সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

রায়হানের সেই হুঁশিয়ারি: “তোর সময় শেষ,” তিন দিন পরই সরোয়ারের রক্তে ভিজল চালিতাতলী

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

আবদুল কাদেরের পরনের পাঞ্জাবি আর লুঙ্গিতে তখনও লেগে আছে ছোপ ছোপ শুকিয়ে আসা রক্তের দাগ। ছেলের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরও তিনি সেই রক্তমাখা পোশাকেই বসে ছিলেন। ঠিক যখন গুলির শব্দে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছিল, তিনিও ছিলেন অদূরেই। কিন্তু নির্বাচনী গণসংযোগের ভিড় আর স্লোগানের গর্জনে তিনি বুঝতে পারেননি, মুহূর্তের মধ্যে তার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেছে। সন্ত্রাসীর পিস্তলটি চেপে ধরা হয়েছিল তারই ছেলে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলার ঘাড়ে।

“রিকশাতেই আমার ছেলে আমার কোলে মারা যায়,” ভারী গলায় স্মৃতিচারণ করেন আবদুল কাদের। “তবু মনকে বোঝাতে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

এই হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যু। সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের জানান, ঘটনার ঠিক তিন দিন আগে, গত রোববার, তার ছেলেকে মুঠোফোনে শেষ হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আরেক ‘সন্ত্রাসী’ মো. রায়হান। বার্তাটি ছিল হিমশীতল এবং স্পষ্ট: “তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে।”

এই হুমকিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ ছিল না। এটি ছিল এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলা এক রক্তাক্ত সংঘাতের সর্বশেষ অধ্যায়। সরোয়ারের মূল শত্রু ছিল বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী এবং তার স্থানীয় সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও মো. রায়হান। একসময় সরোয়ার হোসেনও সাজ্জাদ আলীর অনুসারী ছিলেন, কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে তিনি আলাদা হয়ে যাওয়ায় এই দ্বন্দ্বের শুরু।

এই শত্রুতা কতটা গভীর ছিল তার প্রমাণ মেলে মাত্র কয়েক মাস আগেই। গত ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে সরোয়ারকে বহনকারী একটি প্রাইভেট কারে ব্রাশফায়ার করা হয়। সেই হামলায় গাড়িতে থাকা দুজন নিহত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান সরোয়ার। পরে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জানায়, ওই হামলাও হয়েছিল সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নির্দেশে।

এমনকি গত ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে খুন হন আরেক ‘সন্ত্রাসী’ আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর। আকবরের স্ত্রী রূপালী বেগম এ ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেই খুনের পরও মো. রায়হান সরোয়ারকে ফোন করে একই ধরনের হুমকি দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই অডিওতে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, “ঢাকাইয়া আকবরের কী পরিণতি হয়েছে, দেখ সরোয়ার। যা খাওয়ার খেয়ে নিস। তোর সময় বেশি নেই।”

বারবার হুমকি পেয়ে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা সতর্ক হয়েই চলতেন, সঙ্গে থাকতো লোকজন। কিন্তু বুধবারের ঘটনাটি ঘটে তার বাড়ির মাত্র দুই-তিনশ গজ দূরে। চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগ চলছিল। আবদুল কাদের বলেন, “যেহেতু নিজের এলাকা, কেউ কিছু করবে না, সে জন্য ছেলের আত্মবিশ্বাস ছিল।” সরোয়ার নিজেও এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে গণসংযোগে যোগ দেন।

সেই আত্মবিশ্বাসই কাল হলো। ভিড়ের মধ্যেই ঘাতক তার কাজ সেরে ফেলে। গুলিতে সরোয়ার ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং এরশাদ উল্লাহসহ আরও চারজন গুলিবিদ্ধ হন। সরোয়ারের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ ১৫টি মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এই হত্যাকাণ্ড চালিতাতলী খন্দকারপাড়া এলাকায় এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে। এলাকার বাসিন্দা নুর আহমদ বলেন, “এভাবে বাড়ির ভেতর এসে গুলি করে মানুষ মেরে চলে যাবে। তা ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।” আবদুল কাদের এমনকি এও উল্লেখ করেন যে, সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ এর আগে বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাবেক ওসি আরিফুর রহমানকেও রাস্তায় পেটানোর হুমকি দিয়েছিল।

সাজ্জাদ আলীর নামটি চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন নয়। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে আটজন নিহতের ঘটনায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হলেও পরে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পেয়ে বিদেশে পালিয়ে যান। কিন্তু বিদেশ থেকেও তিনি বায়েজিদ, পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁও এলাকায় তার অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছেন, যা দেখভাল করতেন সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।

মাত্র এক মাস আগেই বিয়ে করেছিলেন সরোয়ার হোসেন। সেই বিয়েতে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে সরোয়ারকে বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশেও দেখা যেত। তার বাবা আবদুল কাদের ছেলের যুবদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বললেও, বিএনপি নেতারা সরোয়ারকে তাদের কর্মী হিসেবে অস্বীকার করেছেন।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, সরোয়ারের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে এবং এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতা আবদুল কাদেরের শোককে স্পর্শ করে না। তার কাছে এই সবকিছুর চেয়ে ভারী হয়ে আছে রিকশার সিটে শুকিয়ে যাওয়া সেই রক্তের দাগ আর ঘাতক মো. রায়হানের সেই শেষ হুঁশিয়ারি— “তোর সময় শেষ।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

রায়হানের সেই হুঁশিয়ারি: “তোর সময় শেষ,” তিন দিন পরই সরোয়ারের রক্তে ভিজল চালিতাতলী

নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:৩১

আবদুল কাদেরের পরনের পাঞ্জাবি আর লুঙ্গিতে তখনও লেগে আছে ছোপ ছোপ শুকিয়ে আসা রক্তের দাগ। ছেলের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরও তিনি সেই রক্তমাখা পোশাকেই বসে ছিলেন। ঠিক যখন গুলির শব্দে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর চালিতাতলী এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছিল, তিনিও ছিলেন অদূরেই। কিন্তু নির্বাচনী গণসংযোগের ভিড় আর স্লোগানের গর্জনে তিনি বুঝতে পারেননি, মুহূর্তের মধ্যে তার পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গেছে। সন্ত্রাসীর পিস্তলটি চেপে ধরা হয়েছিল তারই ছেলে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলার ঘাড়ে।

“রিকশাতেই আমার ছেলে আমার কোলে মারা যায়,” ভারী গলায় স্মৃতিচারণ করেন আবদুল কাদের। “তবু মনকে বোঝাতে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

এই হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্বঘোষিত মৃত্যু। সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের জানান, ঘটনার ঠিক তিন দিন আগে, গত রোববার, তার ছেলেকে মুঠোফোনে শেষ হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আরেক ‘সন্ত্রাসী’ মো. রায়হান। বার্তাটি ছিল হিমশীতল এবং স্পষ্ট: “তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে।”

এই হুমকিকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ ছিল না। এটি ছিল এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলা এক রক্তাক্ত সংঘাতের সর্বশেষ অধ্যায়। সরোয়ারের মূল শত্রু ছিল বিদেশে পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী এবং তার স্থানীয় সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও মো. রায়হান। একসময় সরোয়ার হোসেনও সাজ্জাদ আলীর অনুসারী ছিলেন, কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে তিনি আলাদা হয়ে যাওয়ায় এই দ্বন্দ্বের শুরু।

এই শত্রুতা কতটা গভীর ছিল তার প্রমাণ মেলে মাত্র কয়েক মাস আগেই। গত ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে সরোয়ারকে বহনকারী একটি প্রাইভেট কারে ব্রাশফায়ার করা হয়। সেই হামলায় গাড়িতে থাকা দুজন নিহত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান সরোয়ার। পরে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জানায়, ওই হামলাও হয়েছিল সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নির্দেশে।

এমনকি গত ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে খুন হন আরেক ‘সন্ত্রাসী’ আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর। আকবরের স্ত্রী রূপালী বেগম এ ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেই খুনের পরও মো. রায়হান সরোয়ারকে ফোন করে একই ধরনের হুমকি দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই অডিওতে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, “ঢাকাইয়া আকবরের কী পরিণতি হয়েছে, দেখ সরোয়ার। যা খাওয়ার খেয়ে নিস। তোর সময় বেশি নেই।”

বারবার হুমকি পেয়ে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা সতর্ক হয়েই চলতেন, সঙ্গে থাকতো লোকজন। কিন্তু বুধবারের ঘটনাটি ঘটে তার বাড়ির মাত্র দুই-তিনশ গজ দূরে। চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগ চলছিল। আবদুল কাদের বলেন, “যেহেতু নিজের এলাকা, কেউ কিছু করবে না, সে জন্য ছেলের আত্মবিশ্বাস ছিল।” সরোয়ার নিজেও এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে গণসংযোগে যোগ দেন।

সেই আত্মবিশ্বাসই কাল হলো। ভিড়ের মধ্যেই ঘাতক তার কাজ সেরে ফেলে। গুলিতে সরোয়ার ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং এরশাদ উল্লাহসহ আরও চারজন গুলিবিদ্ধ হন। সরোয়ারের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ ১৫টি মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এই হত্যাকাণ্ড চালিতাতলী খন্দকারপাড়া এলাকায় এক ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে। এলাকার বাসিন্দা নুর আহমদ বলেন, “এভাবে বাড়ির ভেতর এসে গুলি করে মানুষ মেরে চলে যাবে। তা ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।” আবদুল কাদের এমনকি এও উল্লেখ করেন যে, সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ এর আগে বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাবেক ওসি আরিফুর রহমানকেও রাস্তায় পেটানোর হুমকি দিয়েছিল।

সাজ্জাদ আলীর নামটি চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন নয়। ২০০০ সালের ১২ জুলাই বহদ্দারহাটে আটজন নিহতের ঘটনায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হলেও পরে উচ্চ আদালত থেকে খালাস পেয়ে বিদেশে পালিয়ে যান। কিন্তু বিদেশ থেকেও তিনি বায়েজিদ, পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁও এলাকায় তার অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে আসছেন, যা দেখভাল করতেন সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ।

মাত্র এক মাস আগেই বিয়ে করেছিলেন সরোয়ার হোসেন। সেই বিয়েতে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহও উপস্থিত ছিলেন। কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে সরোয়ারকে বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশেও দেখা যেত। তার বাবা আবদুল কাদের ছেলের যুবদলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বললেও, বিএনপি নেতারা সরোয়ারকে তাদের কর্মী হিসেবে অস্বীকার করেছেন।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, সরোয়ারের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জড়িতদের ধরতে অভিযান চলছে এবং এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতা আবদুল কাদেরের শোককে স্পর্শ করে না। তার কাছে এই সবকিছুর চেয়ে ভারী হয়ে আছে রিকশার সিটে শুকিয়ে যাওয়া সেই রক্তের দাগ আর ঘাতক মো. রায়হানের সেই শেষ হুঁশিয়ারি— “তোর সময় শেষ।”