সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

লৌহমানব গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসন, রক্তাক্ত পরিণতি আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে

শরীফুল রুকন

২০১১ সালের ২০ অক্টোবর। সিয়ার্ত শহরের এক পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের ভেতরে লুকিয়ে ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। একসময়ের সেই দাপুটে নেতা, যিনি পশ্চিমা বিশ্বকে নাচিয়েছেন তাঁর খেয়াল-খুশিমতো, তিনিই সেদিন প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন নোংরা পাইপের অন্ধকারে। কিন্তু নিয়তি ছিল নির্মম। বিদ্রোহীরা কামানের গোলা ছুঁড়লো পাইপের দিকে। বের হয়ে আসতে বাধ্য হলেন গাদ্দাফি। এরপর যা ঘটলো, তা ছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাসের সমাপ্তি। গুলির পর গুলি। রক্তে ভেসে গেল লিবিয়ার মরুভূমির বালু। টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁর দেহ। কথিত আছে, তাঁর মরদেহ একটি বিপণিবিতানের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। এভাবেই শেষ হলো ৪২ বছরের এক বিতর্কিত শাসনের।

গাদ্দাফি কে ছিলেন? একজন স্বৈরশাসক, নাকি তেল-সমৃদ্ধ লিবিয়ার কল্যাণকামী নেতা? একজন সন্ত্রাসের মদদদাতা, নাকি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লবী? তাঁর মৃত্যুর ১৪ বছর পর আজও এই প্রশ্নগুলো বিতর্কিত। কেউ তাঁকে মনে রাখেন উন্নয়নের স্থপতি হিসেবে, কেউ দেখেন একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে। লিবিয়ার বর্তমান অবস্থা দেখে অনেকে আজ নস্টালজিয়ায় ভোগেন গাদ্দাফি-যুগের জন্য। আবার অনেকেই বলেন, আজকের বিশৃঙ্খলার বীজ তিনিই বুনে গিয়েছিলেন।

এই স্টোরিতে আমরা খুঁজে দেখবো গাদ্দাফির পুরো জীবনকাহিনী। কীভাবে একজন দরিদ্র বেদুইন পরিবারের সন্তান হয়ে উঠলেন লিবিয়ার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী? কেন পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে ভয় পেতো? তাঁর শাসনামলে লিবিয়ার প্রকৃত চেহারা কেমন ছিল? এবং তাঁর মৃত্যুর পর লিবিয়া কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

মরুভূমির সন্তান থেকে বিপ্লবী

মুয়াম্মার মুহাম্মদ আবু মিনিয়ার আল-গাদ্দাফি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালে (মতান্তরে ১৯৪০), সিয়ার্তের কাছে কাসর আবু হাদি নামক এক প্রত্যন্ত মরুভূমি এলাকায়। তাঁর পরিবার ছিল কাদাধফা গোত্রের, যারা লিবিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোতে খুব একটা প্রভাবশালী ছিল না। বাবা ছিলেন একজন যাযাবর বেদুইন পশুপালক, যিনি নিজে কখনো স্কুলে যাননি, এমনকি পড়তেও জানতেন না।

গাদ্দাফির জন্ম হয়েছিল একটি তাঁবুতে। বেদুইন ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁর শৈশব কেটেছে মরুভূমিতে। তবে তাঁর বাবা ছিলেন দূরদর্শী। নিজে নিরক্ষর হলেও তিনি বুঝেছিলেন শিক্ষার মূল্য। প্রচণ্ড আর্থিক কষ্ট সহ্য করেও ছেলেকে স্কুলে পাঠালেন। সেই সময়ে লিবিয়ায় শিক্ষা ছিল অবৈতনিক নয়। সপ্তাহে গাদ্দাফি মসজিদে থাকতেন, শুধু সপ্তাহান্তে এবং ছুটির দিনে ২০ মাইল হেঁটে বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে যেতেন।

শহুরে ছাত্রদের কাছে দরিদ্র বেদুইন বালক গাদ্দাফি ছিলেন উপহাসের পাত্র। তাঁকে বুলিং করা হতো, বৈষম্যের শিকার হতে হতো। কিন্তু এই কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁর ভেতরে জন্ম দিলো এক জেদ, এক দৃঢ়তা। সিয়ার্ত থেকে তিনি এবং তাঁর পরিবার চলে যান দক্ষিণ-মধ্য লিবিয়ার সাবহা শহরে। সেখানে তাঁর বাবা একজন উপজাতীয় নেতার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ নেন এবং গাদ্দাফি মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হন-এমন শিক্ষা যা তাঁর কোনো অভিভাবক কখনো পাননি।

স্কুলে গাদ্দাফির অনেক শিক্ষক ছিলেন মিসর থেকে আসা। তাঁরা তাঁকে জানালেন মিসরের নাটকীয় ঘটনাবলির কথা, বিশেষ করে জামাল আবদেল নাসেরের বিপ্লবের কথা। নাসের হয়ে উঠলেন গাদ্দাফির আদর্শ। ১৯৫২ সালে নাসের কীভাবে মিসরের রাজতন্ত্র উৎখাত করে একটি নতুন আরব জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি গাদ্দাফির মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি নিজেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন লিবিয়ায় এমন একটি বিপ্লবের।

১৯৬৩ সালে গাদ্দাফি লিবিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম এবং প্রবল আরব জাতীয়তাবাদী হিসেবে, তিনি ইতিমধ্যে পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলেন কীভাবে লিবিয়ার রাজা ইদ্রিস-এর সরকার উৎখাত করা যায়। ১৯৬৫ সালে তিনি লিবিয়ার সামরিক একাডেমি থেকে স্নাতক হন এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেতে থাকেন, কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ভিন্ন-একটি অভ্যুত্থান।

রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতা দখল

১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর। তারিখটি লিবিয়ার ইতিহাসে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে আছে। সেদিন মাত্র ২৭ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন গাদ্দাফি এবং তাঁর সহযোগী তরুণ সেনা কর্মকর্তারা একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটান। সেই সময় লিবিয়ার রাজা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইদ্রিস চিকিৎসার জন্য তুরস্কে ছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্বে ছিলেন তাঁর ভাইপো যুবরাজ সাইদ হাসান অর রিদা আল-মাহদি। এই সুযোগকে কাজে লাগালেন গাদ্দাফি এবং তাঁর ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট।

পুরো অভ্যুত্থানটি ছিল আশ্চর্যরকম সহজ এবং সুসংগঠিত। সেনাবাহিনীর মূল কেন্দ্রগুলো দখল করা হলো। রেডিও স্টেশন থেকে ঘোষণা করা হলো নতুন সরকারের কথা। রিদা আল-মাহদিকে গৃহবন্দী করা হলো। প্রায় কোনো রক্তপাত ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তর হলো। গাদ্দাফি রেডিওতে ঘোষণা করলেন:

“লিবিয়ার জনগণ! তোমাদের নিজের ইচ্ছার প্রতিফলনে, তোমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে আন্তরিক আকাক্সক্ষা পূরণে, পরিবর্তন ও পুনর্জন্মের জন্য তোমাদের অবিরাম দাবি শুনে, বিদ্রোহের জন্য তোমাদের উস্কানিতে সাড়া দিয়ে: তোমাদের সশস্ত্র বাহিনী দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থার উৎখাত ঘটিয়েছে। আমাদের বীর সেনাবাহিনী এক আঘাতে এই মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছে এবং তাদের প্রতিমা ধ্বংস করেছে।”

অভ্যুত্থানের পর গাদ্দাফি নিজের ক্যাপ্টেন পদ পরিবর্তন করে কর্নেল উপাধি নিলেন-একটি উপাধি যা তিনি সারাজীবন রাখবেন। তিনি হলেন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং লিবিয়া রাষ্ট্রের ডি ফ্যাক্টো প্রধান। লিবিয়ান আরব রিপাবলিক ঘোষণা করা হলো, যার মূলমন্ত্র ছিল “স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র এবং ঐক্য”।

প্রথম দিকে গাদ্দাফি ছিলেন তুলনামূলকভাবে জনপ্রিয়। রাজা ইদ্রিসের শাসনামলে লিবিয়া পশ্চিমা শক্তিগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের কাছে অনেকটাই পুতুল রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল। তেলের বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ লিবিয়ান জনগণের জীবনমান ছিল অত্যন্ত নিম্ন। গাদ্দাফি প্রতিশ্রুতি দিলেন একটি নতুন লিবিয়া গড়ার, যেখানে তেলের সম্পদ হবে সব লিবিয়ানদের জন্য।

শাসনের প্রথম দশক-ইসলামী সমাজতন্ত্র এবং জামাহিরিয়া

ক্ষমতায় আসার পরপরই গাদ্দাফি বেশ কিছু আমূল পদক্ষেপ নিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি লিবিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলো উচ্ছেদ করলেন। একই বছর তিনি দেশ থেকে বহিষ্কার করলেন ইতালীয় এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ সদস্যকে-যারা দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছিল। ১৯৭৩ সালে তিনি লিবিয়ার সব বিদেশি মালিকানাধীন তেল সম্পদ জাতীয়করণ করলেন।

গাদ্দাফির রাজনৈতিক দর্শন ছিল তাঁর নিজস্ব একটি মিশ্রণ। তিনি এটিকে নাম দিলেন “তৃতীয় আন্তর্জাতিক তত্ত্ব”-যা ছিল পুঁজিবাদ এবং সাম্যবাদের মাঝামাঝি একটি পথ। ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত “গ্রিন বুক”, যেখানে তিনি তাঁর ইসলামী সমাজতন্ত্রের ধারণা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলেন।

১৯৭৭ সালের ২ মার্চ একটি নতুন যুগ শুরু হলো। গাদ্দাফির নির্দেশে জেনারেল পিপলস কংগ্রেস “জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা” গ্রহণ করলো। লিবিয়ান আরব রিপাবলিক বিলুপ্ত হলো এবং তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হলো “গ্রেট সোশ্যালিস্ট পিপলস লিবিয়ান আরব জামাহিরিয়া”। জামাহিরিয়া ছিল গাদ্দাফির আবিষ্কৃত একটি শব্দ, যার অর্থ “জনতার রাষ্ট্র” বা “জনগণের দ্বারা শাসিত রাষ্ট্র”।

তাত্ত্বিকভাবে, জামাহিরিয়া ছিল একটি সরাসরি গণতন্ত্র। সব প্রাপ্তবয়স্ক লিবিয়ান ১৮৭টি বেসিক পিপলস কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করতে এবং জাতীয় সিদ্ধান্তে ভোট দিতে পারতো। এই কংগ্রেসগুলো থেকে প্রতিনিধিরা যেতেন বার্ষিক জেনারেল পিপলস কংগ্রেসে, যা টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। নীতিগতভাবে, এই কংগ্রেসগুলোই ছিল লিবিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতা, এবং সরকারি কর্মকর্তা বা এমনকি গাদ্দাফি নিজে যেকোনো বড় সিদ্ধান্তের জন্য পিপলস কংগ্রেসের সম্মতি নিতে বাধ্য ছিলেন।

বাস্তবে অবশ্য, এটি ছিল একটি পুলিশ রাষ্ট্র, যেখানে এক ব্যক্তির শাসন ছিল নিরঙ্কুশ। গাদ্দাফি নিজেকে কোনো আনুষ্ঠানিক পদে বসাননি। তিনি ছিলেন “ব্রাদারলি লিডার” বা “ভ্রাতৃসম নেতা”। কিন্তু সবাই জানতো প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে।

দেশের পতাকাও পরিবর্তন হলো। একটি সম্পূর্ণ সবুজ পতাকা গৃহীত হলো-বিশ্বের একমাত্র এক-রঙের জাতীয় পতাকা। সবুজ ছিল ইসলামের রঙ এবং গাদ্দাফির গ্রিন বুকের প্রতীক।

তেলের সোনালি যুগ এবং সামাজিক উন্নয়ন

গাদ্দাফির শাসনামলের প্রথম দুই দশক লিবিয়ায় এনেছিল অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি। ১৯৭০-এর দশকে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে লিবিয়ার আয় বহুগুণ বেড়ে যায়। আফ্রিকার যেকোনো দেশের তুলনায় লিবিয়ার তেলের মজুত ছিল সবচেয়ে বেশি। এই বিপুল সম্পদ গাদ্দাফি ব্যবহার করলেন দেশের আমূল রূপান্তরে।

শিক্ষাখাত ছিল তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার। গাদ্দাফির শাসনের আগে লিবিয়ায় মাত্র ২৫% মানুষ ছিল সাক্ষর। তাঁর আমলে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩%-এ। শিক্ষা করা হলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, যদি কোনো লিবিয়ান লিবিয়ায় তার প্রয়োজনীয় শিক্ষা বা চিকিৎসা সুবিধা না পায়, তাহলে সরকার তাকে বিদেশে পাঠাতো এবং সম্পূর্ণ খরচ বহন করতো-শুধু তাই নয়, তাকে মাসিক ২,৩০০ মার্কিন ডলার আবাসন এবং গাড়ি ভাতা দেওয়া হতো।

চিকিৎসাব্যবস্থাও হলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করা হলো সারাদেশে। লিবিয়া অর্জন করলো আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চ মানব উন্নয়ন সূচক। ২০১০ সালে লিবিয়ার ঐউও ছিল ০.৭৫৫, যা সেই বছরে আফ্রিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দেশের তুলনায় ০.০৪১ বেশি।

আবাসনের ক্ষেত্রেও গাদ্দাফি নিলেন অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। তিনি ঘোষণা করলেন, লিবিয়ার সব মানুষের ঘর না হওয়া পর্যন্ত তাঁর নিজের বাবা-মা পাকা ঘর পাবেন না। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গাদ্দাফি এবং তাঁর পরিবার বসবাস করতেন তাঁবুতে—এমনকি বিদেশ সফরেও তিনি তাঁবু নিয়ে যেতেন এবং সেখানেই থাকতেন। রোম, পারি, দোহা—সর্বত্র তাঁর তাঁবু হয়ে উঠলো তাঁর পরিচয়চিহ্ন।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনাও ছিল অনন্য। সব ব্যাংক ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এবং আইনগতভাবে ঋণে কোনো সুদ ছিল না। যদি কোনো লিবিয়ান গাড়ি কিনতো, সরকার ৫০% ভর্তুকি দিতো। পেট্রোলের দাম ছিল মাত্র প্রতি লিটার ০.১৪ মার্কিন ডলার। বিদ্যুৎ ছিল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সব নাগরিকের জন্য।
চাকরির ক্ষেত্রেও ছিল সরকারি নিশ্চয়তা। যদি কোনো স্নাতক চাকরি না পায়, তাহলে রাষ্ট্র তাকে তার পেশার গড় বেতন দিতো যতদিন না সে চাকরি পায়। কৃষিকাজে আগ্রহীদের দেওয়া হতো বিনামূল্যে জমি, কৃষি সরঞ্জাম, বীজ এবং গবাদিপশু।

নারী অধিকারের ক্ষেত্রেও গাদ্দাফি ছিলেন অগ্রগামী। লিসা অ্যান্ডারসন, কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট এবং লিবিয়া বিশেষজ্ঞ, বলেছিলেন গাদ্দাফির অধীনে বেশি সংখ্যক নারী বিশ্ববিদ্যালয় ও পেশাগত ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিল, যা আরব বিশ্বে বিরল ছিল। নারীদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল—গাদ্দাফির বিখ্যাত নারী দেহরক্ষী দল “আমাজোনিয়ান গার্ড” এর কথা সবাই জানেন।

১৯৮৩ সালে গাদ্দাফি শুরু করলেন তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প-গ্রেট ম্যান-মেড রিভার। এটি ছিল ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল সেচ প্রকল্প, যা লিবিয়ার দক্ষিণের মরুভূমির নিচে থাকা প্রাচীন ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে পানি উত্তোলন করে উপকূলীয় শহরগুলোতে সরবরাহ করতো। ১৯৯১ সালে প্রথম পর্যায় সম্পন্ন হলো। ইউনেস্কো এটিকে বর্ণনা করে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প” হিসেবে। গাদ্দাফি একে বলতেন “অষ্টম আশ্চর্য”।

এসব কারণে আফ্রিকা তো বটেই, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো অভিবাসী শ্রমিক লিবিয়ায় এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। বাংলাদেশ থেকেও হাজারো মানুষ সেখানে গিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। লিবিয়া হয়ে উঠেছিল একটি সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র।

অন্ধকার দিক-সন্ত্রাস, দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন

কিন্তু এই চকচকে ছবির পেছনে ছিল এক ভয়ানক অন্ধকার। গাদ্দাফির শাসন ছিল নিষ্ঠুর এবং স্বেচ্ছাচারী। যারা তাঁর বিরোধিতা করতেন, তাদের জন্য অপেক্ষা করতো ভয়ংকর পরিণতি।

১৯৭৩ সালেই গাদ্দাফি তাঁর প্রকৃত চেহারা দেখান। তিনি জনসমক্ষে ঘোষণা করেন যে লিবিয়ার বিপ্লবের শত্রুদের “শারীরিকভাবে নির্মূল” করতে হবে। সেই বছরের এপ্রিলে ত্রিপোলি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্দয় আক্রমণ চালানো হয়। দশম বার্ষিকীতে ২০০৯ সালে এই ঘটনার স্মরণে আল-জাজিরা এক প্রতিবেদনে জানায়, ছাত্রদের একজনের মন্তব্য: “আমি দেখেছি আমার সহপাঠীদের জীবিত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে।”

১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কুখ্যাত “বিপ্লবী কমিটি”। এই কমিটিগুলো ছিল গাদ্দাফির গোপন পুলিশ বাহিনী। তারা নজরদারি করতো সাধারণ নাগরিকদের, খুঁজে বের করতো বিরোধীদের। যে কেউ গাদ্দাফির সমালোচনা করলে, তাকে আটক করা হতো, নির্যাতন করা হতো, অনেক ক্ষেত্রে চিরতরে নিখোঁজ করে দেওয়া হতো।

ত্রিপোলির আবু সালিম কারাগার হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের এক প্রতীক। ১৯৯৬ সালের ২৮-২৯ জুন এখানে ঘটে এক ভয়াবহ গণহত্যা। বন্দীরা কারাগারের মানবেতর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে, নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় ১,২৭০ জন বন্দীকে গুলি করে হত্যা করে মাত্র কয়েক ঘন্টায়। দশকের পর দশক ধরে গাদ্দাফি সরকার এই গণহত্যা অস্বীকার করেছে। শুধুমাত্র ২০০৪ সালে এসে তারা ঘটনা স্বীকার করে, তবে বলে মৃতের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ।

১৯৮০-র দশকে গাদ্দাফি তাঁর বিরোধীদের হত্যা করার জন্য আন্তর্জাতিক গুপ্তহত্যা অভিযান চালান। তিনি ঘোষণা করেন, বিদেশে বসবাসরত যেসব লিবিয়ান তাঁর সরকারের বিরোধিতা করছে, তাদের “শারীরিকভাবে নির্মূল” করতে হবে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে অন্তত ২৫ জন নির্বাসিত লিবিয়ান বিরোধীকে বিভিন্ন দেশে হত্যা করা হয়-লন্ডন, মিউনিখ, এথেন্স, রোম।

আরও ভয়ংকর অভিযোগ উঠেছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। ২০১১ সালে গাদ্দাফির পতনের পর, তাঁর ত্রিপোলি ও সিয়ার্তের প্রাসাদে পাওয়া যায় গোপন কক্ষ, যেখানে তিনি শত শত নারী ও কিশোরীকে বন্দী করে রাখতেন এবং যৌন নির্যাতন চালাতেন। তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের একজন, সোরায়া, পরে বলেছিলেন কীভাবে তিনি এবং অন্যান্য নারীদের ধর্ষণ করা হতো পদ্ধতিগতভাবে। কাতার-ভিত্তিক আল-জাজিরা এক তথ্যচিত্রে এইসব নারীদের সাক্ষাৎকার প্রচার করে, যাতে উঠে আসে গাদ্দাফির বর্বরতার বীভৎস চিত্র।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস এবং পশ্চিমাদের চক্ষুশূল

গাদ্দাফির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ ছিল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার। তিনি সব সময়ই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন এবং বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠনকে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য করতেন। কিন্তু তাঁর সমর্থন শুধু ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ ছিল না। ওজঅ (আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি), ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি, এবং আরও নানা বিপ্লবী সংগঠন পেয়েছিল লিবিয়ার সাহায্য।

১৯৮৬ সালের ৫ এপ্রিল পশ্চিম বার্লিনের একটি নাইটক্লাবে বোমা বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত এবং ২২৯ জন আহত হয়। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে এর পেছনে ছিল লিবিয়া। এর প্রতিশোধে ১৫ এপ্রিল মার্কিন বিমান বাহিনী গাদ্দাফির ত্রিপোলি এবং বেনগাজির বাসস্থান ও সামরিক ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে। এই আক্রমণে গাদ্দাফির দত্তক নেওয়া দেড় বছরের কন্যা হানা নিহত হয়। গাদ্দাফি নিজে অল্পের জন্য বেঁচে যান।

কিন্তু সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে ১৯৮৮ সালের ২১ ডিসেম্বর। স্কটল্যান্ডের লকারবির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় প্যান আম ফ্লাইট ১০৩-তে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং মারা যায় সব ২৫৯ জন যাত্রী ও ক্রু, এবং মাটিতে আরও ১১ জন—মোট ২৭০ জন। এটি ছিল মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলাগুলোর একটি।

তদন্তে উঠে আসে লিবিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তা আবদেলবাসেত আল-মেগ্রাহির নাম। ২০০১ সালে স্কটল্যান্ডের একটি বিশেষ আদালতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন গাদ্দাফি এই ঘটনায় লিবিয়ার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। অবশেষে ২০০৩ সালে আসে একটি নাটকীয় মোড়। গাদ্দাফি প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানে রাজি হয়। প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবার পায় প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার।

এই দায় স্বীকারের পেছনে ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা। ১৯৯২ সাল থেকে জাতিসংঘ লিবিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অর্থনৈতিক চাপ গাদ্দাফিকে বাধ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। ২০০৩ সালে তিনি গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করার ঘোষণা দেন। ২০০৪ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ লিবিয়ার ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

এরপর শুরু হয় গাদ্দাফির “পুনর্বাসনের” যুগ। তিনি হয়ে ওঠেন পশ্চিমের একজন মূল্যবান মিত্র-বিশেষত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। ২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তিনবার গাদ্দাফির সাথে দেখা করেন। পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলো ফিরে আসে লিবিয়ায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন লিবিয়ার সাথে গোপন চুক্তিতে জড়িত হয় সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য, যেখানে তাদের নির্যাতন করা হতো—এক ধরনের “রেন্ডিশন” কর্মসূচি।

আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং নতুন দ্বন্দ্ব

২০০৯ সাল গাদ্দাফির জন্য ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি নির্বাচিত হন আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে—এক বছরের মেয়াদের জন্য। গাদ্দাফি দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকান ঐক্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তাঁর উদ্যোগেই আফ্রিকান ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রস্তাব করেন “ইউনাইটেড স্টেটস অব আফ্রিকা” গঠনের-একটি একক আফ্রিকান সরকার, একক মুদ্রা, এবং একক সেনাবাহিনী। তিনি বলেন, “আমি একটি এক আফ্রিকা, একক দেশ চাই… আফ্রিকান সামরিক বাহিনী, এক মুদ্রা, এক পাসপোর্ট।” তাঁর এই মহাপরিকল্পনা বেশিরভাগ আফ্রিকান নেতাদের কাছে অবাস্তব মনে হয়েছিল এবং প্রত্যাখ্যাত হয়।

সেই বছরের সেপ্টেম্বরে গাদ্দাফি প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এটি ছিল এক স্মরণীয় ঘটনা-সব ভুল কারণে। তাঁর বক্তব্য ছিল ১৫ মিনিটের জন্য নির্ধারিত, কিন্তু তিনি বললেন ৯৬ মিনিট ধরে। তিনি জাতিসংঘ সনদের একটি অনুলিপি ছিঁড়ে ফেললেন, বললেন এটি “কেবল কালি এবং কাগজ”। তিনি দাবি করলেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ হওয়া উচিত “সন্ত্রাস পরিষদ”। তিনি অভিযোগ করলেন জন এফ কেনেডি এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের হত্যার সাথে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা ছিল-যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এই বক্তব্য পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। গাদ্দাফিকে দেখানো হলো একজন উন্মাদ স্বৈরশাসক হিসেবে। পশ্চিমের সাথে তাঁর সম্পর্কের যে ক্ষণিক উষ্ণতা এসেছিল, তা আবার শীতল হতে শুরু করলো।

আরব বসন্ত এবং পতনের সূচনা

২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ায় শুরু হয় এক নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থান। মহম্মদ বুয়াজিজি নামের এক ফল বিক্রেতা পুলিশের হয়রানির প্রতিবাদে আত্মহত্যা করলে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের আগুন। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ২৩ বছর ক্ষমতায় থাকার পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জাইন আল-আবিদিন বেন আলি। এরপর বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ে মিসরে। ফেব্রুয়ারিতে ৩০ বছরের শাসক হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সেই ঢেউ আসে লিবিয়ায়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনগাজিতে শুরু হয় বিক্ষোভ। প্রাথমিকভাবে বিক্ষোভের কারণ ছিল ১৯৯৬ সালের আবু সালিম কারাগারের গণহত্যার তদন্তের দাবি। কিন্তু দ্রুতই এটি পরিণত হয় গাদ্দাফি-বিরোধী এক ব্যাপক আন্দোলনে। ১৭ ফেব্রুয়ারি হয় “ক্রোধের দিবস”—সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

গাদ্দাফির প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম। তিনি টিভিতে এসে বিক্ষোভকারীদের “ইঁদুর” এবং “তেলাপোকা” বলে অভিহিত করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে এই তেলাপোকাদের খুঁজে বের করব।” তিনি বলেন, “আমি লিবিয়ার জমিনে শহীদ হব।” তিনি তাঁর সমর্থকদের আহ্বান জানান “বিশ্বাসঘাতকদের” হত্যা করতে।

নিরাপত্তা বাহিনী এবং ভাড়াটে সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায় বিক্ষোভকারীদের ওপর। ভারী অস্ত্র, এমনকি বিমান হামলাও চালানো হয় আবাসিক এলাকায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো রিপোর্ট করে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা।

কিন্তু এবার বিক্ষোভকারীরা পিছু হটেননি। সেনাবাহিনীর অনেক ইউনিট বিদ্রোহ করে এবং বিক্ষোভকারীদের পক্ষে চলে যায়। পূর্ব লিবিয়া দ্রুত বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বেনগাজিতে গঠিত হয় “ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল”, যা নিজেদের ঘোষণা করে লিবিয়ার বৈধ সরকার হিসেবে।

ন্যাটোর হস্তক্ষেপ এবং গৃহযুদ্ধ

লিবিয়ার পরিস্থিতি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। মার্চের প্রথম দিকে গাদ্দাফির বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বেনগাজির পতন আসন্ন মনে হয়। গাদ্দাফি ঘোষণা করেন, তিনি বেনগাজিতে “দরজায় দরজায়” গিয়ে বিদ্রোহীদের খুঁজে বের করবেন এবং “কোনো করুণা” দেখানো হবে না।

এই হুমকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নাড়া দেয়। ১৭ মার্চ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলিউশন ১৯৭৩ পাস করে, যা লিবিয়ায় “নো-ফ্লাই জোন” এবং “সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ” নিতে অনুমোদন দেয় বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায়। রাশিয়া এবং চীন ভোটদানে বিরত থাকে।

১৯ মার্চ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে “অপারেশন ওডিসি ডন”। ক্রুজ মিসাইল এবং বিমান হামলায় ধ্বংস করা হয় গাদ্দাফির বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ৩১ মার্চ ন্যাটো সম্পূর্ণ সামরিক অভিযানের দায়িত্ব নেয়।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ মাসব্যাপী এক যুদ্ধ। ন্যাটোর বিমান হামলা এবং মাটিতে বিদ্রোহী বাহিনীর আক্রমণে ধীরে ধীরে পিছু হটতে থাকে গাদ্দাফির বাহিনী। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩০টিরও বেশি দেশ এনটিসি-কে লিবিয়ার বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

আগস্টের শেষ দিকে বিদ্রোহীরা ত্রিপোলিতে ঢুকে পড়ে। ২০ আগস্ট শুরু হয় “ব্যাটল অব ত্রিপোলি”। ছয় দিনের তীব্র যুদ্ধের পর ২৬ আগস্ট ত্রিপোলি সম্পূর্ণ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ২৩ আগস্ট দখল করা হয় গাদ্দাফির সদর দপ্তর বাব আল-আজিজিয়া। কিন্তু গাদ্দাফি পালিয়ে যান।
এরপর শুরু হয় গাদ্দাফির খোঁজ। তাঁর জন্মস্থান সিয়ার্ত হয়ে ওঠে তাঁর শেষ ঘাঁটি। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর জুড়ে চলে তীব্র যুদ্ধ। অবশেষে ২০ অক্টোবর এসে পৌঁছায় পরিণতির দিন।

শেষ দিন-পাইপ থেকে মৃত্যু

২০১১ সালের ২০ অক্টোবর, ভোরবেলা। সিয়ার্ত শহর প্রায় পুরোটাই বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। গাদ্দাফি এবং তাঁর অনুগত কয়েকশ সৈন্য শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। প্রায় ৫০-৭৫টি গাড়ির একটি কনভয় বেরিয়ে পড়ে সিয়ার্ত থেকে।

কিন্তু ন্যাটোর নজরদারি ড্রোন এই কনভয় শনাক্ত করে। ফ্রান্সের একটি মিরাজ যুদ্ধবিমান এবং একটি মার্কিন প্রিডেটর ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কনভয়ের অন্তত ১৫টি গাড়ি ধ্বংস হয়। গাদ্দাফি এবং তাঁর সহযোগীরা পালিয়ে যান কাছের একটি আবাসিক এলাকায়, যা “ডিস্ট্রিক্ট টু” নামে পরিচিত।

গাদ্দাফি, তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবু-বকর ইউনিস জাবের, তাঁর প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা মানসুর ধাও এবং আরও কয়েকজন আশ্রয় নেন একটি বড় কংক্রিটের পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের ভেতরে। মিসরাতার বিদ্রোহী বাহিনী তাদের খুঁজে বের করে।

বিদ্রোহীরা পাইপের দিকে গ্রেনেড এবং কামানের গোলা ছোঁড়ে। বের হতে বাধ্য হন গাদ্দাফি। আল-জাজিরার এক রিপোর্ট অনুযায়ী, একজন বিদ্রোহী যোদ্ধা পরে বলেছিলেন: “আমি তাকে চিৎকার করতে শুনেছিলাম, গুলি করো না! গুলি করো না!”

সেই মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও পরে ভাইরাল হয়। একটিতে দেখা যায় রক্তাক্ত, ধুলোমলিন গাদ্দাফিকে বিদ্রোহীরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর সোনালি পিস্তল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তাঁকে একটি পিকআপ ট্রাকের বনেটের ওপর তুলে ভিড়ের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চারপাশ থেকে মানুষ তাঁকে লাথি মারছে, ঘুষি মারছে, চুল টানছে।

একটি ভিডিওতে দেখা যায় একজন বিদ্রোহী গাদ্দাফির পশ্চাৎদেশে একটি লাঠি বা ছুরি দিয়ে আঘাত করছে। গাদ্দাফি চিৎকার করে উঠছেন: “আল্লাহ! এটা কি? এটা কি?” এবং বলছেন: “তোমরা কি জানো সঠিক আর ভুল কী?”

ঠিক কীভাবে এবং কখন গাদ্দাফি মারা যান, তা এখনও পরিষ্কার নয়। এনটিসি-র তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল দাবি করেছিলেন গাদ্দাফি মারা গেছেন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে, “ক্রসফায়ারে” গুলিবিদ্ধ হয়ে। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং ভিডিও প্রমাণ ভিন্ন কথা বলে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি তদন্ত পরে প্রকাশ করে যে গাদ্দাফিকে সম্ভবত বন্দী করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে-যা একটি যুদ্ধাপরাধ। তাঁর শরীরে মাথায় একটি গুলির ক্ষত ছিল, যা সম্ভবত মৃত্যুর কারণ।

মরদেহের অপমান এবং বিতর্ক

গাদ্দাফির মৃত্যুর পর তাঁর এবং তাঁর ছেলে মুতাসসিম গাদ্দাফি (যিনি একই দিনে নিহত হন) ও মানসুর ধাওয়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিসরাতায়। সেখানে তাদের রাখা হয় একটি শপিং সেন্টারের কোল্ড স্টোরেজ রুমে।

চার দিন ধরে হাজার হাজার লিবিয়ান-পুরুষ, নারী, শিশু-লাইন দিয়ে গাদ্দাফির মরদেহ দেখতে আসেন। মোবাইল ফোনে সেলফি তোলেন। কেউ কেউ উল্লাস করেন, কেউ শোক প্রকাশ করেন। মরদেহ পচতে শুরু করে এবং দুর্গন্ধ ছড়ায়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মরদেহের এই প্রদর্শনীর তীব্র সমালোচনা করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার নাভি পিলে বলেন এটি “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন”। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেন তিনি ‘শকড’ এবং মরদেহের সাথে ‘মর্যাদাপূর্ণ আচরণ’ করার আহ্বান জানান।

২৫ অক্টোবর, একটি গোপন স্থানে ইসলামী রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয় গাদ্দাফিকে। শুধুমাত্র কয়েকজন আত্মীয় এবং এনটিসি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দাফনের স্থান গোপন রাখা হয় এই আশঙ্কায় যে এটি গাদ্দাফি সমর্থকদের তীর্থস্থানে পরিণত হতে পারে।

গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে তখন থেকে এখনও বিতর্ক চলছে। অনেকে মনে করেন তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত ছিল, যাতে তাঁর অপরাধের পুরো সত্য বেরিয়ে আসতো এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতেন। অন্যরা যুক্তি দেন যে ন্যায়বিচার হয়েছে-গাদ্দাফি যে নির্মমতা দেখিয়েছিলেন, তিনি তার প্রতিফল পেয়েছেন।

গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া-হারানো স্বর্গ

গাদ্দাফির মৃত্যুর পর পশ্চিমা নেতারা উল্লাস করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন: “এক পাতা উল্টে গেছে… লিবিয়ার ভবিষ্যৎ এখন তার জনগণের হাতে।” ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সার্কোজি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন এটি “লিবিয়ার জন্য এক নতুন শুরু”।

কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া পরিণত হয়েছে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে। ১৪ বছর পর আজও দেশটি সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা এবং বিভাজনে জর্জরিত।

গাদ্দাফির পতনের পরপরই শত শত সশস্ত্র মিলিশিয়া গ্রুপ গজিয়ে ওঠে। এরা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা এবং সম্পদ নিয়ে লড়াই শুরু করে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কার্যকর কর্তৃত্ব থাকে না। ২০১৪ সাল থেকে লিবিয়া কার্যত দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারে বিভক্ত-পূর্বে টোব্রুক-ভিত্তিক “হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস” এবং পশ্চিমে ত্রিপোলি-ভিত্তিক “জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেস”।

শক্তিশালী মিলিশিয়া নেতারা হয়ে ওঠেন ডি ফ্যাক্টো শাসক। পূর্ব লিবিয়ায় জেনারেল খলিফা হাফতার এবং তাঁর “লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি” নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। পশ্চিমে ত্রিপোলিতে বিভিন্ন মিলিশিয়া গ্রুপ ক্ষমতার জন্য লড়াই করে।

২০১৪-২০২০ পর্যন্ত দেশটি আবার একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত হয়। হাফতারের বাহিনী ২০১৯ সালে ত্রিপোলি দখলের চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। তুরস্ক সামরিক সাহায্য পাঠায় ত্রিপোলি সরকারকে। রাশিয়া, মিসর এবং টঅঊ সমর্থন করে হাফতারকে।

২০২০ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২১ সালের মার্চে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দিবেবা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইউনুস আল-মেনফি।

কিন্তু এই সরকারের কর্তৃত্বও সীমিত। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল, তা আজও হয়নি। ২০২৪ সালে লিবিয়া এখনও কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত-আল-মেনফি এবং দিবেবার ত্রিপোলি-ভিত্তিক সরকার পশ্চিমে, এবং হাফতারের সমর্থিত প্রশাসন পূর্বে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। গাদ্দাফির আমলে লিবিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১২,০০০ টাকার বেশি। আজ তা নেমে এসেছে প্রায় ৬,০০০ টাকায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত। পানির সংকট। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা বিধ্বস্ত। মুদ্রাস্ফীতি আকাশছোঁয়া।

আরও ভয়াবহ, লিবিয়া হয়ে উঠেছে মানব পাচারের একটি প্রধান কেন্দ্র। হাজার হাজার আফ্রিকান অভিবাসী, যারা ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, আটকা পড়ছেন লিবিয়ায়। সেখানে তাদের বিক্রি করা হচ্ছে দাস হিসেবে, নির্যাতন করা হচ্ছে, এবং বন্দী রাখা হচ্ছে মুক্তিপণের জন্য। সিএনএন ২০১৭ সালে একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দেখায় কীভাবে লিবিয়ায় খোলা বাজারে মানুষ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকায়।

ইসলামিক স্টেট এবং অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীও ফায়দা তুলেছে এই বিশৃঙ্খলার। ২০১৪-২০১৬ সাল পর্যন্ত আইএসআইএস লিবিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। যদিও তাদের পরে বিতাড়িত করা হয়, তবু বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী এখনও সক্রিয়।

গাদ্দাফির মৃত্যুর ১৪ বছর পর, লিবিয়ানরা তাঁর সম্পর্কে কী ভাবেন?

উত্তর জটিল এবং বিভক্ত। কিছু লিবিয়ানের কাছে তিনি ছিলেন এবং আছেন একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক, যিনি ৪২ বছর ধরে তাঁর জনগণকে নির্যাতন করেছেন, তাদের মৌলিক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছেন। বেনগাজি এবং মিসরাতার অনেক মানুষের কাছে, যারা তাঁর দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন, গাদ্দাফি একটি অভিশাপের নাম।

কিন্তু ক্রমবর্ধমান সংখ্যক লিবিয়ান, বিশেষত যুবকরা যারা গাদ্দাফির শাসনামলে বড় হয়েছেন, এখন তাঁকে নস্টালজিয়ার সাথে স্মরণ করেন। তাঁরা মনে করেন গাদ্দাফির আমলে জীবন অনেক ভালো ছিল-নিরাপত্তা ছিল, কাজ ছিল, বিদ্যুৎ ছিল, পানি ছিল।

বনি ওয়ালিদ শহর, যা ছিল গাদ্দাফির গোত্র কাদাধফার ঘাঁটি, এখনও তাঁর প্রতি অনুগত। শহরের প্রবেশপথে এখনও দাঁড়িয়ে আছে গাদ্দাফির বিশাল প্রতিকৃতি-সবুজ পোশাকে, গর্বিতভাবে। ২০২১ সালে এএফপি-র এক প্রতিবেদনে সেখানকার এক বাসিন্দা মোহাম্মদ দাইরি বলেছিলেন: “গাদ্দাফি আমাদের হৃদয়ে রয়েছেন। আমরা সব সময় তাঁর দেখানো পথেই চলব।”

সিয়ার্তেও, যেখানে গাদ্দাফি জন্মেছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন, তাঁকে অনেকে নায়ক হিসেবে দেখেন। সেখানকার অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন পশ্চিমা ষড়যন্ত্রে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে লিবিয়ার তেল লুট করার জন্য।

কিছু লিবিয়ান বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদ আরও সুষম দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন। তাঁরা স্বীকার করেন গাদ্দাফি একজন স্বৈরশাসক ছিলেন, কিন্তু একই সাথে তিনি কিছু ইতিবাচক কাজও করেছিলেন-শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়নে। তাঁরা মনে করেন সমস্যা ছিল গাদ্দাফির একচেটিয়া ক্ষমতা এবং তাঁর পরিবার ও গোত্রের দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মমতা। যদি লিবিয়া একটি ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ নিতে পারতো, তাহলে হয়তো আজকের বিপর্যয় এড়ানো যেতো।

আন্তর্জাতিকভাবেও গাদ্দাফির উত্তরাধিকার বিতর্কিত। কেউ কেউ তাঁকে দেখেন একজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লবী হিসেবে, যিনি সাহসের সাথে পশ্চিমা শক্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন। আফ্রিকার অনেক নেতা তাঁকে স্মরণ করেন আফ্রিকান ঐক্যের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে।

অন্যরা যুক্তি দেন তিনি ছিলেন একজন মেগালোম্যানিয়াক, যিনি নিজের ক্ষমতা এবং গৌরব ছাড়া কিছু চিন্তা করেননি। তাঁর “বিপ্লব” ছিল আসলে একটি নতুন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা-গাদ্দাফি পরিবারের রাজতন্ত্র।

একটি সতর্কবাণী

মুয়াম্মার গাদ্দাফির জীবন এবং মৃত্যু আমাদের অনেক শিক্ষা দেয়। এক দরিদ্র বেদুইন ছেলে কীভাবে হয়ে উঠতে পারেন একটি দেশের নিরঙ্কুশ শাসক-এবং কীভাবে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ডেকে আনে।

গাদ্দাফি প্রমাণ করেন যে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের বিকল্প নয়। লিবিয়ান জনগণের কাছে বিনামূল্যে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের ছিল না কথা বলার স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, বা তাদের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকার। একটি সোনার খাঁচা শেষ পর্যন্ত একটি খাঁচাই থেকে যায়।

তাঁর পতন এবং লিবিয়ার পরবর্তী বিপর্যয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি স্বৈরশাসক অপসারণ করা সহজ, কিন্তু তার পরে একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়া অত্যন্ত কঠিন। ন্যাটো গাদ্দাফিকে উৎখাত করেছে, কিন্তু লিবিয়ার পুনর্গঠনে তেমন কোনো ভূমিকা রাখেনি। ফলাফল: আজকের বিশৃঙ্খল, বিভক্ত লিবিয়া, যা তার জনগণের জন্য গাদ্দাফির চেয়েও খারাপ হতে পারে।

আজ, ২০২৫ সালে, মুয়াম্মার গাদ্দাফি মৃত ১৪ বছর। কিন্তু তাঁর ভূত এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে লিবিয়াকে। দেশটি এখনও খুঁজে পায়নি শান্তি, স্থিতিশীলতা বা সমৃদ্ধি। কিছু লিবিয়ান আজ ভাবেন, গাদ্দাফির অধীনে জীবন হয়তো খারাপ ছিল, কিন্তু অন্তত তারা জানতো আগামীকাল কী হবে। আজ তারা জানেন না পরের সপ্তাহে তাদের শহরে গোলাগুলি হবে কিনা, বিদ্যুৎ আসবে কিনা, বা তাদের সন্তানরা স্কুলে যেতে পারবে কিনা।

গাদ্দাফির গল্প একটি সতর্কবাণী-ক্ষমতার অপব্যবহার, অহংকার, এবং নিষ্ঠুরতার পরিণতি সম্পর্কে। তিনি ছিলেন একজন জটিল ব্যক্তিত্ব-একই সাথে দূরদর্শী এবং ভ্রান্ত, সাহসী এবং নিষ্ঠুর, তার জনগণের কল্যাণকামী এবং তাদের নিপীড়ক। তাঁর উত্তরাধিকার ইতিহাস বিচার করবে, এবং সেই বিচার সহজ বা একমাত্রিক হবে না।

লিবিয়ার জন্য, প্রশ্ন এখন আর গাদ্দাফি সম্পর্কে নয়। প্রশ্ন হলো: গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া কি কখনো শান্তি এবং সমৃদ্ধি ফিরে পাবে? দেশটি কি তার দুই ভাগ পুনর্মিলিত করতে পারবে? মিলিশিয়াদের নিরস্ত্র করতে পারবে? একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি জিনিস নিশ্চিত: মুয়াম্মার গাদ্দাফির গল্প-তাঁর উত্থান, তাঁর শাসন, এবং তাঁর পতন-থাকবে একবিংশ শতাব্দীর মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে। এটি একটি গল্প ক্ষমতা এবং পতনের, স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্নের, আশা এবং বিপর্যয়ের।

এবং সেই ২০১১ সালের ২০ অক্টোবরের ছবি-একটি পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মানুষ, যিনি একসময় ছিলেন লিবিয়ার লৌহমানব-সেই ছবি থাকবে একটি শক্তিশালী অনুস্মারক হিসেবে: কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়, এবং ইতিহাসের চাকা ঘুরে যায় অপ্রত্যাশিতভাবে।

পাঠকপ্রিয়