দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসার পূর্বাভাস সত্ত্বেও নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকেই বেশি ঝুঁকেছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। এর ফলে এখন বাংলাদেশকে অন্তত ২০ গুণ বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানির সঙ্গে অনেকের ‘কমিশন-বাণিজ্যের’ সম্পর্ক থাকায় বছরের পর বছর ধরে স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতটি অবহেলিত থেকেছে, যা দেশকে আজকের জ্বালানি সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, দেশে প্রতি বছর দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমছে। তিনি বলেন, “রাতারাতি গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি বেশ কিছু কূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
উৎপাদন কমছে, আমদানি বাড়ছে
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, সাত বছর আগেও দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, যা এখন ১৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, গ্যাসের চাহিদা বেড়ে দৈনিক প্রায় ৫৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে, যার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতির প্রায় ৪০ শতাংশই পূরণ করা হচ্ছে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করে।
২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে অবহেলা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম বলেন, “গত এক বছরেও গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন হয়নি। আমাদের দেশে গ্যাস পাওয়ার বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনুসন্ধান কাজটি নানান অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে ব্যাপক হারে তেল-গ্যাস উত্তোলন করলেও সমুদ্রসীমা বিজয়ের এক যুগ পরও আমরা সেখানে অনুসন্ধানই শুরু করতে পারিনি।”
পেট্রোবাংলা ২০২২ সালে ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিলেও তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগে ২০১৬ সালেও ১০৮টি কূপ খননের একটি পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি।
বাড়তি ব্যয়ের বোঝা
বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ গ্যাসের মজুদ আছে, তা দিয়ে আর মাত্র আট-নয় বছর চলতে পারে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে বিগত সরকার গত চার বছরে পাঁচবার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতের দামেও। তবুও শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাসের সংকট কাটেনি।