সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আওয়ামী আমলের ‘নয়ছয়’, ব্যাংকে নেই ৬ হাজার কোটি; হাইকোর্টের নির্দেশও মানা যাচ্ছে না

অবসরের টাকা নেই ৮৮ হাজার শিক্ষকের, তহবিলে ৯ হাজার কোটির সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

চাকরি জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু পেতে বছরের পর বছর ঘুরছেন দেশের প্রায় ৮৮ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী। হজে যাওয়া, মেয়ের বিয়ে দেওয়া বা অসুস্থতার চিকিৎসা করানো—কোনোটাই সম্ভব হচ্ছে না অনেকের। তহবিলে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি থাকায় এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলে আর্থিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠায়, অবসরের চার বছর পেরিয়ে গেলেও মিলছে না প্রাপ্য টাকা।

রংপুরের মিঠাপুকুরের বাসিন্দা, সাবেক সহকারী অধ্যাপক মো. আশরাফুল ইসলাম তাদেরই একজন। ২০২৩ সালে অবসরে যাওয়ার পর হজে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু অবসরের টাকা না পাওয়ায় তা পূরণ হয়নি। উল্টো ওপেন হার্ট সার্জারি আর পায়ের আঙুলে পচন ধরার চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয়েছে জমি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “এত চিকিৎসা করছি, টাকা পাবো কই?”

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে অবসরে যাওয়া প্রায় ৮৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন ঝুলে আছে। এই বিপুল পরিমাণ আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গত জুন-জুলাইয়ে বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

এই পরিস্থিতিতে গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট অবসরের ছয় মাসের মধ্যে সকল পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিলেও অর্থ সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের বেঞ্চ এই রায় দিয়েছিলেন।

কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, সংকটের মূলে রয়েছে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অব্যবস্থাপনা বা ‘নয়ছয়’। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যে ব্যাংকে (ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক) রাখা হয়েছিল, সেটি এখন তারল্য সংকটে ভুগছে। এমনকি সম্প্রতি নিষ্পত্তি হওয়া ৩১ কোটি টাকাও ব্যাংকটি পরিশোধ করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

গত ৩ মার্চ পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য জমানো ৬ হাজার কোটি টাকা যে ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, সেটি ‘দেউলিয়া’ হওয়ায় সেই টাকা এখন আর নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ লোপাট হওয়ায় সুবিধা করা যাচ্ছে না। আমরা চাইলেও কিছু করতে পারছি না। তাই ধীরে চলো নীতিতে অগ্রসর হচ্ছি।”

শুধু অতীতের অনিয়মই নয়, বর্তমানেও তহবিল দুটিতে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অবসর সুবিধা বোর্ডের মাসিক চাহিদা ৬৫ কোটি টাকা হলেও আয় হয় মাত্র ৫৫ কোটি টাকা, ঘাটতি থাকে ১০ কোটি। কল্যাণ ট্রাস্টেরও প্রতি মাসে ঘাটতি প্রায় ১৩ কোটি টাকা।

শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা কনসার্ন। শিক্ষকদের ভোগান্তি লাঘবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।” তবে কবে নাগাদ এই ৮৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী তাদের পাওনা বুঝে পাবেন, তা এখনো অনিশ্চিত।

পাঠকপ্রিয়