বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা। চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং এলাকার শান্ত সিডিএ আবাসিক এলাকাটি হঠাৎ কেঁপে উঠল এক ভয়ংকর চিৎকারে—‘গুলি কর, গুলি কর!’ মুহূর্তের মধ্যেই মোটরবাইকে আসা তিন দুর্বৃত্ত ঘিরে ধরল একটি প্রাইভেট কার। চকচকে চাপাতির আঘাতে চুরমার হলো গাড়ির কাচ। গাড়ির ভেতরে তখন মৃত্যুভয়ে জবুথবু চট্টগ্রাম কাস্টমসের দুই কর্মকর্তা—রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান খান ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. বদরুল আরেফিন ভূঁইয়া। চালকের বুদ্ধিমত্তায় সে যাত্রা তারা প্রাণে বাঁচলেও, এই হামলা কেবল কোনো সাধারণ ছিনতাই ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের রাজস্ব রক্ষকদের প্রতি এক সংঘবদ্ধ মাফিয়া চক্রের স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
কিন্তু কেন এই আক্রোশ? কেন প্রকাশ্য দিবালোকে কাস্টমস কর্মকর্তাদের রক্ত ঝরাতে চাইল দুর্বৃত্তরা? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে চট্টগ্রাম বন্দরের আড়ালে সক্রিয় এক ভয়ংকর চোরাচালান সিন্ডিকেটের তথ্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, এই হামলার শেকড় পোঁতা রয়েছে সম্প্রতি জব্দ করা প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের অবৈধ পণ্যের চালানের গভীরে।
সিন্ডিকেটের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ ভেস্তে দেওয়ার মাশুল
গত কয়েক মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস যেন চোরাকারবারিদের জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পপি বীজ, ঘনচিনি, বিদেশি প্রসাধনী এবং সিগারেটের বড় বড় চালান আটকের ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। কাস্টমস সূত্র বলছে, রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান ও তার দল সম্প্রতি এমন সব চালান ধরেছেন, যা খালাস হলে সরকার রাজস্ব হারাতো, আর জনস্বাস্থ্য পড়তো চরম হুমকিতে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ছিল গত অক্টোবরের। পাকিস্তান থেকে ‘পাখির খাদ্য’ বা বার্ড ফিড ঘোষণা দিয়ে দুটি কনটেইনার আনে কোরবানিগঞ্জের মেসার্স আদিব ট্রেডিং। নথিপত্রে ৩২ টন পাখির খাবারের কথা বলা হলেও, কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয়। গত ২২ অক্টোবর কনটেইনারের দরজা খুলতেই বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। সামনের দিকে সাজানো পাখির খাবারের আড়ালে পেছনের সারিতে লুকানো ছিল ২৫ টন আমদানি নিষিদ্ধ পপি বীজ—যা মাদক তৈরীর অন্যতম উপাদান।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ধরা পড়ে ঘনচিনির (সোডিয়াম সাইক্লামেট) এক বিশাল চালান। ঢাকার বংশালের এসপি ট্রেডার্স চীন থেকে ‘পলিঅ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড’ ঘোষণা দিয়ে তিনটি কনটেইনার আনে। কিন্তু ল্যাব টেস্টে দেখা যায়, রাসায়নিকের ড্রামের ভেতরে ৩৯ টনই নিষিদ্ধ ঘনচিনি। সাধারণ চিনির চেয়ে ৫০ গুণ বেশি মিষ্টি এই ক্ষতিকর উপাদানটি বেকারি ও শিশুখাদ্যে ব্যবহারের জন্য বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল চক্রটির।
বেনামি ফোনের হুমকি থেকে রাজপথে হামলা
এই চালানগুলো আটকে দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ। হামলার শিকার রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান খান জানান, ৫ অক্টোবর তাকে ফোন করে কসমেটিকসের চালান ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। সেই ফোনালাপে স্পষ্ট হুমকি ছিল—কথা না শুনলে ‘মেরে ফেলা হবে’। এ ঘটনায় বন্দর থানায় জিডিও করেছিলেন তিনি।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার মো. তারেক মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট আমরা ভেঙে দিয়েছি। এরপর থেকেই বিভিন্ন নম্বর থেকে হুমকি আসছিল। কিছুদিন আগে নিজেকে ‘সাজ্জাদ’ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি ফোনে আমাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আমাদের ধারণা, ৪০ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য ভেস্তে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েই তারা এই হামলা চালিয়েছে।’
ডবলমুরিং থানার ওসি বাবুল আজাদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হামলাকারীরা পেশাদার এবং তাদের লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট। পুলিশ এখন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি সম্প্রতি জব্দ করা চালানের নথিপত্র খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে, জব্দ হওয়া পপি বীজ ও ঘনচিনির চালানের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এবং তাদের পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড—সবই এখন তদন্তের টেবিলে।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কেবল রাজস্ব আদায় করছেন না, তারা রুখে দিচ্ছেন বিষাক্ত মাদক আর ক্ষতিকর খাদ্যের প্রবেশপথ। কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যখন তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—বন্দরের গেটে পাহারায় থাকা এই কর্মকর্তাদের রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত? বৃহস্পতিবারের হামলা সেই প্রশ্নটিই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সিন্ডিকেটের কালো হাত কি আইনের হাতের চেয়েও লম্বা? উত্তর মিলবে তদন্ত শেষেই।