চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে গত নয় বছরে সবজি চাষের জমি ও মোট উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে এক বিপ্লব ঘটেছে। তবে এই সাফল্যের পেছনেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের জন্য এক বড় শঙ্কার কারণ—হেক্টরপ্রতি গড় ফলন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। জমির উর্বরতা হ্রাস, ইটভাটার আগ্রাসন এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের সবজি উৎপাদনের টেকসই উন্নয়ন এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঞ্চলে সবজি চাষের জমি ১০১ শতাংশ এবং মোট উৎপাদন ১২ লাখ ৫০ হাজার টন (৮২ শতাংশ) বেড়েছে। সমাপ্ত অর্থবছরে রেকর্ড ২৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৫০ টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে, যার প্রায় অর্ধেকই (সাড়ে ৪৫ শতাংশ) হয়েছে চট্টগ্রাম জেলায়।
কিন্তু এই বিপুল উৎপাদনের আড়ালে উদ্বেগজনকভাবে কমেছে জমির উৎপাদন ক্ষমতা। নয় বছর আগে যেখানে প্রতি হেক্টরে গড়ে ২১.৪০ টন সবজি উৎপাদিত হতো, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৪৫ টনে। অর্থাৎ, প্রতি হেক্টরে ফলন কমেছে প্রায় দুই টন।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত দোহাজারীর কৃষক আবদুস সবুর চার দশকের বেশি সময় ধরে সবজি চাষ করছেন। তিনি বলেন, “আগে অল্প জমিতে অনেক বেশি সবজি পেতাম। এখন হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহার করেও আগের মতো ফলন হয় না। এলাকার ইটভাটাগুলো জমির টপসয়েল কেটে নেওয়ায় উর্বরতা কমে গেছে। কৃষিজমি রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা বলছেন, যশোর বা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামে সার, শ্রমিক, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় সবজি উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। লাভের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় অনেকে চাষাবাদ কমিয়ে জমি লিজ দিয়ে দিচ্ছেন অথবা হাঁস-মুরগির খামার করছেন।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, “আমরা ধান ছাড়াও অন্যান্য ফসল, বিশেষ করে সবজি চাষ বাড়াতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। প্রতি বছর সবজি চাষে জমির পরিমাণ বাড়ছে এবং কৃষক লাভবান হচ্ছেন।”
তিনি আরও জানান, সবজি আবাদ আরও বাড়াতে সরকার বড় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং চাষিদের বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট উৎপাদন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। তবে হেক্টরপ্রতি ফলন কমে যাওয়ার বিষয়টি একটি অশনিসংকেত। জমির স্বাস্থ্য রক্ষা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষিজমিকে অকৃষি খাতে ব্যবহার বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চট্টগ্রামের এই কৃষি সাফল্য ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়তে পারে।