দেশের সড়ক ও সেতুর টোল আদায় খাতটি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও নেতাদের অবৈধ আয়ের এক লোভনীয় ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। আধুনিক টোল ব্যবস্থাপনার নামে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব লুটপাট করা হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়া এখনও অনেক ক্ষেত্রে অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এবং গুম-খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা তাদের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানির মাধ্যমে এই ‘লুটপাটের সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছিলেন।
জুলাই বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও প্রশাসনের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশ করে ইউডিসি, সিএনএস, শামীম এন্টারপ্রাইজ, রেগনাম, এটিটি ও পেন্টা গ্লোবালের মতো কোম্পানিগুলো এখনও বিভিন্ন সেতুর টোল আদায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যেভাবে চলত ‘লুটপাট’
সূত্রমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব কোম্পানির এতটাই প্রভাব ছিল যে, তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে অডিটও করা হতো না। অভিযোগ রয়েছে, তারা টোল আদায়ের ৫০ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাকি ৫০ শতাংশ আত্মসাৎ করত। ভারতীয় অংশীদার ভ্যান ইনফ্রার সহায়তায় এবং নানা কৌশলে শত শত কোটি টাকা এভাবে লোপাট করা হয়েছে।
আনিসুল হকের কোম্পানি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস) দলীয় প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার ছাড়াই সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে ২৪ শতাংশ হারে যমুনা সেতুর টোল আদায় করেছে। কোম্পানিটি এখনও ভৈরব, ঘোড়াশাল ও লেবুখালী সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করছে।
মির্জা আজমের নিয়ন্ত্রণাধীন ইউডিসি কনস্ট্রাকশন বর্তমানে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্বে আছে। এর আগে তারা রূপসা, লালন শাহ ও কর্ণফুলী সেতুর টোল ১৭ বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করেছে। শামীম এন্টারপ্রাইজ ও ইউডিসি মগবাজার উড়াল সড়ক ও বিআরটি প্রকল্পের মতো বড় কাজও বাগিয়ে নিয়েছিল।
ওবায়দুল কাদেরের ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ এটিটি শেরপুর ও ফেঞ্চুগঞ্জ সেতু এবং রেগনাম রিসোর্স চরসিন্ধুর সেতুর টোল নিয়ন্ত্রণ করত বা করছে। জিয়াউল আহসানের কোম্পানি পেন্টা গ্লোবালও বিভিন্ন টোলের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন করে দরপত্রে অংশ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
দুর্নীতির তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি
সম্প্রতি মেঘনা-গোমতী সেতুতে টোল আদায়ে দুর্নীতির অভিযোগে সিএনএসের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, জুলাই বিপ্লবের পরও ‘অদৃশ্য শক্তির ইশারায়’ এবং প্রশাসনের একাংশের ‘অবৈধ সুবিধা’ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের কোম্পানিগুলো এখনও টোল আদায়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দরপত্রগুলো এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে নতুন কোনো কোম্পানি অংশ নিতে না পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ইউডিসি কনস্ট্রাকশনের পরিচালক কামাল আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রেগনাম রিসোর্সের পরিচালক মোহাম্মদ জনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবসা করেননি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে রাজনীতিকদের প্রভাবে এ ধরনের দুর্নীতি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল। আমলাদের যোগসাজশ ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। সংশ্লিষ্ট আমলাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।”
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় কোম্পানিগুলো ব্যাপক দুর্নীতি করেছে এবং মেয়াদ শেষের পরও অবৈধভাবে টোল আদায় করেছে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দরপত্র এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পরিহার করতে হবে।”
এসব বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।