সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পাহাড়ে আত্মগোপন, শহরে গুলি: কে এই দুর্ধর্ষ রায়হান?

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের রাউজানে স্ত্রী ও সন্তানের সামনে যুবদলকর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলমকে (৪৫) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে এ ঘটনার পর আলমের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তিনি ‘সন্ত্রাসী’ রায়হানকে নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। পুলিশও এই হত্যাকাণ্ডে রায়হানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আলম মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতল বাজারসংলগ্ন কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে পৌঁছালে কবরস্থানে লুকিয়ে থাকা আটজন অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় আলম ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তার স্ত্রী ও সন্তান পেছনের একটি অটোরিকশায় ছিলেন। পাশের গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন তারা। অস্ত্রধারীরা আলমকে হত্যার পর রাঙামাটি সড়ক দিয়ে অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত আলমের শরীরে পাঁচটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

হত্যার ঘটনার পর শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আলমকে এক ব্যক্তির সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে দেখা যায়। সেখানে ‘সন্ত্রাসী’ রায়হানের নাম উল্লেখ করে অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে তাকে বলতে শোনা যায়, “তুমি যে শোডাউন করিয়েছ আতঙ্ক সৃষ্টি করে, আমাকে তো মেরেও ফেলতে পারত… ওরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসেছে আমাকে থ্রেট দিতে।”

কথোপকথনে আলম আরও বলেন, “আমি বাঁচতে চাই। ১৭ বছর আমি স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে কারাগারে ছিলাম। এখনো যদি তোমাদের কারণে কষ্টে থাকি, আমি কার কাছে যাব। আমাকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। …আমি তো একলা ছিলাম। জনগণ পাশে আসায় ওরা চলে গেছে। নইলে তো আমার মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল।”

আলমের সঙ্গে কথোপকথনের সময় মুঠোফোনের অপর প্রান্তে কে ছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কথোপকথনে কয়েকজন স্থানীয় বিএনপি নেতার নাম উল্লেখ করেন আলম। জানতে চাইলে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “হত্যার ঘটনাটিতে কে বা কারা জড়িত, তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। নিহত আলম যাদের আগ থেকে সন্দেহ করতেন, তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

পুলিশ জানিয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অস্ত্র-মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় ১২ বছর কারাগারে ছিলেন আলম। গত বছরের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। আলম চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

পুলিশ জানায়, রায়হান নামের যে ব্যক্তির নাম আলমের কথোপকথনে উঠে এসেছে, তার বিরুদ্ধে গত বছরের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় জোড়া খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি হত্যা মামলা। হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় কারাগারে গিয়ে চট্টগ্রামের আলোচিত ‘সন্ত্রাসী’ ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় হয় রায়হানের। গত বছরের ৫ আগস্টের পর দুজন কারাগার থেকে জামিনে বের হলে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রায়হান। সাজ্জাদ সম্প্রতি আবারও কারাগারে গেলে তার অস্ত্রভান্ডারের দেখভাল করছেন এই রায়হান। তিনি রাউজানের মৃত বদিউল আলমের ছেলে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছোট সাজ্জাদ মূলত চট্টগ্রামের আলোচিত আট ছাত্রলীগ নেতা খুনের মামলায় অভিযুক্ত (পরে খালাস পাওয়া) ও বর্তমানে বিদেশে পলাতক ‘শিবির ক্যাডার’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের বিশ্বস্ত সহযোগী। ছোট সাজ্জাদের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। বড় সাজ্জাদের হয়ে তিনি নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও হাটহাজারীতে অপরাধ সংঘটিত করে আসছিলেন। গত ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে সাজ্জাদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেট কার গুলি করে ঝাঁজরা করা হয়। ওই ঘটনায় দুজন নিহত হন। পুলিশ জানায়, আধিপত্য বিস্তারের জেরে আরেক সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেনকে মারতে গুলি করা হয়, কিন্তু তিনি বেঁচে যান। জোড়া খুনের এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল বলেন, “কথায় কথায় গুলি ছোড়েন সন্ত্রাসী রায়হান। তাকে ধরতে একাধিকবার অভিযান চালিয়েও পাওয়া যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, “রাউজান ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা করেছেন রায়হান। সেখান থেকে এসে অপরাধ করেন, বিশেষ করে গুলির পর দ্রুত পাহাড়ের নিরাপদ স্থানে চলে যান তিনি। সন্ত্রাসী সাজ্জাদের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠেন রায়হান।”

তিন ভাই এক বোনের মধ্যে রায়হান দ্বিতীয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশে যোগ দিতেন রায়হান এবং স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের সঙ্গে তার সখ্য ছিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির সভায় যোগ দিতে শুরু করেন।

পাঠকপ্রিয়