সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত অর্ধকোটি মানুষ, শীর্ষে চট্টগ্রাম বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে এই সংখ্যা প্রায় অর্ধকোটিতে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাম্প্রতিক এক গণনায় উঠে এসেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে ‘বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের (আইডিপি) সংখ্যা’ শীর্ষক এই গণনার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী পরিচালিত এই শুমারিতে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে মানুষের জীবনকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করছে।

আইওএম-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সারা দেশে বর্তমানে ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫২৭ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এই বিভাগে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ লাখ ১২ হাজার ৪৬১ জন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের এক-চতুর্থাংশই অবস্থান করছেন মাত্র চারটি জেলায়। এই জেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ ও ভোলা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী দুটি জেলা-ই চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, এই অঞ্চলের মানুষের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটি প্রকট হয়ে উঠেছে।

চট্টগ্রামের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৭৯৮ জন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে ৬ লাখ ৫৯ হাজার, বরিশাল বিভাগে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৬২৮, রংপুর বিভাগে ৫ লাখ ৬৫ হাজার ১২৮, সিলেট বিভাগে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ১২৭ এবং খুলনা বিভাগে ৪ লাখ ১৮ হাজার ১৪৬ জন মানুষ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকাংশই গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দা। মোট বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ৮৫ শতাংশই ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাস করছেন।

আইওএম-এর তথ্যমতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৩ শতাংশই ২০২০ সালের এপ্রিলের আগে তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এছাড়া ২৫ শতাংশ মানুষ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

এই তথ্য সংগ্রহের জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে দেশব্যাপী বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হয়। দেশের ৬৪টি জেলা, ৪ হাজার ৫৭৯টি ইউনিয়ন, ৩২৯টি পৌরসভা ও বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের ৪৮০টি ওয়ার্ডজুড়ে এই গণনা পরিচালিত হয়। এ সময় ২৯ হাজারের বেশি তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং ৫ হাজার ৩৮৮টি মাঠ পরিদর্শন করা হয়, যা বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ।

ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে আইওএম বাংলাদেশের মিশনপ্রধান ল্যান্স বোনো বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা জানা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ফলাফল জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আরও সুসংগঠিত পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। এছাড়াও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেএম আবদুল ওয়াদুদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাইফুল্লাহ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি ইভা আতানাসোভা আলোচনায় অংশ নেন।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির এ-জাতীয় প্রথম গণনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি দুর্যোগ প্রস্তুতি, পুনর্বাসন পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় নীতিনির্ধারকদের আরও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

পাঠকপ্রিয়