সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ঋণকাণ্ড: নাইক্ষ্যংছড়ির ২২ দিনমজুরের নামে ২৫০ কোটি টাকা লোপাট

নিজস্ব প্রতিবেদক

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ঘেরা গ্রাম হলদ্যাশিয়া। এখানকার দিনমজুর ও ভূমিহীন মানুষজনের জীবনে হানা দিয়েছে এক অবিশ্বাস্য আতঙ্ক। এই গ্রামের নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আইয়ুব, ফরিদুল আলমসহ মোট ২২ জন হতদরিদ্র নারী-পুরুষের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে ২৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন ঋণের নোটিশ মাথায় নিয়ে পাগলপ্রায় মানুষগুলো।

এই ভয়াবহ জালিয়াতির ফাঁদ পাতা হয়েছিল করোনাভাইরাস মহামারির সময়। সেসময় আর্থিক ও খাদ্যসহায়তা এবং চাকরি দেওয়ার কথা বলে এই ২২ জনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ করা হয়। এর প্রায় এক মাস পর তাঁদের পটিয়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কাছে একটি দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রত্যেককে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ইংরেজি ভাষায় লেখা বিভিন্ন নথিপত্রে স্বাক্ষর ও টিপসই নেওয়া হয়।

এরপর ২০২৩ সাল থেকে তাঁদের নামে ইউসিবি ব্যাংকের চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী, চকবাজার ও চট্টগ্রাম বন্দর শাখা থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের নোটিশ আসতে শুরু করে। তখনই তাঁরা প্রথম বুঝতে পারেন, কী ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছেন তাঁরা।

সরেজমিনে হলদ্যাশিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় হতদরিদ্র মানুষগুলোর ভয়াবহ অবস্থা। দিনমজুর মোহাম্মদ আইয়ুবের টিনের ছাউনির ঝুপড়ি ঘরে স্ত্রী আর তিন সন্তান নিয়ে টানাটানির সংসার। অথচ তাঁর নামে ইউসিবি থেকে ৬ কোটি ১২ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধের নোটিশ এসেছে। মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, “টেনশনে রাতে ঘুমাইতে পারি না। জীবনে একসঙ্গে ১ লাখ টাকা দেখি নাই। ৬ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে কীভাবে নিলাম, বুঝতে পারতেছি না।” তিনি জানান, ১৪৫ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম শহরে যাওয়ার গাড়ি ভাড়াই তাঁর নেই, অথচ সেখানেই তাঁর নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।

একই গ্রামের আরেক দিনমজুর মো. ফরিদুল আলম। লোকজনের বাড়িতে বাঁশের বেড়া তৈরি করে সংসার চালান। তাঁর নামে চট্টগ্রামের বন্দর শাখা থেকে ১০ কোটি ৮২ লাখ টাকার বকেয়া ঋণের নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাঠানো ওই নোটিশে স্বাক্ষর করেন পোর্ট শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক মো. আরিফ হোসেন। নোটিশে ফরিদুল আলমকে চট্টগ্রাম জুবিলী রোডের ‘ইউনিক এন্টারপ্রাইজ’ নামে এক প্রতিষ্ঠানের মালিক দেখানো হয়েছে। ফরিদুল আলম এই প্রতিষ্ঠানের নাম শুনে হেসে ওঠেন, কারণ তিনি নামটি ঠিকমতো উচ্চারণও করতে পারেননি।

প্রতারণার শিকার হয়েছেন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেও। হলদ্যাশিয়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রামুর ঈদগড় ইউনিয়নের পূর্ব রাজঘাট গ্রামের দিনমজুর নুরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মায়মুনা আক্তারের নামেও ইউসিবি চট্টগ্রামের চকবাজার শাখা থেকে নোটিশ আসে। নুরুল ইসলামের নামে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা সুদসহ ৮ কোটি ৫৫ লাখ এবং মায়মুনার নামে একই পরিমাণ ঋণ দেখানো হয়। স্বামী-স্ত্রীর ঘাড়ে এখন সুদসমেত মোট ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। নোটিশে নুরুল ইসলামকে ‘ইসলাম ট্রেডার্স’ এবং পটিয়ার কিছু জমির মালিক দেখানো হয়েছে। তাঁদের প্রতিবেশী আরেক দিনমজুর মো. জহির উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী উম্মে সালমার নামে ‘জহির ইন্টারন্যাশনাল’ নামক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে সাড়ে ৭ কোটি টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে। জহির উদ্দিন অবাক হয়ে বলেন, “দিনমজুরি করে সংসার চালাই, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোথায় পাব।”

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই জালিয়াতির নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবার। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে ইউসিবি ব্যাংক কার্যত এই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন সাইফুজ্জামানের স্ত্রী রুখমিলা জামান এবং নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁর ছোট ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের নির্দেশনায় নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংক থেকে ঋণ মঞ্জুর করা হতো।

এই চক্রের হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করত একটি দালাল চক্র। কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড়ের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারীর নুরুল বশর হতদরিদ্রদের কাছ থেকে এনআইডি সংগ্রহের দায়িত্ব পান। তাঁদের এই কাজে লাগান নুরুল বশরের ভগ্নিপতি ঈদগড়ের পানিস্যাঘোনা এলাকার আবুল কালাম। তবে একসময় মিজানুর রহমান ও নুরুল বশর নিজেরাও এই ঋণের ফাঁদে পড়েন। মিজানুর রহমান ৯ কোটি টাকা ও নুরুল বশর ১৩ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পরিশোধের নোটিশ পেয়েছেন।

নুরুল বশর বলেন, ভগ্নিপতি আবুল কালামের ফাঁদে পড়ে তিনি এখন এলাকাছাড়া। আবুল কালাম বর্তমানে চট্টগ্রামের পটিয়ায় বসবাস করেন। আবুল কালামের কথা অনুযায়ী তাঁরা পটিয়ায় গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান, মো. শাহজাহান ও নুরুল আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করেন এবং কাগজে সই করেন। পটিয়ার এই তিন ব্যক্তি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের হয়ে কাজ করেন বলে তাঁরা জেনেছেন। সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ও মামলা দায়েরের পর থেকে আবুল কালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, শাহজাহান ও নুরুল আনোয়ার সবাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাঁদের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।

বাইশারী ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, প্রতারণার ফাঁদে পড়া মানুষগুলো সত্যিই দিনমজুর ও ভূমিহীন। বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাঁরা প্রতিনিয়ত ইউপি কার্যালয়ে এসে ধরনা দিচ্ছেন।

এদিকে, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবারের ঘনিষ্ঠ একজন ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও পটিয়া এলাকার দীর্ঘ সময় সংসদ সদস্য ছিলেন। এসব এলাকার লোকদের ব্যবহার করেই তাঁরা ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউসিবি ব্যাংকের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা জীশান কিংশুক হক বলেন, “এসব অনিয়ম-দুর্নীতি গত পরিচালনা পর্ষদের সময়ে হয়েছে। আমরা এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি।” তবে তিনি এও যোগ করেন, “হতদরিদ্র-দিনমজুর হলেও তাঁরা কিছু টাকাও যদি পেয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদেরও দুর্নীতির অংশীদার হিসেবে ধরা হবে। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে।” ব্যাংকের এই বক্তব্যে ভুক্তভোগী দরিদ্র মানুষগুলোর আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

পাঠকপ্রিয়