সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আতঙ্কের জনপদ রাউজান: ১৪ মাসে ১৬ হত্যাকাণ্ড, নেপথ্যে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক

একের পর এক সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ১৪ মাসে এখানে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে ১১টিই রাজনৈতিক সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে।

স্থানীয়রা বলছেন, উপজেলাজুড়ে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে, যারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বালুমহাল, পাহাড় কাটা, ঠিকাদারি এবং বিভিন্ন ব্যবসা থেকে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গত ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উপজেলার মদুনাঘাট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় বিএনপি কর্মী মুহাম্মদ আবদুল হাকিমকে (৫২)। এই হত্যাকাণ্ডের পর রাউজানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আবারও প্রকাশ্যে আসে।

উপজেলায় বিএনপির রাজনীতি মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং অন্য অংশের নেতৃত্বে আছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকার।

গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী নিহত হাকিমকে নিজের অনুসারী দাবি করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি রাউজানকে শান্তির জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমার কাছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের কোনো স্থান নেই।”

অন্যদিকে, গোলাম আকबर খন্দকার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, রাউজানের হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা নেই। তার মতে, “মাটি কাটা, বালুমহাল দখল, ঠিকাদারি থেকে কমিশন বাণিজ্য এবং চাঁদাবাজির বিরোধেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে।”

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার নোয়াপাড়া, পশ্চিম গুজরা ও বাগোয়ানসহ প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। ফজল হক বাহিনী, জসিম বাহিনী, কামাল বাহিনী ও রমজান বাহিনীর মতো গ্রুপগুলোর অত্যাচারে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পথেরহাট বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, “আগে মধ্যরাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতাম। এখন সন্ধ্যা নামতেই গোলাগুলির ভয়ে বন্ধ করে দিই। সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো প্রায়ই চাঁদা নিয়ে যায়।”

রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনায় আটজন, কমর উদ্দিন হত্যায় দুজন এবং আব্দুল্লাহ মানিক হত্যায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ জানান, আব্দুল হাকিম হত্যা মামলায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিসান বিন মাজেদ বলেন, “রাউজানে সন্ত্রাসীদের অবস্থান ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার গুগল ম্যাপ তৈরি করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পাঠকপ্রিয়