে চলছেন, কেউ কেউ টাকার আশা নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন।
সংকটের কারণ
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তহবিলে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
অবসর সুবিধা বোর্ডের প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে, কল্যাণ ট্রাস্টের ৪২ হাজার ৬০০ আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট ঘাটতি প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা।
এর বিপরীতে সরকার সম্প্রতি অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বন্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ২০০ কোটি টাকা অনুদান বরাদ্দ দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বন্ডের টাকা থেকে যে লভ্যাংশ আসবে, তা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এই বিশাল ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়।
আদালতের নির্দেশনা ও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
গত ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, হাইকোর্ট এক রায়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরের ছয় মাসের মধ্যে অবসরকালীন সুবিধা প্রদানের নির্দেশ দেন। আদালত মন্তব্য করেন, “এই অবসরভাতা পাওয়ার জন্য শিক্ষকরা বছরের পর বছর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে পারেন না।”
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না এবং এ বিষয়ে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন না হলে শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব ও সামাজিক মর্যাদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং তরুণরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাবে।